প্লাস্টিকের ছাউনিতে চাপা পড়া লাল বইটা

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৪, ১২:১৭ এএম
২০২২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সূর্যের আলো ফোটার কিছু পরেই সাহের উল্লাহ এবং শাহীনা বেগম দম্পতির কোল আলো করে মোহাম্মদ সেলিম নামক এক শিশু পৃথিবীর রূপ দেখে (ব্যক্তিগত নিরাপত্তা জনিত কারণে নাম পরিবর্তিত)। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তাকে দুটি পৃথক নম্বর বরাদ্দ করা হয়। একটি ১৪৮২০২২১২২৯১০৪০১৫ যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অপরটি এসটিজে-০০৪৪১৬৫৫ যেটি জাতিসংঘ রিফিউজি কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত প্রোফাইল গ্লোবাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম আইডেন্টিফিকেশন নম্বর যা সংক্ষেপে ‘প্রোগ্রেস আই ডি’ নামে পরিচিত। 
 
সাহের-শাহীনা দম্পতির জন্য সেপ্টেম্বরের সেই সকালটা সুন্দরতর হতে পারতো, সূর্যটা সেদিন আরও উজ্জ্বল হতে পারতো যদি তাদের নবজাতক মোহাম্মদ সেলিম তার নিজ দেশের, নিজ সরকার প্রদত্ত একটি জন্মনিবন্ধন নম্বর বহন করতে পারতো। কিন্তু পরিণতি হচ্ছে, শিশু সেলিম আজ এমন এক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, যেখান থেকে তাকে এমন কিছু নম্বর বহন করতে হয় যা একটি অনিশ্চিত এবং অনাকাঙ্কিত ভবিষ্যৎ নির্দেশ করে। 
 
রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে বসবাসরত একটি মুসলিম সংখ্যালঘু গোষ্ঠী যারা একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগত পরিচয় বহন করে। ঐতিহাসিকভাবে আরাকান (বর্তমানে রাখাইন) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি স্বাধীন রাজ্য যেখানে ভিন্ন সংস্কৃতি এবং জাতিসত্ত্বা বিদ্যমান ছিল। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ শাসকেরা চাষাবাদ এবং বাণিজ্যের কারণে আশেপাশের এলাকা থেকে জনগণকে স্থানান্তরে উদ্বুদ্ধ করেন যারা আরাকানের অংশ হিসেবে সমাজ গঠনে অবদান রাখেন। ঐতিহাসিকগণ আরাকানে রোহিঙ্গাদের শিকড় বহু শতাব্দী ধরে খুঁজে পেলেও মিয়ানমার সরকারের দাবি, তারা অন্যত্র হতে অবৈধভাবে আগমন করে বসতি স্থাপন করেছেন। বার্মার স্বাধীনতা পরবর্তী সরকাররা দ্বারা রোহিঙ্গাদের অধিকার ক্রমশই সীমিত হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৮২ সালে বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন পাস হয় যা বস্তুতপক্ষে রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন করে দেয়। 
 
রোহিঙ্গা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে মতভেদ থাকলেও আরাকানের রাজধানী ‘ম্রোহং’ অথবা ‘রাখাইং’ শব্দ থেকেই যে রোহিঙ্গা শব্দটি এসেছে সে বিষয়ে বিস্তর প্রমাণ রয়েছে। ঐতিহাসিকগণের মতে, রাখাইং থেকে রোয়াং এবং তা থেকে পরবর্তীতে রোহাং শব্দটির আগমন। তাই আরাকানের তিব্বতী শব্দ রোহাং বিকৃত হয়েই রোহিঙ্গা শব্দের উৎপত্তি। 
 
আবার জানা যায়, রাজধানীর নাম ম্রোহং সাধারণ জনগণের মুখে বিকৃত হয়ে মোহং, তা থেকে রোহাং, রোসাং এবং শেষে রোসাঙ্গ হয়েছে। আঞ্চলিক উচ্চারণের ক্ষেত্রে ‘স’ পরিবর্তিত হয়ে ‘হ’ হয়ে রোহাঙ্গ এবং অপভ্রংশ হয়ে ‘রোহিঙ্গা’ হয়েছে যা দ্বারা আরাকান অঞ্চলে বসবাসকারী মুসলিম সম্প্রদায়কে বোঝানো হতো।
 
