শিক্ষার্থী আর সেনাসদস্যদের পাহারায় যাত্রাবাড়ী থানায় ফিরেছেন ১০ পুলিশ সদস্য। আট দিন পর কর্মস্থলে ফিরেছেন তারা। তবে থানার দাপ্তরিক কাজ শুরু করতে পারেননি। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিজেদের ভঙ্গুর মনোবলকে চাঙ্গা হওয়ার প্রবোধ দিচ্ছেন কেউ কেউ। এ যাত্রায় সঙ্গী হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। পুলিশশূন্য এই থানা দেখভাল করছিলেন তারাই।
গতকাল দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আওতাধীন সব থেকে বড় থানা যাত্রাবাড়ী গিয়ে দেখা যায়, এক ব্যক্তিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী ও সেনাসদস্যরা আটক করেছেন। ওই ব্যক্তি থানার পুড়ে যাওয়া গাড়ির যন্ত্রাংশ চুরির সময় হাতেনাতে ধরা পড়ে। এ কারণে তাকে থানার ভেতরে নিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে।
গত ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ থেকে চলে যাওয়ার পর উত্তেজিত জনতা হামলা চালায় এ থানায়। এতে থানার কিছুই রক্ষা করা যায়নি। ব্যাপক লুটপাট চলে থানার অস্ত্রাগার থেকে সব জায়গায়। এরপর দেওয়া হয় আগুন। থানার ভেতরের চৌহদ্দিতে রাখা পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যবহারের পরিবহন ও আলামতের পরিবহন মিলিয়ে অন্তত ছয় যানবাহন পুড়ে যায়। সেগুলোরই পোড়া স্তূপ থেকে গাড়ির লোহা-লক্কড় সরাচ্ছিল আটক ব্যক্তিটি। ৫ তারিখের এ হামলায় থানাটিতে কর্মরত আটজন পুলিশ সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয় থানার সামনে ও আশপাশের এলাকা থেকে। এর আগে আন্দোলনের দিনগুলোতে যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় পুলিশের গুলিতে ৫০ জনের মতো মানুষ নিহত হয়। ফলে ঘটনার আট দিন পরও এ থানার অচলাবস্থার পরিবর্তন হয়নি।
কাজে ফেরা পুলিশ, পাহারারত শিক্ষার্থী-সেনা ছাড়া অন্যদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত সেনা দলের নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট মুগ্ধ। তিনি বলেন, ‘গতকাল দুপুর ২টা পর্যন্ত যাত্রাবাড়ী থানায় ১০ জন পুলিশ সদস্য ফিরে এসেছেন। আমরা তাদের নিরাপত্তায় আছি। থানার ভেতরে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে। তাই ভেতরে সবার প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছে। বাকি পুলিশ সদস্যদের আমরা স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় আছি।’
ফিরে যাচ্ছেন সেবাগ্রহীতারা, নিখোঁজ ছেলের ছবি হাতে মায়ের আর্তনাদ : সকাল থেকেই থানার সামনে সেবাপ্রত্যাশীদের জটলা ছিল। তবে সবাই সেবা না পেয়ে ফিরে গেছেন। যাত্রাবাড়ী এলাকার সুফিয়া প্লাজায় এমএক্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক মো. ইমরান। গত ১৭ জুলাই প্রতিষ্ঠানের মালামাল তোলার কাজ করার সময় হঠাৎ চোখে গুলি লাগে। প্রতিষ্ঠানের কাজ করতে গিয়ে আহত হলেও তার পাশে দাঁড়ায়নি এমএক্স নামের প্রতিষ্ঠানটি। নিজ খরচে চিকিৎসা নিয়ে আবারও কাজে যোগ দেন এই যুবক। তবে চিকিৎসক তাকে ভারী কাজ করতে নিষেধ করলেও প্রতিষ্ঠানটি তাকে এখনো ভারী কাজ করতে বাধ্য করছে। আর কাজ না করলে চাকরি ছাড়ার হুমকি দিচ্ছে। তাই প্রতিকার পেতে থানায় এসেছেন। কিন্তু ইমরানের কথা শোনার মতো কেউ নেই থানায়।
