দেশের স্বাস্থ্য বিভাগে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড এখনো ঠিকমতো শুরু হয়নি। কর্মকর্তারা অপেক্ষা করছেন নতুন গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দিকনির্দেশনার। কার চাকরি থাকে, কাকে পদত্যাগ করতে হয় বা বদলি হতে হয় কি না এমন আতঙ্কে আছেন প্রতিষ্ঠানপ্রধান থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা। বিভিন্ন অধিদপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়লেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ ও পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আসছেন না। ফলে স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যালয়গুলোয় এখনো এক ধরনের থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
সদ্যগঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নতুন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগম গতকাল রবিবার প্রথম দিনের মতো সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিজ কার্যালয়ে বসেন। স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের দুই সচিব ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে শুভেচ্ছাবিনিময় করেন তিনি। পরে প্রথমবারের মতো তার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা ছিল। বিকেল ৫টা পর্যন্ত স্বাস্থ্য উপদেষ্টার অপেক্ষায় ছিলেন বিভিন্ন অধিদপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি যাননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ৫টা পর্যন্ত থেকে চলে এসেছি। তিনি এলে হয়তো আমরা নতুন কোনো দিকনির্দেশনা পেতাম। আমরা এখন অফিসে আসছি ও যাচ্ছি। নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করছি। কিন্তু কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। বিভিন্ন কর্মসূচি ও প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে।’
নির্দেশনার অপেক্ষায় দুই অধিদপ্তর : দেশের স্বাস্থ্য খাতের দুই প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সরকারের নতুন নির্দেশনার দিকে তাকিয়ে আছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় থেকে শুরু করে সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ ও নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর গতকাল পর্যন্ত এক ধরনের স্থবিরতা চলছে এই দুই প্রতিষ্ঠানে। দু-তিন দিন হলো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি বাড়লেও আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও দলীয় নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আসছেন না বললেই চলে। যারা আসছেন, তারাও এক ধরনের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে দুই অধিদপ্তরের মহাপরিচালক থেকে শুরু করে শীর্ষ কর্মকর্তারা নিজেদের পদে থাকতে পারবেন কি না সে নিয়ে শঙ্কিত তারাও।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কক্ষে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় পদোন্নতিসহ নানা সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিতরা মহাপরিচালকের কাছে তাদের নানা দাবি তুলে ধরছেন। বৈঠক করছেন অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। তারা সরকারের নির্দেশনার ব্যাপারে জানতে চান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দু-তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অধিদপ্তরের বিভিন্ন কাজ বন্ধ রয়েছে। রুটিনকাজগুলো চলছে। হেলথ অ্যান্ড এডুকেশন প্রোগ্রামসহ কিছু কর্মসূচি আবার শুরু হওয়ার কথা শোনা গেলেও এখনো পর্যন্ত সেটার লিখিত কোনো নির্দেশনা পাননি তারা।’
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে নতুন কোনো নির্দেশনার কথা শোনা যায়নি। মহাপরিচালকসহ সবাই অফিসে আসছেন, অফিস করছেন। অশান্ত কিছু চোখে পড়েনি। আমরা সরকারের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি।’
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. টিটো মিঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) নতুন উপদেষ্টা প্রথম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে মিটিং করেছেন। এখন পর্যন্ত আমাদের জন্য নতুন কোনো আদেশ, নির্দেশ বা কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা অফিস করছি। আমাদের কার্যক্রম ভালোভাবেই চলছে। সবাই এসেছে। কোথাও কোনো বদলি বা পরিবর্তনের কোনো নির্দেশনাও আসেনি।’
বন্ধ চিকিৎসা শিক্ষা : সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো খোলেনি। শিক্ষার্থীরাও ফেরেননি ক্যাম্পাসে। প্রতিষ্ঠান খোলা ও পাঠদান শুরুর ব্যাপারে সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর ও কলেজ কর্র্তৃপক্ষ। কোনো কোনো সরকারি মেডিকেল কলেজ খোলা থাকলেও এখনো পাঠদান শুরু হয়নি।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. টিটো মিঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইএসপিআরের আগের এক নির্দেশনা অনুযায়ী মেডিকেল কলেজগুলো খুলেছে। কিন্তু কবে থেকে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে এ-সংক্রান্ত সরকারি কোনো পরিপত্র জারি হয়নি।’