রাজা মহাতাইং চন্দ্রের রাজত্বকালে (৭৮৮-৮১০ খ্রি.) কয়েকটি বিদেশী বাণিজ্য জাহাজ রামরী দ্বীপের কাছে ডুবে গেলে প্রাণ বাঁচানো নাবিকেরাও আরাকানে বসতি স্থাপন করে। আবার ইরাক থেকে যেসব বাণিজ্য জাহাজ যে স্থানে আসতো তার নাম ছিল আল-কারান যা আরাকানের আরবী অপভ্রংশ হতে পারে। উক্ত আল-কারান অঞ্চলের মানুষের ভাষার সঙ্গে চট্টগ্রামের স্থানীয় ভাষার মিল ছিল বলেও আল-ইদ্রিসীর রচনায় উল্লেখ আছে। আবার ১৩’শ শতকে ইসলাম প্রচার এবং ব্যবসার উদ্দেশ্যেও মুসলমানরা মালাক্কা উপকূল থেকে এ অঞ্চলে আগমন করেন। অনেকে ধারণা করেন, ফারসী শব্দ ‘এক-আব’ থেকে আকিয়াব শব্দের উৎপত্তি যেটিও বস্তুতপক্ষে মুসলমানদের গোড়াপত্তনই নির্দেশ করে। 
 
১০৫৭ হতে ১২৮৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্যাগান রাজাদের শাসনামলে রাজা নরসিংহপতি ৪০০০ মঙ্গোল সৈন্যকে তার রাজ্যে বসবাসের অনুমতি প্রদান করেন যার মধ্যে ব্যাপক সংখ্যক তুর্কী মুসলমান ছিল। মূলত, নারামিখলার সময়কালে (যিনি মিন-স-মুন কিংবা সোলায়মান শাহ নামে পরিচিত) এ অঞ্চলে ইসলাম ব্যাপক প্রসার লাভ করে। ক্ষমতা গ্রহণ-হরণের মাঝে ১৩৩৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ম্রাক-উ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে এর রাজধানীকে ম্রোহং নামকরণ করেন। 
 
ওই সময়কালে আরাকান রাজারা রৌপ্য মুদ্রারও প্রচলন করেন যার এক দিকে আরাকানি ও অন্য পিঠে আরবি ভাষায় রাজার নাম, উপাধি এবং সাল উল্লেখ থাকতো। এসব মুদ্রা আরাকানে মুসলমানদের অবস্থানের পক্ষে যে শক্ত যুক্তি তুলে ধরে সেই প্রমাণকে মিয়ানমার কীভাবে খন্ডন করবে?
 
১৪৩০ হতে ১৬২২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে অন্তত ১৩ জন অমুসলিম শাসক মুসলমান প্রভাবের কারণে মুসলিম নাম ধারণ করেন। চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব অনুধাবন করে এই অঞ্চলের দখল নেয়ার প্রতিযোগিতায় আরাকান, বাংলা ও ত্রিপুরার রাজাদের মধ্যে বেশ কিছু সময় ধরে সংঘর্ষ চলার পর অবশেষে রাজা মিন ফাল অংবা সিকান্দার শাহ (১৫৭১-১৫৯৩) এর সময় চট্টগ্রামকে আরাকান রাজ্যভুক্ত করা হয় যা ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার অন্তর্ভূক্ত হবার আগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এই সময়কালে অনেক মুসলমান আরাকানের সামরিক বাহিনী এবং রাজ দরবারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরিও করেন। কাজী দৌলত, মরদন কিংবা সৈয়দ আলাওল এর মতো কবি রাজদরবারে নিয়মিত ছিলেন। 
 
কবি আলাওল তার ‘সিকান্দার নামা’ কাব্যে রোসাঙ্গ এবং এই অঞ্চলে মুসলমানদের অবস্থান বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করেছেন। আলাওলের কবিতায় ‘মহাপত্র মজলিস’ হলেন মজলিস নবরাজ যিনি মুসলমান প্রধানমন্ত্রী। শুধু নবরাজই নন; সে সময়ে সৈয়দ মুসা আরাকানের প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী এবং সৈয়দ মোহাম্মদ খান ও লস্কর বোরহান উদ্দীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। একই সময়ে ছউদ শাহও আরাকানের বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবেও নিযুক্ত ছিলেন। ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নিকট পরাজিত হয়ে শাহ সুজা তার অনুসারী ও কামানচী নিয়ে আরাকানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এমনকি ১৭৩৭ খ্রিষ্টাব্দে কাতিয়া নামক মুসলমান শাসকও আরাকানের রাজ ক্ষমতা দখল করেন। অতএব ১৪৩০ হতে ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে আরাকানে মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাস তৈরী ও কর্তৃত্ব স্থাপন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ইতিহাস যা মিয়ানমার সরকারের ‘ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তান আমলে অবৈধ অনুপ্রবেশের’ অভিযোগকে খর্ব করে। বরং ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে আরাকানি মগ ও জাপানী সৈন্য কর্তৃক ব্যাপক হতাহতের শিকার হয়ে প্রায় ১ লাখের অধিক রোহিঙ্গা চট্টগ্রামে আশ্রয় প্রার্থনা করলে তাদের ব্রিটিশ সরকার শরণার্থীর মর্যাদা প্রদান করে আশ্রয় প্রদান করেন। 
 
১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে বোদাপায়া আরাকান দখলের পর প্রবল অত্যাচার ও নিপীড়নের ফলে মুসলমানরা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। আরাকান হতে আগত এই ক্রমবর্ধমান জনসাধারণকে দেখভাল এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য ব্রিটিশ সরকার ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স’কে প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক ও পরে কমিশনার নিয়োগ দিয়ে চট্টগ্রামের দক্ষিণাংশে প্রেরণ করে। তবে এই সময় ইংরেজ-বর্মি সম্পর্কের অবনতি ঘটে যার ফলে ব্রিটিশ বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমতাবস্থায় ১৮১৪ খ্রিষ্টাব্দে ইঙ্গ-বর্মি যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে ১৮৫২ ও ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে আরও দুটি পৃথক যুদ্ধের পর সমগ্র বার্মায় ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী আরাকানের বিপুল আবাদী জমির সদ্ব্যবহার করে কৃষিপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির লক্ষ্যে শ্রমিক সমাগমের উদ্দেশ্যে ‘মাউন্টজয়’ অভিবাসন নীতি গ্রহণ করে। তবে ওই সময়ে আভিবাসিতদের অধিকাংশই পুরনো আরাকানী যারা নিজ অবস্থানে প্রত্যাবর্তন করেছেন মাত্র।
 
১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে বার্মা একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দ হতে বার্মায় মুসলমান-বৌদ্ধ দাঙ্গা শুরু হলে এর প্রভাব আরাকান অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানী সৈন্যবাহিনী আরাকান আক্রমণ করলে ব্রিটিশরা আরাকান ত্যাগ করে। ফলে জাপানীরা স্থানীয় নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে হত্যা, লুটতরাজ, অগ্নিকাণ্ড ছাড়াও বিভিন্ন নৃশংস কর্মকাণ্ড পরিচালিত করে। এ ঘটনায় প্রায় ১ লাখ নিহত এবং ৫ লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন দেশে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তবে ব্রিটিশরা Devide and Rule নীতি অবলম্বন করে রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে আরাকানে মুসলমানদের স্বীকৃতি প্রদান এবং সায়ত্ত্বশাসনের ইঙ্গিত দিলে রোহিঙ্গা নেতা আব্দুস সালামের নেতৃত্বে আরাকান পুনর্দখলের জন্য একটি সশস্ত্র মুসলিম সংগঠন গঠিত হয়। ১৯৪৫ সালে অংসানের নেতৃত্বে জাপানিদের প্রত্যাবর্তন এবং ব্রিটিশ ওপনিবেশ থেকে মুক্তির আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ১৯৪৬ সালে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। 
 
অতঃপর ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঐতিহাসিক ‘প্যানলং চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয় যেখানে সকল জাতিসত্ত্বা সমান অধিকার ভোগ করবে এবং চুক্তির ১০ বছর পর ইচ্ছা করলে যে কোন জাতি আলাদা রাষ্ট্র গঠন করতে পারবে মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে আরাকানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে মগদেরকে এ সম্মেলনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়। উপরন্ত, ১৯৪৭ এর প্রাদেশিক নির্বাচনে প্রণীত ভোটার তালিকায় ‘সন্দেহজনক নাগরিক’ আখ্যা দিয়ে সরকার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলকে নির্বাচনী এলাকার আওতামুক্ত ঘোষণা করে। 
 
১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করলে আরাকানও ৩টি জেলার সমন্বয়ে একটি বিভাগে রূপান্তরিত হয়। তবে ১৯৪৭ এর নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবার কারণে মুসলমানদের মধ্যে সঞ্চারিত ক্ষোভ থেকে আরাকানকে একটি মুসলমান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ জাফর হুসাইন কাওয়াল ‘মুজাহিদ আন্দোলন’ শুরু করেন। 
 
এ সময়ে রচিত বার্মার সংবিধানে বুনিয়াদী জাতিসত্ত্বা হিসেবে রোহিঙ্গাদের নাম উল্লেখ ছিল না। অথচ সংবিধানের ১১(২) ধারা মতে কোন ব্যক্তি বার্মা ইউনিয়নের অন্তর্গত যে কোন অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন, যার দাদা-দাদী বা নানা-নানীর যে কোন একজন বার্মার স্বীকৃত বুনিয়াদী জাতিসমূহের কোন একটির সদস্য হলে অথবা ধারা ১১(৩) অনুযায়ী কোন ব্যক্তি বার্মা ইউনিয়নের অন্তর্গত যে কোন অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করলে এবং তার পিতা-মাতা উভয়ই বার্মায় জীবিত থাকলে অথবা তার পিতা-মাতা সংবিধান কার্যকর হওয়ার সময়ে জীবিত থাকলে তাদের সবাইকে বার্মার নাগরিক হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। 
 
ওই  ধারার উপধারা ৩(১) এ বলা হয়েছে, যে সকল জাতিগোষ্ঠী একটি স্বকীয় জাতিগত কিংবা গোষ্ঠীগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে ইউনিয়ন অব বার্মার অধীনে যে কোন অঞ্চলে ১৮২৩ সালের পূর্ব হতে ক্রমাগতভাবে বসবাস করে আসছে, সে সকল জাতিগোষ্ঠী বুনিয়াদী জাতিগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হবে। তথাপিও তালিকায় রোহিঙ্গাদের নাম না থাকায় চরম হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম নেয় এবং তারা অবিলম্বে ওই তালিকায় রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবী জানায়। কিন্তু বার্মার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উ নু তাদের এ দাবীকে প্রত্যাখান করে এটিকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’ হিসেবে নির্দেশ করেন।
 
ওই সময়ে আরাকানে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মগদেরকে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে রোহিঙ্গাদের ‘কালা’ বা বিদেশী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আরাকান অঞ্চলে চাকরিরত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করে সেসব স্থানেও মগদেরকে নিয়োগ প্রদান করা হয়। এর ফলে মুসলমান এবং মগদের মধ্যে একটি অন্তঃকোন্দলের সৃষ্টি হয় যার ফলশ্রুতিতে সরকার কর্তৃক ১৯৪৯ সালে ‘বার্মা টেরিটোরিয়াল ফোর্স’ গঠিত করে সশস্ত্র অভিযানের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগণকে হত্যা করে বহু গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। ফলে প্রায় ৫০ হাজারের অধিক শরণার্থী পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় গ্রহণ করে। উ নু সরকারের সাথে রোহিঙ্গা নেতা মুহাম্মদ কাশিম কর্তৃক গঠিত ‘রোহিঙ্গা লিবারেশন ফ্রন্ট’এর টানাপোড়েন এর মাঝে ১৯৫৪ সালের প্রথম দিকে উত্তর আরাকানে রোহিঙ্গারা প্রায় ৮০% এলাকায় একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। 
 
এ অবস্থায় পুনঃকর্তৃত্ব স্থাপনে ব্যর্থ হয়ে প্রধানমন্ত্রী উ নু ১৯৫৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রীয় বেতারে রোহিঙ্গাদের একটি বুনিয়াদী জাতি হিসেবে ঘোষণা করেন। এ ঘোষণায় রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে রোহিঙ্গাদের পুনর্বহাল করার কথাও বলা হয়। কৌশলী এ ঘোষণার ফলে রোহিঙ্গা জনসাধারণের আন্দোলনে শৈথিল্য আসলে মূলত দুষ্কৃতিকারীদের নিধনের নামে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে সকল উলামা-বুদ্ধিজীবী হত্যা, নারীদের ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ করে সকল ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদ করে। এমন নির্যাতনের ফলে ১৯৫৬ সালে পুনরায় ৩০ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা বর্তমান কক্সবাজার ও বান্দরবান এলাকায় আশ্রয় গ্রহণ করে। 
 
১৯৫৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে সর্বমোট ৬ জন রোহিঙ্গা জনপ্রতিনিধি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন যার মধ্যে সংখ্যালঘু বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্য এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীও ছিলেন। 
 
এর আগে ১৯৪৭ এর নির্বাচনে বুথিডং ও মংডু হতে ২ জন এবং ১৯৫১ সালের নির্বাচনে ৪ জন রোহিঙ্গা প্রার্থী বিজয়ী হন যার মধ্যে জুরা বেগম নাম্নী বার্মার ইতিহাসে সর্বপ্রথম নারী সংসদ সদস্যাও ছিলেন। তবে ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বরে সামরিক বাহিনী প্রধান জেনারেল নে উইন-এর নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করলে মুসলমানদের উপর আক্রমণ ত্বরান্বিত হয়। ফলে প্রায় ২০ হাজারের অধিক শরণার্থী পুনরায় কক্সবাজার এলাকায় আশ্রয় গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক চাপের ফলে বার্মা সরকার এই শরণার্থী গোষ্ঠীকে ফেরত নিতে বাধ্য হলেও নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের সময় তাদের অনেকের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নেয়া হয় আবার অনেকের কাছে পরিচয়পত্র না থাকার কারণে তাদের বার্মার নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানে অসম্মতি জানানো হয়। 
 
তবে ১৯৬১ সালে সরকার ‘মায়ো ফ্রন্টিয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ গঠন করলে রোহিঙ্গা নেতারা সাময়িক স্বস্তি লাভ এবং একটি স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য গঠনের সংকেত পায়। কিন্তু বার্মার ক্রমাগত ক্ষমতার পালাবদলের ধারাবাহিকতায় জেনারেল নে উইন ঠিক ওই সময়ই পুনরায় ক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসন চালু করেন। তিনি প্রায় সকল সামরিক অফিসার ও কিছুসংখ্যক অসামরিক প্রতিনিধি নিয়ে ‘বার্মা সোশ্যালিষ্ট প্রোগ্রাম পার্টি’ গঠন করেন। রোহিঙ্গারা সংগত কারণেই এতে যোগদান না করার সুযোগে আরাকানের মগ সম্প্রদায় যোগদান করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আরাকানের যাবতীয় সাংবিধানিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক পদ থেকে মুসলমানদের স্থলে মগরা অধিষ্ঠিত হয় এবং রোহিঙ্গারা ব্যাপক চাকরিচ্যুতি ও বদলীর সম্মুখীন হয়। এমনকি এ সময়ে মায়ো ফ্রন্টিয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও বাতিল করা হয়। 
 
এর ধারাবাহিকতায় ১ অক্টোবর ১৯৬৫ হতে জাতীয় বেতারে যুগ যুগ ধরে প্রচারিত রোহিঙ্গা ভাষায় প্রচারিত অনুষ্ঠান সম্প্রচারও বন্ধ করে দেওয়া হয়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য বিবাহের বয়স নির্ধারণ, বিবাহের জন্য পূর্বানুমতিসহ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিস্তার রোধের সকল কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এর কিছুদিন পরে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করলে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করে বাংলাদেশে আগত বলপূর্বক বাস্তচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের অবিলম্বে দেশে ফেরত নেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করলে বার্মা সরকার বেশ কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে বাধ্য হয়। ১৯৭৮ সালে নে উইন ‘অপারেশন কিং ড্রাগন’ এবং ‘অপারেশন নাগা মিন’ এর নামে সামরিক অভিযান চালিয়ে আরাকানে রোহিঙ্গাদের নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াসে লিপ্ত হয়। সমীক্ষায় প্রকাশ, ১৯৭৮ সালের ২৮ এপ্রিল বাংলাদেশে আগত প্রায় ১৫ হাজার শরণার্থীর মধ্যে প্রায় ৬০০ জন ছিল ছুরিকাহত, গুলিবিদ্ধ কিংবা অন্যান্যভাবে আহত। এভাবে ১৯৭৮ সালে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে কক্সবাজার এবং বান্দরবানের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করে।
 
