নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের দিন অনন্য উচ্চতায় উঠেছে পুঁজিবাজার। নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশায় এই সরকারের শপথের দিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক বেড়েছে ৩০৬ পয়েন্ট বা ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। পয়েন্ট বৃদ্ধির দিক দিয়ে ডিএসইএক্স চালুর পর গতকালের বৃদ্ধি ছিল সর্বোচ্চ। এ হিসেবে গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পয়েন্ট বেড়েছে সূচকটির। তবে শতাংশ বিবেচনায় এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। রেকর্ড সূচক বৃদ্ধির দিনে শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণও দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
চলতি সপ্তাহে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর টানা তিন দিন পুঁজিবাজারে উল্লম্ফন চলছে। গত মঙ্গলবার থেকে তিন দিনে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বেড়েছে ৬৯৫ পয়েন্ট বা ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। গত এক যুগে এত স্বল্প সময়ে সূচকের এতটা বৃদ্ধি দেখা যায়নি। এর মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবারই সূচক সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান ও তিন কমিশনারের অনুপস্থিতিতেই পুঁজিবাজারে প্রায় সব শেয়ারের দাম ব্যাপক হারে বাড়ছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সর্বশেষ তিন কার্যদিবস প্রায় সব কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়লেও সূচকের উল্লম্ফনে প্রধান ভূমিকা রাখছে বড় মূলধনী ও মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো। বিশেষ করে ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ওষুধ, জ্বালানি খাত ছাড়াও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিশেষ অবদান রয়েছে।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হওয়া সিকিউরিটিজগুলোর মধ্যে ৯১ শতাংশের দর বেড়েছে। এর মধ্যে ৭ থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বেড়েছে ২১০টি সিকিউরিটিজের। বড় মূলধনী ও মৌলভিত্তির শেয়ারগুলোর সর্বোচ্চ দর বাড়ায় ডিএসইএক্স বেড়েছে ৩০৬ পয়েন্ট। পয়েন্ট বিবেচনায় সূচকটি চালুর পর এটি সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি এ সূচকটি চালু হয়। তবে শতাংশ হিসেবে সূচকের বৃদ্ধি সাড়ে চার বছরে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি ডিএসইএক্স ৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেড়েছিল।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, বৃহস্পতিবার লেনদেন শুরুর পর থেকেই বেশিরভাগ শেয়ারের দরবৃদ্ধিতে সূচকটি বাড়তে শুরু করে। ডিএসইতে লেনদেন শুরুর প্রথম মিনিটেই সূচকটি প্রায় ৮০ পয়েন্ট বেড়ে যায়। পরবর্তী আধঘণ্টায় সূচকে কিছুটা নিম্নমুখী ধারা তৈরি হলেও বেলা পৌনে ১১টা থেকে আবারও বৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসে। ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি, ওষুধসহ সবগুলো খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সূচকও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে, যা লেনদেনের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। দিনশেষে ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ৩০৬ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৯২৪ পয়েন্টে উন্নীত হয়। সূচকের এ অবস্থান গত ২১ মার্চের পর সর্বোচ্চ।
পয়েন্ট বিবেচনায় গতকালের বৃদ্ধি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে ১৩তম সর্বোচ্চ। এক দিনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ১২ পয়েন্ট বেড়েছিল ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি। অবশ্য ওই সময় শেয়ারদরে সার্কিট ব্রেকার ছিল ২০ শতাংশ, যা এখন ১০ শতাংশ এবং তালিকাভুক্ত সব শেয়ারই তৎকালীন প্রধান সূচক ডিএসই জেনারেল এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন তালিকাভুক্ত ৩৬০ শেয়ারের মধ্যে সূচকভুক্ত ২৫২টি। আর সূচক বৃদ্ধির হার বিবেচনায় গতকালের বৃদ্ধি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে ১৫তম সর্বোচ্চ। একদিনে সর্বোচ্চ ২২ শতাংশ সূচক বেড়েছিল ২০০৯ সালের ১৫ নভেম্বর।
সূচকের উল্লম্ফন প্রসঙ্গে প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বুধবার শেয়ারদর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কিছুটা ভালো শেয়ারের আধিক্য দেখা গেলেও গতকালসহ বাকি দুদিন ভালো-মন্দ সব শেয়ারের দর কমবেশি বেড়েছে। তবে এর মধ্যে মৌলভিত্তির শেয়ারগুলোর দর বাড়ছে, যা বেশ ইতিবাচক। এসব শেয়ার ছাড়া ব্যাংকের শেয়ারদর বৃদ্ধি ও সূচকের উত্থানে বড় ভূমিকা রাখছে বলে জানান তিনি।
গতকাল সূচক বাড়াতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে বিএটিবিসি, ব্র্যাক ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মা, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও গ্রামীণফোন। এ পাঁচ কোম্পানি সম্মিলিতভাবে সূচকে প্রায় ৮৯ পয়েন্ট যোগ করেছে।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৯৮টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর বেড়েছে ৩৬৪টির, কমেছে ২৭টির ও অপরিবর্তিত ছিল ৭টির দর। খাতওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বৃহস্পতিবার একমাত্র করপোরেট বন্ড ছাড়া সবগুলোর খাতের বাজার মূলধন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর মধ্যে টেলিযোগাযোগ, ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, খাদ্য ও অনুসঙ্গ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং মিউচুয়াল ফান্ডের দর সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এসব খাতের বাজার মূলধন বেড়েছে ৭ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত। এ ছাড়া বাজার মূলধন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়া খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে বীমা, কাগজ ও প্রকাশনা, সিমেন্ট, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, ভ্রমণ ও অবকাশ এবং সিরামিক খাত।
এদিকে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ায় ডিএসইর লেনদেন দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ১ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা, যা গত ১৩ ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ।