থানার সামনে ছেলের ছবি হাতে দাঁড়িয়ে কদমতলী থানার রায়েরবাগের বাসিন্দা রাশেদা বেগম। তিনি বলেন, আমার বড় ছেলে সোহেল রানা গত ১৮ জুলাই রাতে যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়। পেশায় ঝুট ব্যবসায়ী। তাকে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল ও মর্গে খুঁজেও কোনো সন্ধান পাচ্ছি না। ছেলের সন্ধান চেয়ে কম্পিউটারে লেখা সাধারণ ডায়েরির আবেদন নিয়ে এসেছি। কিন্তু থানায় জিডি গ্রহণ করার মতো কেউই নেই।
গত সোমবার পর্যন্ত অনেক ভুক্তভোগীর অভিযোগ লিখে রেখেছিল নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা শিক্ষার্থীরা। তবে গতকাল থানায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য যোগ দেওয়ায় তারা সেটিও করছে না। যেসব শিক্ষার্থী থানার নিরাপত্তায় কাজ করছে তাদের একজন ইমতিয়াজ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, সরকার পতনের খবর পাওয়ার পরেই কিছু মানুষ থানায় হামলা করে আগুন ধরিয়ে দেয়। পাশাপাশি অনেকেই থানার ভেতরে লুটপাট চালায়। এমনকি একদল লোক ট্রাক ভরে থানার অস্ত্র লুট করে নিয়ে গেছে। যদিও আমরা ভাঙাড়ি দোকানসহ বিভিন্ন স্থান থেকে কিছু গ্রেনেড ও অস্ত্র উদ্ধার করেছি। তবে বেশিরভাগ অস্ত্র এখনো বেহাত হয়ে আছে।
গত আট দিনে শিক্ষার্থীরা চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৮ লাখ টাকার মালামাল ও বিপুল পরিমাণ টাকাও উদ্ধার করেছে। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক, দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার কার হয়। থানায় চুরির চেষ্টা ও মাদকসহ অন্তত দেড় শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে তারা।
সরকার পতনের পর কিছু দাবি নিয়ে কয়েক দিনের কর্মবিরতি পালন করে পুলিশ। সেগুলো মেনে নিলে গত সোমবার থেকে কাজে ও থানায় ফিরতে শুরু করে। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে ৬৩৯টি থানার মধ্যে ৬৩৪টির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মেট্রোপলিটনের ১১০টি থানার মধ্যে ১১০টি এবং জেলার ৫২৯টি থানার মধ্যে ৫২৪টি থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
এদিকে পাঁচটি থানা সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস, আসবাবপত্রসহ সব প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ায় থানার কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এ পাঁচটি থানারও কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব বলে জানানো হয়েছে।
দুই চেয়ার ও এক টেবিলে বসে মোহাম্মদপুর থানার কার্যক্রম : মোহাম্মদপুর থানার সামনে অনেক উৎসুক মানুষ ভিড় দেখা গেছে। দরজায় দাঁড়ানো সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, থানার ভেতরে পুড়ে যাওয়া বিভিন্ন মালামাল বের করছে শিক্ষার্থীরা। থানার বারান্দা হয়ে ওসির রুমে যেতে চোখে পড়ল ডিউটি অফিসারের কক্ষটি। বেঞ্চ, চেয়ার-টেবিল যাবতীয় কাগজপত্র পুড়ে গেছে। ওসির রুমও তছনছ। এমন অবস্থার মধ্যেই ভেতরে দুটি চেয়ার ও একটি ছোট টেবিল বসিয়ে লেখালেখির কাজ করছেন দুই পুলিশ সদস্য। থানায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ মামলার কপি, কম্পিউটার এবং অনেক জিনিসপত্র পুড়ে ছাই হয়েছে। তাই কাজ না থাকায় তারা অলস সময় কাটাচ্ছেন। এজন্য থানার কার্যক্রমও শুরু হয়নি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দীপক চন্দ্র সাহা বলেন, ‘আমরা এখনো পুরোদমে কাজ শুরু করতে পারিনি। তবে চেষ্টা করছি সেবা দেওয়ার। কারণ আমাদের কম্পিউটারসহ যাবতীয় জিনিসপত্র পুড়ে গেছে। এখন বসার জায়গাটুকু নেই। তারপরও চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
