বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দফায় দফায় ইন্টারনেট বন্ধের পেছনে আগুনে ডেটা সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে ইন্টারনেট বন্ধের সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল না। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েরও অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
ইন্টারনেট বন্ধ করে আগুন লাগার বিষয়টি সামনে এনে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক জাতির সঙ্গে মিথ্যাচার ও প্রতারণা করেছেন।
দেশব্যাপী মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধের কারণ সম্পর্কিত ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক তদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম গত রবিবার প্রথম অফিস শুরু করার পর এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা দিয়ে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন। পরে সাত সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। গতকাল বিকেলে কমিটি তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
সাম্প্রতিক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে একাধিকবার দেশব্যাপী মোবাইল ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট শাটডাউন হয়। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয় ও বিশে^ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত ও ১৮ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মোবাইল ইন্টারনেট এবং সর্বশেষ ৫ আগস্ট ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ ও চালু করার ক্ষেত্রে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রশাসনিক অনুমোদন নেওয়া হয়নি। সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের মৌখিক নির্দেশে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মো. মহিউদ্দিন আহমেদের নির্দেশনায় ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়।
অন্যদিকে ১৭ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত এবং ৫ আগস্ট মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ ও চালু করার বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) নির্দেশনায় সম্পন্ন করা হয়। এ বিষয়ে অধিকতর তদন্তের কাজ চলছে।
দেশে গত ১৭ জুলাই রাত থেকে মোবাইল ইন্টারনেট ও ১৮ জুলাই রাত ৯টার দিকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়। টানা পাঁচ দিন সব ধরনের ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ ছিল ১০ দিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগমাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপের মতো সেবা বন্ধ ছিল ১৩ দিন।
ইন্টারনেট বন্ধের কারণ হিসেবে তখন পলক বলেছিলেন, ‘সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করেনি। ইন্টারনেট অবকাঠামোয় অগ্নিসংযোগের কারণে এমনিতেই বন্ধ হয়ে গেছে।’
দেশে ১২ কোটির বেশি মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক এবং ১ কোটির বেশি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গ্রাহক রয়েছে। এখন ব্যবসা, বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন, সরকারি-বেসরকারি অফিসের কার্যক্রম পরিচালনা, তথ্যপ্রবাহ, বিনোদনসহ সব ক্ষেত্রেই ইন্টারনেট লাগে। ইন্টারনেট বন্ধের ফলে দেশ প্রায় অচল হয়ে পড়ে। আইটি, ই-কমার্স ও সফটওয়্যার খাতের উদ্যোক্তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। দেশ-বিদেশের বাজার মিলে কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। অনেক উদ্যোক্তা তাদের বিদেশি ক্রেতা হারিয়েছেন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছিল। সে ধকল এখনো কাটিয়ে ওঠা যায়নি।
ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন। সরকার পতনের পর ৬ আগস্ট জুনাইদ আহমেদ পলক দেশ ছাড়তে গেলে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হয়। এরপর তার অবস্থান জানা যায়নি। বিটিআরসির চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদের দুটি মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
বিটিআরসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কমিশনারদের সঙ্গে আলোচনা না করেই ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। ইন্টারনেট সরবরাহকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশের সঙ্গে দ্বিমত করলে লাইসেন্স বাতিলসহ নানা হুমকি দেওয়া হতো। ইন্টারনেট বন্ধের কারণে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুন্ন হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত ১৫ জুলাই রাত সাড়ে ১২টার দিকে বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগ থেকে হোয়াটসঅ্যাপ অপারেটরদের শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
১৬ জুলাই দুপুরের দিকে বিটিআরসির একই বিভাগ থেকে দেশের ৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। বলা হয়, এ নির্দেশের ক্ষেত্রে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন রয়েছে।
১৭ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে এনটিএমসি থেকে মোবাইল অপারেটরদের বলা হয়, ফেসবুক ও ইউটিউব রাত ১২টা থেকে বন্ধ করে দিতে হবে। রাত ২টার দিকে এনটিএমসি মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ দেয়। পরে এনটিএমসির নির্দেশনাতেই মোবাইল ইন্টারনেট সচল হয়।
সাবমেরিন কেবল কোম্পানি ও আইটিসি সূত্রে জানা গেছে, ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় বিটিআরসি ব্যান্ডউইথ বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়। আইটিসি কোম্পানিগুলো লিখিত আদেশ চাইলে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হয়। রাত ৯টার মধ্যে পুরো দেশ ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হওয়া পর্যন্ত বিটিআরসি নজরদারি করতে থাকে।
২৮ জুলাই দুপুর দেড়টার দিকে এনটিএমসি থেকে ইমেইলে মোবাইল অপারেটরদের ইন্টারনেট সচল করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, ভাইবার, ইমো, ইউটিউব, বিপ, সিগন্যাল, স্কাইপ ও বটিম বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয় তাদের।
এনটিএমসির মহাপরিচালক ছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান। তাকে ৬ আগস্ট সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
সাবমেরিন কোম্পানিকে তখনকার প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক নিজে ফোন করে ইন্টারনেট বন্ধের জন্য বলেন। ৫ আগস্টেও সাবমেরিন কেবল কোম্পানি ও আইটিসি থেকে ব্যান্ডউইথ সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিভিন্ন সময় ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা ঘটেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ঘিরে প্রায়ই ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনা ঘটত। যদিও সরকার তা অস্বীকার করত। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে রাজনীতিমুক্ত করে স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
