মেয়রহীন নগরে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৪, ০৬:৫৮ এএম

মেয়রবিহীন নগরীগুলোয় এডিস মশার দাপট বাড়ছে। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। যদিও মেয়ররা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ বা মশকনিধনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা খরচ দেখালেও মশার কামড় থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে পারেননি।

ঋতুচক্রে বর্ষা শেষ হয়ে শরৎকাল শুরু হয়েছে। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার উৎপাত বেড়েই চলছে। আগামী মাসে এডিস মশা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের নগর এলাকায় মশকনিধনের দায়িত্ব পালন করে সিটি করপোরেশন। অন্যান্য এলাকায় পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এ দায়িত্ব পালন করে থাকে।

এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত জুলাই মাসের পুরো সময়ে চলছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। মেয়র-কাউন্সিলরসহ বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধিই এই আন্দোলন দমনে ব্যস্ত ছিলেন। এমনকি শ্রমিক-কর্মচারী লীগসহ অনেক কর্মকর্তাকেও আন্দোলন দমনে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তারা চলে যান আত্মগোপনে। ১০ সিটি করপোরেশন ও ২ শতাধিক পৌরভার মেয়র ছাড়াও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলররা এখনো প্রকাশ্যে আসেননি। সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন ধরে মশকনিধন কার্যক্রমে মারাত্মক ভাটা পড়েছে।

যদিও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মশকনিধনসহ নিয়মিত কাজগুলো তারা ঠিকঠাক মতো কারার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে মশকনিধন কর্মীদের দেখা যায়নি। এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তারা এই ক্ষমতা পাওয়ার আগেও মশকনিধনে কাজ করেছেন বলে দাবি সংস্থাগুলোর।

এ প্রসঙ্গে আলাপকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন প্রতিদিনই ডেঙ্গু বাড়তে থাকবে। এক মাস সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো মশকনিধনে তেমন কাজ করেনি। এতে মশা বংশ বিস্তারের উপযুক্ত পরিবেশ পেয়েছে। এসব মশা এখন মানুষকে কামড়াচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় মশার লার্ভা সংগ্রহ করে জরিপ কাজ চালাচ্ছে কবিরুল বাশারের নেতৃত্বাধীন একাধিক টিম। জরিপের বরাত দিয়ে এই গবেষক আরও বলেন, ‘আমরা মশার লার্ভা সংগ্রহ করে একটি পূর্বাভাস তৈরি করি। সেই পূর্বাভাসে দেখা গেছে, চলতি মাসের প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়বে। এমনকি আগামী মাসে এই সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে পারে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবমতে, গত শনিবার পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে ৭৪ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই ৭৪ জনের মধ্যে ৫৩ জনের মৃত্যু হয় সিটি করপোরেশন এলাকায়। যার মধ্যে ৪৫ জনই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার। তবে এই সময়ে ৮ হাজার ৯৮০ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ৩ হাজার ৭২৫ জন সিটি করপোরেশন এলাকার এবং বাকি ৫ হাজার ২৫৫ জন দেশের অন্যান্য স্থানে আক্রান্ত হয়েছে। আগস্ট মাসের প্রথম ১৬ দিনে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা চলতি বছরের আগের ৭ মাসের সব রেকর্ড এরই মধ্যে ছাড়িয়ে গেছে। এই ১৬ দিনে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। যার ১০ জনই গত এক সপ্তাহে মারা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মশা মারার কাজ ছিল মেয়রদের লোক দেখানো একটি কার্যক্রম। ব্যঙ্গ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একজন কার্মকর্তা বলেন, ‘লোক দেখানো কাজ হলেও তাদের “হইচই” দেখে অনেক মশা পালিয়ে যেত। সেই হইচই এখন হচ্ছে না। কিন্তু মশকনিধনের যে আসল কাজ তা আমরা শুরু করেছি। স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশনার আলোকে কর্মপরিকল্পা তৈরি করেছি।’ ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ থেকেও তাদের কাজ চলমান আছে বলে জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সমিতির সাবেক সভাপতি কীটতত্ত্ববিদ ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন মশকনিধনে কী করেছে, আমি দেখিনি। তারা মশকনিধন কার্যক্রম চালালেও যা, না চালালেও তাই। আগেও কাজ করেনি, এখনো হচ্ছে না। পার্থক্য শুধু মেয়র থাকলে মশা মারার নামে বাজেট খরচ করা হতো, এখন হয়তো তা খরচ হচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু কিছুটা বাড়বে। নভেম্বরের শেষদিকে কিছুটা কমতে পারে। তবে গত বছরের মতো ডেঙ্গু এবার এত ভয়াবহ হবে না।

স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এএফ হাসান আরিফ সাংবাদিকদের বলেছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গৃহীত পদক্ষেপ চলমান রয়েছে। মাঝখানে যেহেতু একটা বিরতি ছিল। অনেক এলাকাতেই মেয়র নেই। সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা নেবেন।

তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে না হয় বিভিন্ন ডোবা-নালায় ওষুধ ছিটানো হলো, কিন্তু বাসাবাড়ির ছাদে, ফুলের টবে যে পানি জমে তা প্রতিরোধে নাগরিক সচেতনতা দরকার। এই সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যমের সহযোগিতা প্রয়োজন।

উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে নিবিড় কো-অর্ডিনেশন প্রয়োজন। সিটি করপোরেশন থেকে ডেঙ্গুর বিষয়ে যারা কাজ করছেন, তাদের সঙ্গে আমরা বসব। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের যথাযথ প্রিভেনটিভ ব্যবস্থা নিতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত