মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে আর যাই বলি না কেন, একটা কথা স্বীকার না করলে অন্যায়। তার অতি বড় শত্রুও অন্তত আড়ালে-আবডালে বলতে বাধ্য হতেন যে, তিনি দেয়ালের লিখন পড়তে পারেন। জননেত্রী হয়েছেন, জনগণের ভাষা বুঝতে পারেন বলে। কিন্তু গত এই কয়েক দিনের গণআন্দোলন দমনে তার সরকারের চরম ব্যর্থতা দেখে বলতে বাধ্য হচ্ছি, এই মুহূর্তে তিনি দেয়াল লিখন পড়তে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে এ রকম হবেই। তাছাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনোদিনই গণতন্ত্রের পথে চলতে ভালোবাসেন এ অপবাদ তাকে কেউই কখনো দেননি। দেওয়া সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই, সামান্য ভিন্নমত হলেই তাকে হেনস্তা করা মমতা রাজনীতির অন্যতম দিক। সব স্বৈরাচারী শাসকের মতোই তিনি চাটুকারিতা পছন্দ করেন। ঠিক সেই কারণেই একটু-আধটু অপছন্দের কথা শুনলেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে যাকে যা ইচ্ছে বলেন।
বাঙ্গুর হসপিটাল কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান। সেখানকার বিশিষ্ট ডাক্তার গড়াইকে তিনি ‘মুখে মুখে তর্ক করার’ অপরাধে সাসপেন্ড করলেন মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর পরই। এক টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তানিয়া ভরদ্বাজের নিরীহ প্রশ্নে তিনি উত্তেজিত হয়ে তাকে মাওবাদী বলে গালমন্দ করতে করতে টিভি শো থেকে বেরিয়ে এলেন। শিলাদিত্য বলে এক সাধারণ কৃষক তার কাছে বিনয়ের সঙ্গে সারের দাম বাড়ছে কেন জানতে চাওয়ায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে তাকেও মাওবাদী বলে চিহ্নিত করে পুলিশের হাতে তুলে দিলেন। কামদুনী, পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামে কলেজ পড়ুয়া একটি মেয়েকে রেপ করে খুন করা হলে, গ্রামবাসীদের কেউ কেউ সুবিচার দাবি করা মাত্র তিনি সেই একই ভঙ্গিতে মাওবাদী তকমা লাগিয়ে দিলেন। হতে পারে মাওবাদী নিয়ে ওর অ্যালার্জি রয়েছে। তার পেছনে কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণ থাকতে পারে। কারণ তিনি যাতে মুখ্যমন্ত্রী হন তার জন্য মাওবাদীদের এক অংশ যথেষ্ট সক্রিয় ছিল। নন্দীগ্রাম-পর্বে প্রশাসনের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া সহজ হয়েছিল মাওবাদীদের সহযোগিতায়। সেই ঋণ তিনি শোনা যায়, ক্ষমতায় বসার পরে পরে শোধ করেছিলেন, মাওবাদী নেতা কিষনজীকে ফেইক এনকাউন্টারে শেষ করে। ফলে আজও জঙ্গলমহলে পাতা নড়লেই তিনি মাওবাদের ভূত দেখেন। সামান্য কার্টুন শেয়ার করার অপরাধে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে জেলে ঢোকান। অভিযোগ সেই অধ্যাপক তার প্রাণনাশের ষড়যন্ত্রে যুক্ত। ১৯৪৭ পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে ছবি করার পরেও, মুসলিম-হিতৈষী মমতা ছবির পরিচালকের বাড়িতে তার পুলিশ পাঠিয়ে দেন।
এই প্রেক্ষাপটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আজকের রাজনীতি বুঝতে হবে। তিনি জনপ্রিয় বা পপুলিস্ট রাজনীতি করেন। ফলে যে সব সামাজিক প্রকল্প তিনি নেন, তা পুরোপুরি ভোটবাক্সের কথা ভেবে। ভোটে জেতাই কখনো সার্থক রাজনীতির লক্ষ্য হতে পারে না। বিরোধী রাজনীতিকে সমূলে বিনাশ করলে, আজ বা কাল সে প্রতিশোধ নেবেই। আরজি করের ঘটনায় ঠিক কী কী কারণে জনরোষ আছড়ে পড়ছে পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্রই তা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আত্মসমীক্ষা দরকার ছিল। কিন্তু তিনি তো তা করলেন না, বরং উল্টোপাল্টা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেন। তিনি ও চাটুকারেরা, গণবিক্ষোভ দেখলেই তার পেছনে বিজেপি সিপিএমের হাত দেখেন। এবারও দেখছেন। এ ভারী অদ্ভুত যুক্তি। তুমি রাজনীতি করবে। অন্য কেউ করলে তা যেনতেন ভাবে বন্ধ করতে হবে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে বলা হয়, তিনি বিজেপিবিরোধী। এবং সংখ্যালঘুদের রক্ষক। আরজি করের ঘটনার পর তৃণমূল সরকারের পক্ষ থেকে এক সার্কুলার জারি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, মেয়েদের রাতের ডিউটি কমিয়ে দেওয়ার কথা। একুশ শতকে এভাবে নারীদের অধিকার কেড়ে নেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ঝড় উঠেছে। তৃণমূল মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, এটা তো দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি। ঠিকই তো। এটাই তো সবসময় বলি, দুই সরকারের নীতিই, নারীর ক্ষমতায়ন অস্বীকার করা। তৃণমূল, বিজেপি দুই দলের দর্শন এক। তৃণমূল ভক্তরা রে রে করে বলে উঠেবেন, ‘আমরা সবসময় মেয়েদের সম্মান করি। দলে মেয়ে সাংসদ, বিধায়ক, পঞ্চায়েত সদস্য অন্যান্য বিরোধী দলের চেয়ে বেশি।’ কিন্তু তারা ভুলে যান, মহিলা হলেও সে পুরুষতান্ত্রিক হতে পারে। না হলে মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ সরকার, মেয়েদের নাইট ডিউটি না করার নীতিনির্ধারণের নিদান দিত না। সংখ্যালঘু প্রশ্নে মমতা সরকারকে যারা ক্লিনচিট দেন, তারা ভুলে যান যে সাচার কমিটির রিপোর্টে যা যা করণীয় তার কতটা এই সরকার করেছে তার শ্বেতপত্র এখনো প্রকাশিত হয়নি। সরকারি চাকরিতে মুসলিম জনসংখ্যার কত শতাংশ রয়েছে তা জানতে চান। ওয়াকফ সম্পত্তির কতটা বেহাত হয়ে গেছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠুক।
আসলে জনমোহিনী রাজনীতির কৌশল এটাই, যে চোরকে বলব চুরি করতে আর গৃহস্থকে সজাগ থাকতে বলব। যখন যেমন তখন তেমন নীতির পেছনে কোনো দর্শন নেই। দর্শনবিহীন দলের পক্ষে মনুবাদকে বেশিদিন আটকে রাখা মুশকিল। আরজি কর আন্দোলনের পক্ষে তথাকথিত রাজনীতির দল যতটা আছে, তারচেয়ে অনেক বেশি আছে হাজার হাজার জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লাল চোখকে পরোয়া না করে সমাজের সর্বস্তরের জনগণ আওয়াজ তুলেছেন হিন্দু মুসলিম এক স্বর, বিচার চায় আরজি কর। স্বাধীনতার পর এই প্রথম ইস্ট বেঙ্গল, মোহনবাগান, মোহামেডান স্পোর্টিং সমর্থকরা পুলিশের লাঠির সামনে দাবি তুলেছেন, সব দলের এক স্বর, বিচার চায় আরজি কর। আট থেকে আশি সব বয়সের লোক রোজ আসছেন প্রতিবাদ জানাতে। ডাক্তার মেয়েটিকে যেভাবে নিজের কর্মক্ষেত্রে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে তা কারোর পক্ষেই সমর্থনযোগ্য নয়। প্রমাণ লোপাটের জন্য উচ্ছৃঙ্খল লোকজনকে দিয়ে আরজি কর ভাঙার রহস্য মানুষের কাছে স্পষ্ট। শুধু স্পষ্ট নয়, নিহত মেয়েটির বাবা-মায়ের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের দুর্ব্যবহার। প্রথম দিকে তো পুরো ঘটনা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। মেয়েরা রাত দখল করো বলে সারা পৃথিবীর মেয়েরা রাস্তায় না নামলে হয়তো সব ধামাচাপা দেওয়া হতো। এ নিছক মমতা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নয়, এ এক অচলায়তনকে ধাক্কা।
মাও সে তুং বলতেন, যা কিছু পুরনো তাই-ই ঐতিহ্য নয়। তিনি সকাল বেলার সূর্যকে স্বাগত জানাতেন নির্দ্বিধায়। বাংলাদেশ নিয়ে প্রাচীন, বাতিল হয়ে যাওয়া সিনিকরা যাই বলুক, নিঃসন্দেহে ছাত্র-তরুণরা দেখিয়ে দিয়েছেন যে, জোটবদ্ধ হলে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব। ষাট দশকের পর সারা দক্ষিণ এশিয়ার ছাত্র বিক্ষোভ নতুন চেহারা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। এ বিদ্রোহ শুধু ক্ষমতা দখলের আন্দোলন নয়। এ পুঁজির বিরুদ্ধে লড়াই। এ লড়াই বৃদ্ধতন্ত্র, পুরুষতন্ত্র, মনুবাদকে উৎখাত করার ডাক। দেশে দেশে চেহারা, নাম, স্লোগানের ভাষা আলাদা হলেও বর্শামুখ এক। স্বৈরাচারী শাসনের হাত থেকে মজলুম জনতার মুক্তি।
এ এমন এক সময়, যখন পরিচিত রাজনীতির পরিভাষা আপনি খুঁজে নাও পেতে পারেন। আপনার চেনা বহু ন্যারেটিভ দেখছেন বদলে যাচ্ছে। বামপন্থি রাজনীতির অন্দরেও নতুন হাওয়া আসছে। নতুন বামপন্থা জন্ম নিচ্ছে অচেনা তরুণদের হাত ধরে। গেল গেল বলে বাতিল করলে পস্তাতে হবে। বাম-ডান নানা প্রচলিত সমীকরণ পাল্টে যাবে। ইতিমধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যেও ভিন্নস্বর প্রকাশ্যে আসছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জায়গায় বিজেপি এলে আরও খারাপ হবে পরিস্থিতি বলে জুজুর ভয় দেখিয়ে স্থিতাবস্থা সমর্থন করে লাভ নেই। তখনো রাস্তাই হবে জনতার একমাত্র রাস্তা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্ভাগ্য তিনি এই সময়ের দেয়াল লিখনের ভাষা বুঝতে পারছেন না। এর খেসারত কিন্তু তাকে দিতে হবে। ডোলের রাজনীতি চিরদিন জেতে না।
লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
