ক্লাস হয়নি বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৪, ০৭:৩৭ এএম

শিক্ষকদের পেনশন আন্দোলন এবং শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গত ১ জুলাই থেকে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকার পর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনায় গতকাল রবিবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এখনো টালমাটাল অবস্থা বিরাজ করছে। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই এখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হলেও উপস্থিতি ছিল খুবই কম। শিক্ষক-কর্মকর্তাদের উপস্থিতিও কম ছিল।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ এবং একটি বিভাগের একটি শিক্ষকের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগেই খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল সিন্ডিকেটের। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো খুললেও ক্লাস শুরু হওয়া নিয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কোনো বিভাগেই ক্লাস শুরু হয়নি এখন পর্যন্ত। প্রতিটি বিভাগে শিক্ষকদের উপস্থিতিও কম। অন্যদিকে নানা অনিয়ম সামনে এনে আওয়ামীপন্থি বেশ কয়েকজন শিক্ষকের পদত্যাগ এবং অব্যাহতি চেয়ে আন্দোলন করতে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের। কয়েকটি বিভাগ এবং ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান এবং পরিচালকের অধীনে ক্লাস করতে অনাস্থা দেখিয়ে আসছেন তারা। কবে আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাডেমিক আবহ ফিরবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

ঢাবির উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. সীতেশ চন্দ্র বাছার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সিন্ডিকেটে বিশ্ববিদ্যালয় এবং হল খোলার সিদ্ধান্ত আগেই ছিল। এখন শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরতে চাইলে আমরা ক্লাস শুরু করতে পারব। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যত দ্রুত ক্লাস-পরীক্ষা শুরু করতে চায়, তত ভালো। উপাচার্য নিয়োগের বিষয়টি সরকার দেখবে। অভিভাবক না থাকাটা তো অবশ্যই প্রভাব ফেলে।’

এদিকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখা যায়নি বললেই চলে। শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতিও একেবারে কম। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকটা একই অবস্থা দেখা গেছে। তবে শিক্ষার্থীর পদচারণে মুখর ছিল টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। শুরুর দিক থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়। বিরতির পর গতকাল থেকে শুরু হয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। উপস্থিতির হার ৫০ শতাংশের কিছু বেশি বলে জানা গেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই-একটি বিভাগে সীমিত পরিসরে ক্লাস শুরু হলেও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল কম। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, উপাচার্যসহ প্রশাসনের ৭৫ জনের বেশি কর্মকর্তা পদত্যাগ করায় সিন্ডিকেট সভা ডাকা সম্ভব হয়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এখন সিন্ডিকেট সভা ডেকে খুলতে হবে, চালু করতে হবে। আমাদের এই মুহূর্তে প্রশাসন নেই। আমাদের কোনো ভারপ্রাপ্ত প্রশাসনও নেই। ফলে এই সিন্ডিকেট সভা ডাকার মতো কেউ নেই। অধ্যাদেশ অনুসারে ক্লাস শুরু করতে গেলে আমাদের উপাচার্য লাগবে।’

অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত মতে, ১৯ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু হওয়ার কথা থাকলেও অনির্দিষ্টকালের জন্য তা স্থগিত করা হয়েছে। গত বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিস থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এতে বলা হয়, ১৯ আগস্ট থেকে একাডেমিক কার্যক্রম চালুর বিষয়ে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়েছে। তা ছাড়া আবাসিক হলে নতুনভাবে সিট বরাদ্দ না দেওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের হলে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

সীমিত পরিসরে ক্লাস শুরু হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুই-এক দিনের মধ্যে পুরোদমে শুরু হতে পারে। ২৫ আগস্ট থেকে সশরীরে ক্লাসে বসবেন খুলনা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তবে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো ক্লাস শুরুর সিদ্ধান্ত জানায়নি। সেশনজটের আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া হবে।

চবি শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘ঈদের ছুটি ও আন্দোলন মিলিয়ে প্রায় তিন মাস ধরে আমাদের কোনো পড়াশোনা নেই। রবিবার থেকে অন্যান্য ক্যাম্পাস খুলে দিলেও আমরা পড়েছি বিপাকে। এমন অচলাবস্থা আরও দীর্ঘ হলে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। এমনটা মেনে নেওয়া যায় না। এবার আমরা ক্লাসে ফিরতে চাই।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘দীর্ঘ দিন আন্দোলনের ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় গ্যাপ তৈরি হয়েছে। আমরা আশঙ্কা করছি একটি সেশনজটে পড়তে পারি। যারা শিক্ষক রয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে যেন এখন থেকে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারেন।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান ফিজু বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের সমস্যা, অ্যাকাডেমিক সমস্যা থাকলে আমরা তা সমাধান করব। সেশনজট নিরসনে প্রয়োজনে অতিরিক্ত ক্লাস নেব। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বাড়ানো হবে।’

জাহাঙ্গীরনগরে বিক্ষোভ : দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ আহমেদকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। এরপর শহীদ মিনারের পাদদেশে সমাবেশ করেন তারা।

সমাবেশে অভিযোগ করা হয়, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার পর দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় অধ্যাপক ফরিদ আহমেদ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের রাজাকার বলে সম্বোধন করেছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় ইন্ধন ও মদদ দিয়েছেন।

এ ছাড়া ক্যাম্পাসে দলীয় ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী রাজনীতি বন্ধ, আবাসিক হলে রাজনৈতিক ব্লক ও গণরুম-গেস্টরুম নির্মূলসহ  ছাত্র সংসদ (জাকসু) চালুর দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা।

বিকেল পৌনে ৫টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায় সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন তারা।

সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জাবি শাখার সমন্বয়ক আহসান লাবিবের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন আরেক সমন্বয়ক তৌহিদ মোহাম্মদ সিয়াম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত