কোটা আন্দোলন চলাকালে গত জুলাই ও চলতি মাসের শুরুতে দেশ জুড়ে হওয়া সহিংসতার তদন্তে আগামী সপ্তাহে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম পাঠাবে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ফলকার তুর্ক বুধবার রাতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ফোন করে এই সিদ্ধান্ত জানান। এ ছাড়া গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইস পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ তথ্য জানান।
জাতিসংঘের তদন্ত দলকে সহায়তা করতে সরকার প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন।
পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক গোয়েন লুইস, রাশিয়া ও জাপানের রাষ্ট্রদূত। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নিরপেক্ষ তদন্তের কথা বলেন তৌহিদ হোসেন।
পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ছাত্র আন্দোলনের সময় হত্যার তদন্তে জাতিসংঘ কারিগরি সহযোগী দল আগামী সপ্তাহে ঢাকায় আসছে।
তারা প্রাথমিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংয়ের কাজ করবে। তিনি বলেন, তাদের কিছু টেকনিক্যাল সহকর্মী থাকবেন, যারা আগামী সপ্তাহে ঢাকায় আসবেন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘মূল বিষয়টা হচ্ছে, আমাদের সহায়তা করা। যাতে আমাদের তদন্তটা ঠিকমতো করতে পারি এবং যাদের শাস্তি পাওয়ার কথা, তাদের যেন শাস্তির মুখোমুখি করা যায়। কারণ, এ সরকারের অবস্থান খুবই পরিষ্কার ও স্বচ্ছ। যারা এই অপরাধগুলো করেছে এবং যারা হুকুম দিয়েছে, তাদের অবশ্যই বিচারের সম্মুখীন করতে হবে এবং এ কাজে জাতিসংঘ সহায়তা করুক এটা নিয়ে আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত আছে।’
তিনি বলেন, তারা (জাতিসংঘ) প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান করবে। তবে এ-সংক্রান্ত আদেশ, বিশদ বিবরণ এবং কীভাবে দলটি সরকারের সঙ্গে কাজ করবে এই সবকিছুর বিষয়ে একমত হওয়া দরকার।
সংঘাতপূর্ণ এলাকায় মাঝেমধ্যেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কাজ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। জাতিসংঘ সনদে নিরাপত্তা পরিষদকে তদন্ত ও মধ্যস্থতা, মিশন প্রেরণ, বিশেষ দূত নিয়োগ বা মহাসচিবকে তার অফিস ব্যবহারের অনুরোধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধির বক্তব্য : পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতের পর গোয়েন লুইস বলেন, ‘তারা (জাতিসংঘের টিম) বাংলাদেশে আসার জন্য টিকিট করে ফেলেছেন এবং আগামী সপ্তাহে আসবেন। প্রতিনিধিদলটি প্রাথমিকভাবে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংয়ের কাজটি করবে। তাদের কাজের পরিধি, টার্মস অব রেফারেন্স, কত সময় কাজ করবে, সেটি নিয়ে এখনো কাজ চলছে। কিন্তু আমরা কাজ করতে প্রস্তুত।’
জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভ্যন্তরীণ যে তদন্ত প্রক্রিয়া (বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি) ছিল, সেটিতে জাতিসংঘের তদন্ত দলের অন্তর্ভুক্তি চেয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ওই সময়ে জাতিসংঘ সেটি মেনে নেয়নি। এখন যে তদন্ত দল আসবে, সেটির নেতৃত্ব দেবে জাতিসংঘ এবং সেটি নিরপেক্ষ হবে। এর বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে এবং এটি দায়বদ্ধতার একটি পথনির্দেশিকা দেবে।
তিনি বলেন, তদন্ত দলের সমুদয় খরচ জাতিসংঘ বহন করবে। তারা জেনেভা থেকে আসবেন। বাংলাদেশে যারা রয়েছেন, তারা এক্সটার্নাল দল হিসেবে কাজ করবেন। যখন সরকারের সঙ্গে কাজ করার কাঠামোর বিষয়টি চূড়ান্ত হবে, তখন বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে এসে কাজে নেতৃত্ব দেবেন। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করবেন।
কারিগরি দলের টার্মস অব রেফারেন্সের বিষয়ে গোয়েন লুইস বলেন, ‘এটি এখনো প্রস্তুত হয়নি এবং এটি নিয়ে কাজ চলছে। এটি নির্ভর করবে বাংলাদেশের সরকার কী চায় এবং কী ধরনের টেকনিক্যাল সহায়তার প্রয়োজন হবে। কাজেই জটিল কিছু বিষয় এখানে রয়েছে। এটি আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরে হবে এবং এটি শিগগির হবে। তারপর সিনিয়র যে দলটি আসবে, তারা সিদ্ধান্ত নেবে।’
তিনি বলেন, সামনের দিনগুলোয় অন্তর্বর্তী সরকার যে অগ্রাধিকারগুলো নির্ধারণ করবে, সেগুলোতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে জাতিসংঘ সম্মত রয়েছে। লুইস বলেন, ‘আমরা যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছি, সেগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের যুব সম্প্রদায়কে মানবাধিকার সম্প্রসারণে সহায়তা করা এবং তদন্তকাজে সহায়তা করা, যেটিতে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস গত সন্ধ্যায় একমত হয়েছেন।’
জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি বলেন, ‘ড. ইউনূস সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যখন যাবেন, তখন তাকে আমরা কীভাবে সহায়তা করতে পারি; সেটি নিয়েও আমাদের চিন্তা করতে হবে।’