বেসরকারি মেডিকেল কলেজ খোলা ও শিক্ষা কার্যক্রম চালুর ব্যাপারে গত শনিবার অনলাইনে সভা করেছে বাংলাদেশ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমসিএ)। সংগঠনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মেডিকেল কলেজগুলো খোলা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কারণ অনেক বেসরকারি মেডিকেল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থী আছেন। তাদের ফেরা নিশ্চিত না করে কলেজের ক্লাস শুরু সম্ভব নয়। পুরো বিষয়টি নিয়ে আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।’
তিন কলেজে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে দেশের তিনটি মেডিকেল কলেজে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে নিজ নিজ কলেজের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল। এগুলো হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এসব কলেজের শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে কলেজ কর্র্তৃপক্ষ অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভায় ছাত্ররাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. টিটো মিঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রত্যেকটা কলেজের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল আছে। তাদের এখতিয়ার আছে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার। সে অনুযায়ী তারা ছাত্ররাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু সেটা কেন্দ্রের কোনো সিদ্ধান্ত না। এখন পর্যন্ত মেডিকেল কলেজগুলোয় ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে কোনো জিও বা সরকারি সিদ্ধান্ত আসেনি।’
বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালে চিকিৎসকরা আসছেন, তবে সংখ্যায় কম : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বিএসএমএমইউ) রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা আসতে শুরু করেছেন। তবে সেই সংখ্যা খুবই সীমিত। হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে সেবা কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সমর্থিত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সদস্য চিকিৎসকরা আসছেন না বললেই চলে। অথচ বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাচিপ সমর্থিত চিকিৎসকের সংখ্যাই বেশি।
বিএসএমএমইউয়ে গতকাল প্রথম রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল হান্নানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা এবং স্বাচিপের কিছু শিক্ষক ও চিকিৎসক গিয়েছিলেন। তারা দুপুর পর্যন্ত অফিস করেছেন। কিন্তু উপাচার্য, উপ-উপাচার্যসহ অধিকাংশ বিভাগীয় প্রধান ও শীর্ষ কর্মকর্তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাননি। ফলে প্রশাসনিক কোনো কাজও হয়নি।
এ ব্যাপারে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) বিএসএমএমইউ শাখার মহাসচিব ও সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ডা. শেখ ফরহাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় অনেক স্বাভাবিক হয়েছে। রেজিস্ট্রার এসেছিলেন। অনেক কাজ করেছেন। প্রশাসনিক ভবনসহ বিভিন্ন ভবন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের সবাই এসেছেন। রোগীদের সেবা আরও বাড়ানো হয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাচিপের এক চিকিৎসক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আসতে শুরু করেছি। সাহস নিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’
বিএসএমএমইউসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের সেবা পরিস্থিতির দিন দিন উন্নতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাসপাতালগুলো চালু আছে। কোনো হাসপাতালেই সেবা বন্ধ নেই। চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মোটামুটি আসছেন।’
পদোন্নতি পাচ্ছেন স্বাস্থ্যের ১৪ ধরনের কর্মকর্তারা : স্বাস্থ্য বিভাগের ১৪ ধরনের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তারা সবাই সিনিয়র স্কেল ক্যাডার পদে ক্যাডার কর্মকর্তা। পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা হলেন ডেপুটি সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার, জুনিয়র লেকচারার, আবাসিক সার্জন, আবাসিক মেডিকেল অফিসার (ষষ্ঠ গ্রেড), আবাসিক চিকিৎসক, সিনিয়র স্টোর অফিসার, কিউরেটর, সিনিয়র ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট, প্রিন্সিপাল মেডিকেল ফিজিসিস্ট, সিনিয়র লেকচারার ফিজিওথেরাপি, সুপারিনটেন্ডেন্ট (ষষ্ঠ গ্রেড) ও সহকারী পরিচালক (ষষ্ঠ গ্রেড)।
গতকাল রবিবার রাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেছেন পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. হারুন-অর-রশীদ। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এই আদেশ অনতিবিলম্বে কার্যকর হবে। এতে মহাপরিচালকের অনুমোদন রয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এসব কর্মকর্তাকে বিধিমোতাবেক পদোন্নতির মাধ্যমে পদায়ন নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এসব পদে ভারপ্রাপ্ত বা চলতি দায়িত্ব হিসেবে পদায়িত অ্যাডহক ও প্রকল্পভুক্ত (পরবর্তীতে এনক্যাডারকৃত) এবং প্রকল্পভুক্ত চিকিৎসক কর্মকর্তাদের বদলি করে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতিপ্রাপ্ত ক্যাডার কর্মকর্তা পদায়নের মাধ্যমে এসব পদ পূরণ করা হবে।
এই পদোন্নতি দিতে আগে এসব পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের পদায়ন আদেশ বাতিল করা হলো বলেও প্রজ্ঞাপনে বলা হয়।
