জুয়াড়িদের ব্যাংক হিসাব স্থগিতে পুঁজিবাজারে আতঙ্ক

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৪, ০২:২৫ এএম

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান, তার ছেলে ও কয়েকজন জুয়াড়ির ব্যাংক হিসাব স্থগিতে ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন পদক্ষেপে চিহ্নিত কারসাজিকারকরা সতর্ক অবস্থান নিতে শুরু করেছেন। ফলে ব্যক্তিশ্রেণির এসব বড় বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়িয়ে দিয়েছেন, যার প্রভাবে গতকাল বড় ধরনের পতন হয়েছে। প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কেনাবেচা হওয়া ৯৪ শতাংশ দর হারিয়েছে। এতে স্টক এক্সচেঞ্জটির প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ১০৮ পয়েন্ট বা প্রায় দুই শতাংশ।

পুঁজিবাজারে বেনামে বিনিয়োগ ও কারসাজিকারকদের সঙ্গে মিলে একটি বিশাল চক্র গড়ে তুলেছিলেন এসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার এই কারসাজি চক্রে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও মার্চেন্ট ব্যাংকারদের সংগঠন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাবেক সভাপতি মো. ছায়েদুর রহমান, আলোচিত কারসাজিকারক মো. আবুল খায়ের, বিভিন্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালকসহ অনেকেই রয়েছেন। গত কয়েক বছর ধরেই পুঁজিবাজারের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ এই চক্রের হাতে। বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার এই কারসাজি চক্রের আট জনের ব্যাংক হিসাব স্থগিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে চক্রের অন্য সদস্যরা ভীত হয়ে পোর্টফোলিও নিরাপদ রাখতে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন নতুন সরকার গঠনের পর পুঁজিবাজারে সাময়িক উল্লম্ফন তৈরি হলেও তা টিকতে পারছে না। গত পাঁচ কার্যদিবস ধরেই টানা দরপতনের ধারায় রয়েছে বাজার। লেনদেন কমেও শক্তি হারাচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার। নতুন সরকার গঠনের পর গত ১১ আগস্ট ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন দুই হাজার কোটি টাকা ছাড়ালেও গতকাল তা ৫০০ কোটির ঘরে নেমে এসেছে। টানা পতনে অনেক শেয়ার ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ছে।

২০২০ সালের ১৭ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম প্রথমবার এসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর গত ২৮ এপ্রিল পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরোধিতা সত্ত্বেও চলতি বছরের ২৮ মে তাকে ৪ বছরের জন্য পুনর্নিয়োগ দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার বিরুদ্ধে পুঁজিবাজারের কারসাজিকারকদের অনৈতিক সুবিধা প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। পুঁজিবাজারে গত কয়েক বছরে শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে যেসব ব্যক্তি বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম জাভেদ এ মতিন, আবুল খায়ের ও ছায়েদুর রহমান অন্যতম। এছাড়া শিবলী রুবাইয়াতের কাছ থেকে নানা সুবিধা পেয়ে আলোচনায় ছিলেন শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুছ, এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান এসএম পারভেজ তমাল, পরিচালক আদনান ইমাম, তালিকাভুক্ত কোম্পানি ফরচুন শুজের মালিক মিজানুর রহমান, জাতীয় ক্রিকেট দলের অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানসহ তার ভাই এবং পরিবারের সদস্যরা। পুঁজিবাজারের দরপতনে এরাই প্রধান ভূমিকা রাখছেন বলে জানা গেছে।

লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল লেনদেনের শুরু থেকেই প্রবল বিক্রিচাপ দেখা যায় এবং প্রায় ৯০ শতাংশ শেয়ার দর হারায়। অধিকাংশ শেয়ার সর্বোচ্চ দর হারিয়ে ক্রেতাশূন্য পরিস্থিতি তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে লেনদেনের প্রথম ঘণ্টায় ডিএসইর প্রধান সূচক আগের দিনের চেয়ে ১২০ পয়েন্ট কমে যায়। এরপর সূচকের সামান্য ওঠানামা দেখা গেলেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। দিনশেষে ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ১০৮ পয়েন্ট কমে ৫৬০৬ পয়েন্টে নামে। সূচক পতনে অগ্রণী ভূমিকা ছিল ইসলামী ব্যাংক, বিএটিবিসি, স্কয়ার ফার্মা, গ্রামীণফোন, ব্র্যাক ব্যাংক,  রেনাটা, লাফার্জহোলসিম ও বেক্সিমকো ফার্মা। গতকালের দরপতনে এসব কোম্পানি সম্মিলিতভাবে সূচকের ৪৮ পয়েন্ট কমাতে ভূমিকা রেখেছে।

গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৯৪টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর বড়েছে মাত্র ১১টির। বিপরীতে কমেছে ৩৭১টির ও অপরিবর্তিত রয়েছে ১২টির দর। অবশ্য দরপতনের দিনে লেনদেন সামান্য বেড়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত