গণ-আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের যে পতন হতে চলেছে তার কোনো আভাসই পাননি দলটির প্রভাবশালী নেতারা এবং গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা (এমপি)। তাই দেশ ছেড়ে পালানোরও কোনো পরিকল্পনা ছিল না তাদের। বরং ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার আগের দিন রাতেও অধিকাংশ নেতা ও মন্ত্রীদের মুখাবয়বে ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ এবং দাম্ভিকতাপূর্ণ আচরণ। সরকারের পতন হবে জানলে আগেই দেশ ছেড়ে পালাতেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ১০ দিনের রিমান্ডে থাকা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ এই ব্যবসায়ী জিজ্ঞাসাবাদে এমন মন্তব্য করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদ ও মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা সালমান এফ রহমানকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘গত ৪ আগস্ট সরকার পতনের আগের রাতে সালমান এফ রহমানের প্রটোকলের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা তার বাসা ও অফিসের বিলাসবহুল কয়েকটি গাড়ি নিরাপদে রাখার অনুমতি চেয়েছিলেন। সেই কর্মকর্তাদের তখন ধমক দিয়ে হুংকারের সুরে কথা বলেন সালমান এফ রহমান। ওইদিন রাতের ঘটনা উল্লেখ করে জিজ্ঞাসাবাদে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের তিনি (সালমান এফ রহমান) বলেন, “সরকার পতন হবে জানলে তো আমিও এমনটা করতাম না। নিজেই পালাতাম আগের দিন”।’
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় গত ১৬ জুলাই রাজধানীর নিউ মার্কেট থানা এলাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজের বিপরীত পাশে কাদের আর্কেড মার্কেটের সামনে গুরুতর জখম হন ওই এলাকার হকার শাহজাহান আলী। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিউ মার্কেট থানায় হওয়া হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন সালমান এফ রহমান এবং সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নৌপথে পালানোর সময় গত মঙ্গলবার রাজধানীর সদরঘাট এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানায় পুলিশ। পরদিন তাদের আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। তারা বর্তমানে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) হেফাজতে আছেন। তবে হত্যা মামলাটি তদন্ত করছে নিউ মার্কেট থানা-পুলিশ। রিমান্ডে ধারাবাহিক জিজ্ঞাসাবাদে নানা তথ্য দিচ্ছেন এই দুজন। হাজার হাজার কোটি টাকা উপার্জন ও বিদেশে পাচারের বিষয়ে সালমান এফ রহমান বলেছেন, তিনি একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসায় প্রয়োজনে দেশ ও দেশের বাইরে টাকাপয়সা লেনদেন করতে হয়েছে তার। জোর গলায় বলেছেন, অবৈধভাবে কোনো টাকাই বিদেশে পাচার করেননি তিনি।
একই মালায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে আনিসুল হক ও আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (চাকরিচ্যুত) জিয়াউল আহসানকে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আনিসুল হক জিজ্ঞাসাবাদে কোনো প্রশ্নেরই জবাব দেননি। তবে জিয়াউল আহসান জিজ্ঞাসাবাদে খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, র্যাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের সময় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের গুম-খুনের বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে।
এদিকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক কোনো তথ্য দিতে পারছেন না। কোনো কিছু জানতে চাইলেই মাথা নিচু করে শুধু নীরবে কাঁদেন। এমনকি ছয় বছর ধরে চালানো নিজের মন্ত্রণালয়ের কোনো কাজের দায়দায়িত্বও নিতে অস্বীকার করছেন সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলছেন, মন্ত্রণালয় তিনি চালালেও কোনো কিছুই তিনি একা করেননি।
গত ৬ আগস্ট বিদেশে যাওয়ার সময় জুনাইদ আহমেদ পলককে আটকে দেয় বিমানবন্দর কর্র্তৃপক্ষ। তাকে বিমানে উঠতে না দিয়ে ইমিগ্রেশন হেফাজতে রাখা হয়। পরে গত ১৪ জুলাই ঢাকার খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকা থেকে আত্মগোপনে থাকাবস্থায় পলককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গ্রেপ্তারের পর থেকেই ভেঙে পড়েন তিনি। সাবেক এই তরুণ মন্ত্রী পুলিশ কর্মকর্তাদের বলেছেন, তিনি ভাবতেই পারেননি গ্রেপ্তার হবেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নের করা হলে তার জবাব না দিয়ে শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদেন।
১৯ জুলাই রিকশাচালক কামাল মিয়া পল্টন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহতের ঘটনায় পল্টন থানায় মামলা হয়। সেই মামলায় জাতীয় সংসদের সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক, সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকতকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এরপর আদালতের মাধ্যমে ১০ দিনের রিমান্ডে নেয় পল্টন থানা-পুলিশ। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে তাদের ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে রাখা হয়। থানা-পুলিশ হত্যা মামলার বিষয়ে খোঁজখবর নিলেও সার্বিক বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, দেশ ডিজিটাল করার প্রক্রিয়ার ধাপে ধাপে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের হাজার হাজার কোটি টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপস তৈরির নামে টাকা হাতানোর চেষ্টাসহ সার্বিক বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় পলকের কাছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের কাজের সব দায় নিজের কাঁধে নিতে অস্বীকৃতি জানান পলক। প্রশ্নের জবাবে তিনি তদন্ত কর্তাদের বলেছেন, তার মন্ত্রণালয়ে তার ওপরে সরাসরি একজন উপদেষ্টা কাজ করতেন। তিনি একা কিছুই করেননি। ওই উপদেষ্টাসহ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার মন্ত্রণালয়।
জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া এসব তথ্যের ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মাইনুল হাসানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব ভালো বলতে পারবেন জিজ্ঞাসাবাদে থাকা ডিবির লোকজন। আমি সবিস্তারে বলতে পারছি না।’
