কনস্টেবল আবুল কালাম (ছদ্মনাম)। প্রায় দুই বছর ধরে ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা পূর্ব থানায় কর্মরত আছেন। এলাকাবাসী আদর করে তাকে বরিশাইল্লা আবুল বলেই ডাকেন। কোনো সমস্যা হলে তাকে প্রথমে ফোন করেন এলাকার লোকজন। সবার কাছে জনপ্রিয় তিনি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ডিউটি করছিলেন থানায়। কিন্তু সহিংসতায় প্রিয় কর্মস্থলেই তিনি মারা যান। মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে পোশাক পরিবর্তন করেও রক্ষা পাননি।
শেখ হাসিনার পদত্যাগের দিন আন্দোলনে অংশ নেওয়া দুর্বৃত্তরা থানায় হামলা চালালে পুলিশ ভেতর থেকে গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। প্রতিবাদে ওইদিন প্রায় সারা রাত পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় থানায়। পুড়ে মারা যান আবুল কালামসহ অন্যরা। চার দিন পর গতকাল শনিবার আবুলের সহকর্মীরা কর্মস্থলে যোগ দিয়ে থানার ভেতরে পড়ে থাকা পোশাকসহ অন্য সরঞ্জামাদি দেখে অঝোরে কেঁদেছেন। তাদের কান্না দেখে পথচারীদের মধ্যে কেউ কেউ চোখ মুছতেও দেখা গেছে। এই থানাটির মতোই মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, ভাটারা, খিলক্ষেতসহ কয়েকটি থানায় এসে সরঞ্জাম দেখে সহকর্মীরা আবেগাপ্লুত হয়েছেন।
গতকাল সকালে উত্তরা পূর্ব থানায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভবনের নিচতলা থেকে শুরু করে তৃতীয়তলা পর্যন্ত কোনো কিছুর অবশিষ্ট নেই। পুরো ভবনটি আগুনে পুড়ে শ্মশান হয়ে হয় গেছে। আইজিপি ও পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে কর্মস্থলে যোগ দিতে আসেন অন্তত ২০ পুলিশ সদস্য। সহিংসতার পর এই প্রথম তারা থানায় এসে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। ভবনের নিচতলা, দ্বিতীয়, তৃতীয়তলার ফ্লোরসহ বিভিন্ন স্থানে সহকর্মীদের পোশাকসহ নানা সরঞ্জাম পড়ে থাকতে দেখে কেঁদে ফেলেন অনেকে। সকাল ১০টার দিকে থানায় আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশের নতুন কমিশনার মাইনুল হাসান। দুপুর ১২টায় থানা পরিদর্শনে আসার কথা ছিল সেনাপ্রধানের। জরুরি কাজ থাকায় তিনি আসতে পারেননি। নিচতলায় ডিউটি অফিসারের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে অঝোরে কেঁদে চলেছেন দুজন কনস্টেবল।
তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিচিত অন্তত ১২ জন সহকর্মী মারা গেছেন। ৫ আগস্ট সকালে আমরা ডিউটিতে আসি। দুপুরের দিকে খবর পাই শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। এ সময় আজমপুর এলাকায় কয়েক হাজার লোক মিছিল করছিলেন। সুযোগ বুঝে থানা থেকে বের হয়ে যাই। সহকর্মীদের থানা থেকে বের হওয়ার অনুরোধও করেছিলাম। কিন্তু আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকশ দুর্বৃত্ত থানায় হামলা করে। ভেতরে আটকে পড়া পুলিশ সদস্যরা জীবন বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড মেরেও নিবৃত্ত করতে পারেননি। প্রায় সারা ধরে সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে দুর্বৃত্তরা পুরো থানা ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে পুড়ে সহকর্মীরা মারা যান। পরের দিন ভোরে ফায়ার সার্ভিস লাশগুলো উদ্ধার করে।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই দুই কনস্টেবল বলেন, ‘সহকর্মীদের থানায় ফেলে সিনিয়র অফিসাররা চলে গেছেন। যারা মরেছেন সবাই জুনিয়র। যেকোনো ঘটনার সময় জুনিয়ররাই সামনের দিকে থাকেন। আর জীবনও দেন। সিনিয়ররা পদোন্নতিসহ সব ধরনের সুযোগ পান। আমরা মরে গেলেও কিছুই পাই না। আইজিপি ও কমিশনার স্যারের নির্দেশে আমরা থানায় এসেছি। কিন্তু কাজ করার কোনো পরিবেশ নেই। কমিশনার স্যারও আমাদের এই অবস্থা দেখে মন খারাপ করেছেন। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, অল্প সময়ের মধ্যে সব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। কষ্ট করে হলেও জনগণের নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। আমরাও তার নির্দেশে কাজ করার চেষ্টা করছি।’
উত্তরা পূর্ব থানার মতো ঢাকার আরও কয়েকটি থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে। তবে থানা, পুলিশ ফাঁড়ি ও বক্সে আগুন দিয়ে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। অনেক পুলিশ সদস্য মারা গেছেন। যারা মারা গেছেন, তারা জীবন বাঁচাতে পোশাক খুলে ফেলেন। আর ওইসব পোশাক থাকলেও নেই সহকর্মীরা।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মাইনুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সব পরিস্থিতি ঠিক হয়ে যাবে। সহকর্মীদের হারিয়ে অনেকে আবেগাপ্লুত। তাদের ব্যথা আমি বুঝি। তারপরও রাষ্ট্র, সমাজ ও জনগণকে নিরাপত্তা দিতে হবে। আমরা সেজন্য কাজ করে যাচ্ছি। সেনাবাহিনী আমাদের সব ধরনের সহায়তা করে আসছেন।’
