ক্ষমতার পালাবদলে উপাচার্য, প্রক্টর, হল প্রাধ্যক্ষ ও ডিনদের লাগাতার পদত্যাগে অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যাম্পাস খুললেও ক্লাসে ফিরছেন না শিক্ষার্থীরা। গণহারে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে চলছে আন্দোলন। বাধ্য হয়ে অনেক শিক্ষক বিভাগ ইনস্টিটিউটেই আসছেন না। আন্দোলনের মুখে অনেকেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছেন। বর্তমানে প্রায় সব বিভাগ, ইনস্টিটিউট, প্রশাসনিক ভবন ও হলে শিক্ষার্থীদের অভিযান চলছে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রশাসকের ভূমিকাও পালন করছেন তারা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অভিভাবকহীন ক্যাম্পাস অনেকটা অশান্ত-অনিয়ন্ত্রিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত উপাচার্য নিয়োগ না হলে সংকট আরও বাড়বে। দীর্ঘদিন উপাচার্য না থাকায় সংকটগুলো তৈরি হচ্ছে বলে মত অনেকের।
৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ১০ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯তম উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাকসুদ কামাল পদত্যাগ করেন। স্বাধীনতার পর এত লম্বা সময় উপাচার্যহীন থাকেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। উপাচার্যের পদত্যাগ বা মেয়াদ শেষ হওয়ার এক দিনের মধ্যেই উপাচার্য নিয়োগ বা ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য দিয়ে চলেছে বিশ্ববিদ্যালয়। সর্বশেষ ২৮তম উপাচার্যের মেয়াদ ২ নভেম্বর শেষ হলে ৪ নভেম্বর দায়িত্বগ্রহণ করেছিলেন অধ্যাপক মাকসুদ কামাল।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে গত ১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। খালি করা হয় হলগুলো। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ৬ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক হলসহ ক্যাম্পাস খুলে দেওয়া হয়। তবে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরতে পারেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সর্বশেষ আনুষ্ঠানিকভাবে মে মাসে ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ৮ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. মাকসুদুর রহমানসহ প্রক্টরিয়াল বডির সবাই পদত্যাগ করেন। ফলে নিরাপত্তার দায়িত্বে নেই কোনো প্রশাসন। অন্যদিকে আগাম অবসরের জন্য আবেদন করেছেন রেজিস্ট্রার প্রবীর কুমার সরকার। ফলে দাপ্তরিক কার্যক্রমও রয়েছে অনেকটা বন্ধ।
এরই মধ্যে বেগম রোকেয়া হল, কবি সুফিয়া কামাল হল, শামসুন্নাহার হল, বিজয় একাত্তর হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলসহ অন্তত ১০টি হলের প্রাধ্যক্ষও পদত্যাগ করেছেন। হলগুলোয় বৈধ সিট দেওয়ার কথা থাকলেও সেটিও বন্ধ হয়ে আছে অভিভাবক না থাকায়। শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো করে সিট বুঝে নিচ্ছেন। এর জন্য বিভিন্ন হলে গ-গোলও হতে দেখা গেছে। কে হলে থাকবে না থাকবে, সেটিও নির্ধারণ করছেন শিক্ষার্থীরা।
গতকাল সোমবার শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে পদত্যাগ করেছেন কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবদুল বাছির ও চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি ইনস্টিটিউট, বিভাগের প্রধানদের পদত্যাগের আন্দোলন চলছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ম্যানেজমেন্ট, সমাজবিজ্ঞান। এ ছাড়া প্রায় সব বিভাগে কতিপয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি না জানানোসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনে অব্যাহতি এবং ক্ষমা চাওয়ার দাবি উঠেছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের জামায়াত-শিবির সম্বোধন ও মামলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক আ ক ম জামাল উদ্দীনকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিনাত হুদার পদত্যাগ চেয়েছেন তারা। গতকাল সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন বরারর চার দফাসংবলিত স্মারকলিপি দেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় দাবি মেনে নেওয়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেন তারা। দাবি না মানা পর্যন্ত বিভাগের কোনো কার্যক্রমে অংশগ্রহণ না করার কথা জানান শিক্ষার্থীরা।
গত রবিবার থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলেও ক্লাসে ফেরেননি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দাবি, আন্দোলনের সময় যেসব শিক্ষক নিপীড়নকারীদের পক্ষ নিয়েছেন, সেই সব শিক্ষকের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তারা ক্লাসে ফিরবেন না। তাদের অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনসহ বিভিন্ন অনুষদে ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালাচ্ছেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক নড়বড়ে হয়ে যাওয়ায় এবং শিক্ষকদের বিরুদ্ধে টানা আন্দোলন চলায় ক্লাসের পরিবেশ সহজে ফিরবে না বলে মনে করেন অনেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী সাবিকুন নাহার বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং হলের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন অত্যাবশ্যক। বহিরাগতদের সম্পূর্ণভাবে ক্যাম্পাস থেকে দূরে রাখতে হবে। ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি থাকবে না, তা যে দলেরই হোক না কেন। ডাকসু হবে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের একমাত্র সংগঠন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, অভিভাবক না থাকায় ক্যাম্পাসে কিছু সমস্যা তো হচ্ছেই। শিগগিরই হয়তো উপাচার্য নিয়োগ হয়ে যাবে। তারপর আশা করি সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। শিক্ষার্থীরা চায় এই ক্যাম্পাসে আর কোনো অন্যায়, অবিচার না থাকুক।
ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টানা এত দিন উপাচার্যহীন কখনোই ছিল না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দ্রুত উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে এই ক্যাম্পাস স্বাভাবিক করা উচিত। আশা করি সরকার সেদিকে গুরুত্ব দেবে। নতুন উপাচার্যের হস্তক্ষেপে শিক্ষা, শিক্ষার্থীবান্ধব এবং গবেষণাবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠবে বলে আমরা আশাবাদী।’
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করলেও দায়িত্বে বহাল রয়েছেন উপ-উপাচার্য ( প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ ও উপ-উপাচার্য ( শিক্ষা) অধ্যাপক সীতেশ চন্দ্র বাছার। বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে চলছে জানতে চাইলে অধ্যাপক সীতেশ চন্দ্র বাছার বলেন, ‘অভিভাবক না থাকলে যেটা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় খুব ভালো চলছে বলা যাচ্ছে না। কোনো মতে চলছে। অফিসের ফাইলপত্র অনেক আটকে আছে। বিভিন্ন জায়গায় অনেক সমস্যা হচ্ছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম কবে স্বাভাবিক হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরানোর চেষ্টা করছি। উপাচার্য নিয়োগ হলে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’
