আমাদের শরীরের অভ্যন্তরে যকৃতের নিচে ছোট একটি থলির মরতা অঙ্গ আছে, যার নাম পিত্তথলি। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় Gallbladder. এটিতে পিত্তরস জমা থাকে। পিত্তরস একটি সবুজাভ তরল, যা আমাদের শরীরে চর্বি জাতীয় খাদ্য হজমে সহায়তা করে। বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতার কারণে এই পিত্তথলি অপসারণ করতে হতে পারে। যেমন : পিত্তে পাথর হলে, বারবার পিত্তথলির প্রদাহ দেখা দিলে, পিত্তনালির সমস্যা বা পিত্তথলি সংকুচিত হতে না পারার সমস্য দেখা দিলে তখন পিত্তথলি অপসারণ করা হয়। সাধারণত পিত্তথলি অপসারণ করার পরও শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই চলতে পারে। এরপরও এর চিকিৎসা-পরবর্তী কিছু জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
পিত্তথলির অপসারণে যে সমস্যা হয়
হজমের জটিলতা : পিত্তরস সরাসরি যকৃৎ থেকে ক্ষুদ্রান্ত্রে চলে যাওয়ায় ডায়রিয়া বা গ্যাসের সমস্যা হয়।
ডায়রিয়া বা নরম মলত্যাগ : অপারেশনের পর দীর্ঘদিন নরম মলত্যাগ হতে পারে। সময়ের সঙ্গে ভালো হয়ে যায়।
সংক্রমণ : অপারেশনের স্থানে ইনফেকশন হতে পারে। ঔষধ সেবনে ভালো হয়ে যায়।
পোস্ট-কোলেসিসটেকটমি সিন্ড্রোম : কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অপারেশনের পরও পেটব্যথা, হজমের অসুবিধা, বমিভাব হতে পারে। পিত্তথলি অপসারণের পর এই সমস্যা এড়াতে এবং দ্রুত সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে কিছু নিয়ম মেনে চললেই হয়। যেমন : হজমের অসুবিধা এড়াতে সহজপাচ্য খাবার খাওয়া। আস্তে আস্তে সাধারণ খাদ্যাভ্যাসে ফিরে যাওয়া। অপারেশনের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ ভারী কাজ বা ব্যায়াম না করা, ধীরে হাঁটা, হালকা ব্যায়াম করা উচিত। এগুলো দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে। একবারে বেশি খাবার না খেয়ে বারবার খাওয়া। অপারেশনের জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ও নিয়মানুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করা। আঁশযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া। রান্নায় উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহার করা। পোস্ট-কোলেসিসটেকটমি সিন্ড্রোম দেখা দিলে রোগীর অপারেশনের পরও পেটব্যথা, হজমের অসুবিধা, বমিভাব বা অন্যান্য আরও উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই খাদ্যাভ্যাসে নিয়ন্ত্রণ আনা খুবই প্রয়োজনীয়। শাকসবজি, ফলমূল, বেশি আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এমনিও এ ধরনের খাবার স্বাস্থের জন্য ভালো, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও পরিপাকতন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ভূমিকা রাখে। পর্যাপ্ত পানি পান করলে পরিপাক ক্রিয়া সহজ হয়। যেহেতু এই সিন্ড্রোমে বারবার গ্যাসের সমস্যা, পেট ফুলে যাওয়া ইত্যাদি দেখা দেয় তাই যেসব খাবার গ্যাসের সমস্যা তৈরি করে সেগুলো না খাওয়া। অ্যাসিডিটি কমাতে প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ করা। অ্যাসিড নিঃসরণ কমানোর জন্য ক্যাফেইনের গ্রহণ অর্থাৎ চা, কফির পরিমাণেও নিয়ন্ত্রণ আনা। পিত্তথলি অপসারণের কারণে অনেকেরই অতিরিক্ত পিত্তরস ক্ষরণ হয়, সে জন্য পিত্ত অ্যাসিড বাইন্ডার ওষুধ সেবন করতে হবে, এটি ডায়রিয়া কমাতেও সাহায্য করবে। ওষুধ গ্রহণ করতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।
খাবার খাওয়ার সময় আস্তে আস্তে ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া, এতে খাবার ভালো করে হজম হবে। হজম প্রক্রিয়ার সঙ্গে মানসিক চাপের সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, বিষন্নতা বা দুশ্চিন্তায় থাকলে হজমতন্ত্রের কাজ ব্যাহত হয়। মনের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে যোগব্যায়াম, মেডিটেশন ও শরীরচর্চা কর্।া নিয়মিত হাঁটা বা দৌড়ানো অভ্যাস করা। এগুলো পরিপাক প্রক্রিয়ায় সহায়ক। পিত্তথলি অপসারণের পর যে সব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, ওপরের নিয়মগুলো মেনে চললেই ভালো হয়ে যায়। উপসর্গগুলো যদি দীর্ঘস্থায়ী বা প্রকট হতে থাকে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।