ভারত যুক্তরাষ্ট্রসহ সবার সঙ্গেই বন্ধুত্ব চাই : উপদেষ্টা

রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক আজ

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৪, ০৩:২৯ এএম

ঢাকায় বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, জাতিসংঘ ও বিভিন্ন সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে আজ সোমবার বিকেল ৩টার দিকে প্রথমবারের মতো বৈঠক করবেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বৈঠকে দেশের চলমান পরিস্থিতি তাদের বিস্তারিত জানানোর পাশাপাশি নতুন সরকারের ভিশন, মিশনও তুলে ধরা হবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার।

এর আগে গত শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে প্রথম অফিস শুরু করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তখন তিনি পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত বৃহস্পতিবার নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। নতুন সরকারের কূটনীতির দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেনকে।

গতকাল রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় কিছু বললে পদক্ষেপে নেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের মানুষ যেন ভাবে ভারত আমাদের বন্ধু। এ কাজে দিল্লিও সহযোগিতা করবে ঢাকাকে।’

৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। এরই মধ্যে ছাত্র আন্দোলন দমনে অত্যধিক বলপ্রয়োগের অভিযোগে হতাহতের ঘটনায় তার বিচার চেয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।

শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর দেশজুড়ে বিভিন্ন এলাকায় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও আক্রান্ত হয়েছেন। তারা তাদের নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। সংখ্যালঘুদের পাহারায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও দিনরাত কাজ করছেন। এরপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য এসব হামলা করা হচ্ছে বলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে।

পাশাপাশি বিভিন্ন ভুয়া ছবি, ভিডিও প্রকাশ করে সেগুলোকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার গুজব ছড়াচ্ছেন ভারতীয় বিভিন্ন নাগরিক এবং বাংলাদেশের কেউ কেউ। এর সঙ্গে যোগ দিয়েছে ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। গুজব ছড়ানো নিয়ে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে একাধিক খবর প্রকাশিত হয়েছে। আর ভারতের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পশ্চিববঙ্গ পুলিশও এসব গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জানান, সোমবার (আজ) সংখ্যালঘু নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের ওপর কিছু আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, রাজনৈতিক কারণেও ঘটেছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হয়তো আগামীকালই সংখ্যালঘু নেতাদের সঙ্গে  বৈঠকে বসবেন প্রধান উপদেষ্টা। কোনো ধর্মীয় কারও ওপর নির্যাতন হলে তার তদন্ত ও বিচার সুনিশ্চিত করা হবে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।’

তৌহিদ হোসেন জানান, অন্তর্র্বর্তী সরকার ভারত, আমেরিকাসহ সব দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখতে চায়। তিনি বলেন, ‘দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই প্রথম লক্ষ্য। আমাদের স্বার্থ রক্ষাই হবে প্রথম কাজ। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই। এমন সম্পর্ক চাই, যেখানে দুই পক্ষই লাভবান হবে। সুষম সম্পর্ক চাই।’

ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলন সমর্থন করতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে সাজা পাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের ফিরিয়ে আনতে অন্তর্র্বর্তী সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে বলেও জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের সমর্থনে আরব আমিরাতে মিছিল করার কারণে যেসব বাংলাদেশি শ্রমিকদের জেল হয়েছে, তাদের মুক্ত করতে প্রধান উপদেষ্টা সে দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্রুতই যোগাযোগ করবেন। বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বাড়ানোর বিষয়েও পদক্ষেপ নেবে এই সরকার।’

দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এটা অস্বীকারের কিছু নেই। একজন যোগ্য ব্যক্তি অর্থনীতির দায়িত্ব পেয়েছেন। তিনি প্রচণ্ডভাবে লেগেছেন। আশা করা যায় ১ থেকে ২ মাসে স্ট্রিমলাইনে নিয়ে আসবেন।’

তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন, গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংক, পদত্যাগ করেছেন। তার স্থলে নিয়োগ দিতে যোগ্য মানুষ খোঁজা হচ্ছে। এমন মানুষ পাওয়া খুব মুশকিল হয়ে গেছে। আমরা চেষ্টা করছি, গভর্নর নিয়োগ দেওয়া যায় কি না। ডেপুটি গভর্নর নিয়োগেরও চেষ্টা করছি।’

ছাত্র আন্দোলনে সহিংসতায় নিহতের তদন্ত হবে জানিয়ে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘প্রয়োজন হলে জাতিসংঘের সহায়তা নেওয়া হবে। বিভিন্ন দূতাবাসের কার্যক্রম শুরু করতে আগামীকাল কূটনৈতিক বৈঠকে রাষ্ট্রদূতদের প্রতি আহ্বান জানানো হবে।’

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে যিনি আছেন, তিনি আজ সারা দিন ব্যস্ত ছিলেন। পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হয়তো আমরা এক থেকে দুই দিনের মধ্যে দেখতে পাব। একজন বিদেশি সাংবাদিক আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরবেন কি না। অবশ্যই তারা ফিরবেন, এটা যাদের কাজ, তারা যখন ফিরবেন, তখন শিক্ষার্থীরাও ফিরে যাবেন।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্র স্মুথ করতে চাই। এখন পর্যন্ত পজিটিভ ইনডিকেশন পাচ্ছি। তাদের (বিদেশি) যেসব কনসার্ন, সেগুলো কিন্তু আমাদেরও কনসার্ন। মানবাধিকার নিয়ে কেউ কিছু বললে, সেটা তো আমাদেরও কনসার্ন।’  

দেশে স্থিতিশীলতা ফেরার পর নতুন সরকারের মেয়াদ নিয়ে আলোচনা হবে বলেও জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের মাধ্যমেই এই সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। এর কোনো ব্যত্যয় হবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত