‘প্রায় ২০ দিন ধরে আমরা নামমাত্র অফিস করছি। কারও কোনো নির্দেশনা নেই। কে অফিসে আসছে, কে আসছে না, দেখার বা বলার কেউ নেই। অফিসে এলেও টেনশন কাজ করে। কখন কে কী বলে চিন্তায় থাকতে হয়। এভাবে চলে না।’
দেশ রূপান্তরের কাছে এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক পরিচালক। এই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও বলেন, ‘প্রকল্পগুলো বন্ধ রয়েছে। টিকাদান কর্মসূচিগুলো চলছে না। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় সেবা অনিয়মিত হয়ে গেছে। আমরা কিছু ডেস্ক ওয়ার্ক করছি। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রাণ। এখন আমরা পরিস্থিতি ভালো হওয়ার আশায় আছি।’
একই রকম পরিস্থিতি বর্ণনা করলেন একটি সরকারি হাসপাতালের একজন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া এক পরিচালক। তিনিও নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসপাতাল চলছে। কিন্তু চিকিৎসকরা সবাই ঠিকমতো আসছেন না; বিশেষ করে তরুণ চিকিৎসকদের রাখা যাচ্ছে না। তারা বিভিন্ন আন্দোলনে ব্যস্ত। কাউকে কাজে থাকতে জোর করা যাচ্ছে না। কারণ আমিও কখন চলে যাই তার ঠিক নেই।’
এই দুই প্রতিষ্ঠানের মতো সারা দেশের স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও একই রকম। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকেই স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধের দাবিতে আন্দোলনে নামেন বিভিন্ন স্তরের চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্য খাতের স্বাস্থ্যকর্মীরা। তাদের মূল দাবি, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আওয়ামী লীগপন্থি ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পদত্যাগ ও বৈষম্য নিরসন।
এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্যের বিভিন্ন খাতের সিনিয়র লোকজনদের নিয়ে এত দিনে একটি কমিশন বা কমিটি করা উচিত ছিল। আন্দোলনকারীরা তাদের সমস্যা ওই কমিটির কাছে উপস্থাপন করবে। কমিটি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সমাধান কী হতে পারে, তা বের করবে। পরে কমিটি তাদের মতামত উপদেষ্টার কাছে উপস্থাপন করবে। পরে উপদেষ্টা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেবেন। কারণ আমরা চাই একটা ভালো বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশ আগের চেয়েও ভালো হবে।’
‘কিন্তু এই উপদেষ্টার কোনো অ্যাকশন দেখছি না’ বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘অনেক দিন তো হয়ে গেল। অন্য মন্ত্রণালয়ে যে রকম কিছু অ্যাকশন দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সে রকম দৃশ্যমান কিছু দেখছি না। দৃশ্যমান স্বচ্ছ অ্যাকশন দেখাতে হবে। যাতে জনগণ বোঝে কাজ হচ্ছে।’
বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১৫ বছরে সব খাতেই লুটপাট হয়েছে। কিন্তু বেশি অনিয়ম হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। আমার ছাত্র, যাকে আমি পড়িয়েছি, সে আমাকে টপকিয়ে অধ্যাপক হয়ে গেছে। আমার বন্ধু আমার পরে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করেছে। কিন্তু আমি মেডিকেল অফিসার, সে আমার বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান। এই যে বৈষম্য, এটা স্বাস্থ্যের সব ক্ষেত্রে হয়েছে। সে কারণে অসন্তুষ্টিটাও বেশি। যারা আন্দোলনে নেমেছে, তাদের অধিকাংশের দলীয় পরিচয় নেই, তারা বৈষম্য থেকেই আন্দোলন করছে।’
এই নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিগত সময়ের যারা স্বাস্থ্য খাতের নিয়ন্ত্রক, তাদের একজনও এখনো অপসারণ হয়নি। অবৈধ সুবিধাভোগী ও অনিয়মগুলোর হোতা, তারা প্রতিটি জায়গায় বহাল তবিয়তে বসে আছে। তাদের সরানো হলে এত উত্তেজনা থাকত না। যারা স্বাস্থ্য খাতকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের দ্রুত বদলাতে হবে। প্রতিটি জায়গায় নিরপেক্ষ লোক দিতে হবে। তা হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসবে।’
মাঠে আট ব্যানারে আন্দোলনে স্বাস্থ্য পেশাজীবীরা : এই মুহূর্তে যেসব সংগঠন আন্দোলনে মাঠে রয়েছে, সেগুলো হলো বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশন, দেশের ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রধান কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা, বৈষম্যবিরোধী চিকিৎসক-কর্মচারী আন্দোলন, বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পরিবার পরিকল্পনা) ক্যাডার, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রাইভেট ট্রেইনি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিএনপিপন্থিদের পেশাজীবী সংগঠন ড্যাব, ড্যাব কেন্দ্রীয় পরিষদ, তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। সর্বশেষ মাঠে নেমেছে পরিবার পরিকল্পনা সরকারি চিকিৎসক সমিতি।
অর্থাৎ আট ধরনের সংগঠন ও ব্যানারে আন্দোলন করছেন সব ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীরা। এতে অচল হয়ে পড়েছে সরকারের একটি চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় ও পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার (বিএমআরসি) ও বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস)।
অভিভাবকহীন তিন প্রতিষ্ঠান, অচল আরও তিন : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছেন বিএসএমএমইউর উপাচার্য, দুই উপ-উপাচার্য, প্রক্টর ও রেজিস্ট্রার। বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ নতুন উপাচার্য না আসা পর্যন্ত সেখানে সাধারণ সাত চিকিৎসককে প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্বে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো আসছেন না আওয়ামীপন্থি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা। ফলে অচলাবস্থা বিরাজ করছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। সেখানে ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হিসেবে অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিনকে দায়িত্ব দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু তাকে মেনে নিচ্ছেন না অধিদপ্তরের চিকিৎসক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তাকে আওয়ামীপন্থি হিসেবে দাবি করে তাকে প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। একই অভিযোগে অভিযুক্ত করে অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীরেরও প্রত্যাহার দাবি করেছেন তারা। ফলে এই কার্যালয়ে এখন ঢুকতে পারছেন না ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
গতকাল অধিদপ্তরে গিয়ে দেখা গেছে, ডা. রোবেদ আমিন, ডা. আহমেদুল কবীরসহ বেশির ভাগ কর্মকর্তা অফিসে নেই। অনুপস্থিত কর্মকর্তাদের মধ্যে পরিচালক, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজারসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা আছেন।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও দুই অতিরিক্ত মহাপরিচালককে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ওএসডি করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এই প্রতিষ্ঠানও এখন অভিভাবকহীন।
বকেয়া ভাতা পরিশোধসহ ৭ দফা দাবি আদায়ে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) কার্যালয়ের গেটে গত মঙ্গলবার তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রাইভেট ট্রেইনি চিকিৎসকরা। তারা সেখানে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে পারছেন না কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা (সিএইচসিপি) তাদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের দাবিতে গত মঙ্গলবার থেকে ঢাকায়। তারা বিএমআরসি ঘেরাও ও শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। বিএমআরসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী সিএইচসিপিদের চাকরি স্থায়ী ও রাজস্বকরণের জন্য গঠিত কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি। তার পদত্যাগ চান তারা। কারণ এই চিকিৎসক ১৩ বছরেও চাকরি রাজস্বকরণের কোনো পদক্ষেপ নেননি। এমনকি সিএইচসিপিরা ঢাকায় থাকায় বন্ধ রয়েছে দেশের সব কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম।
বাংলাদেশ মেডিকেল এবং ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) কর্র্তৃক ম্যাটস, ডিএমএফ, এলএমএফ পাস করা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টদের ‘ডিপ্লোমা মেডিকেল প্র্যাকটিশনার’ হিসেবে বিবেচিত করার প্রতিবাদসহ তিন দফা দাবিতে ‘মার্চ টু বিএমডিসি’ কর্মসূচি পালন করছেন কর্মসূচির অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন সাধারণ চিকিৎসক ও চিকিৎসা শিক্ষার্থী সমাজের ব্যানারে চিকিৎসক ও চিকিৎসা শিক্ষার্থীরা। তারা বিএমডিসি কর্মকর্তাদের অপসারণও দাবি করেছেন। ফলে স্থবির এই প্রতিষ্ঠানও।
বৈষম্যের শিকার চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি, পদায়নের দাবিতে গত মঙ্গলবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) শহীদ ডা. মিলন চত্বরে মানববন্ধন ও অবস্থান ধর্মঘট করেছে ড্যাব ঢাকা মেডিকেল কলেজ শাখা। সেদিন ঢামেকের ১২ জন শিক্ষকের ক্লাস বর্জন এবং তাদের বদলির দাবিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের কাছে স্মারকলিপি দেন আন্দোলনকারীরা। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে দেওয়া ওই স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়েছে ওই সব শিক্ষক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন।