১৯৭৮ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ ও বার্মা সরকারের মধ্যে ‘শরণার্থী প্রত্যাবাসন চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হলে বার্মা তালিকাভুক্ত শরণার্থীদেরকে ফেরত নিতে সম্মত হলেও নাগরিকত্ব সনদ না থাকার কারণে অনেককেই ফেরত নিতে অসম্মতি জানায়। 
 
উল্লেখ্য, বার্মার তৎকালীন নিয়মে ১১ বছর বয়সের পূর্বে নাগরিকত্ব সনদ দেয়া হতো না এবং প্রতি ১০ বছর পরপর সেটি নবায়ন করা হতো। ফলে সনদ প্রদানকালে যদি কারও বয়স ১১ বছরের কম থাকতো তাহলে নাগরিকত্ব সনদের জন্য তাকে আরও ১০ বছর অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। অস্তিত্বের দোলাচালের এই সময়ে ১৯৮২ সালের ১৫ অক্টোবর ঐতিহাসিক ‘বার্মা নাগরিকত্ব আইন’ ঘোষণা করা হয় যেখানে বার্মার নাগরিকদের ৩টি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। মজার বিষয় হলো বর্মণ, চীন, মন, শান, কাচিন, কায়া, কারেন ও আরাকানি মগদেরকে প্রথম শ্রেণির নাগরিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও রোহিঙ্গা মুসলমানরা এই তালিকা থেকে সম্পূর্ণ বাদ পড়ে। এই আইনের প্রতিবাদে জাতীয় সংসদ থেকে ৬ জন সংসদ সদস্য পদত্যাগও করেন। 
 
১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষার পথে একটি বিরাট অন্তরায়। একটি মাত্র আইন একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে ইতিহাস থেকে উধাও করে দেয়ার পরিস্থিতি তৈরী করে। ১৯৯২ সালে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার বাস্তচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করলে তার মধ্যে কিছু সংখ্যক নাগরিক জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় নিজ দেশে ফেরত যায়। এই অরাজকতার সর্বশেষ অধ্যায় রচিত হয় ২০১৭ সালের ২৫-২৬ আগস্ট। যখন মিয়ানমার সরকারের সশস্ত্র বাহিনীসমূহ রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে নির্মমভাবে হত্যা, লুণ্ঠন ও শ্লীলতাহানি করে তাদের আবাসস্থল জ্বালিয়ে দেয়। পরিতাপের বিষয়, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কর্তৃক যেসব সরকারি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চৌকি বিনষ্ট করে তাদের সদস্যদের হত্যার অভিযোগ আনা হয় সেসব চৌকির নাম, অবস্থান কিংবা নিহত সদস্যদের নাম আজ পর্যন্ত প্রকাশ করেনি। প্রাণ বাঁচাতে তাদের নিজ দেশ ছেড়ে প্রায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে জড়ো হয়। সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে মানবিক বিবেচনায় সরকার তাদের জনসাধারণকে কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলায় আশ্রয় দেয়। ঘনবসতিপূর্ণ দেশের তালিকায় ৮ম স্থানে থাকা বাংলাদেশ এই বাড়তি জনসংখ্যার চাপ এবং মানবিকতার প্রতিযোগীতায় মানবিকতাকেই অগ্রাধিকার দিয়ে আশ্রয়প্রার্থীদের দায়িত্ব গ্রহণ করে। 
 
নিজ জাতিসত্ত্বার পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও রোহিঙ্গা জনগণের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতিমালা প্রয়োগের ভিত্তিতে সৃষ্ট আইন মানব সভ্যতার ইতিহাসে নাগরিকত্ব, জাতিগত বিভেদ এবং নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর ওপর অত্যাচারের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যে কারণে একটি নবজাতক শিশু যার জন্ম উখিয়ায়, সে তার অস্তিত্বের সংকটে পড়ে নিজের পরিচয়কে খুঁজে বেড়াতে বাধ্য হয়। মোহাম্মদ সেলিমের গল্প শুধু অস্তিত্বহীনতার মাঝে জন্মগ্রহণ করা একটি শিশুর নয়, এটি বরং সমগ্র রোহিঙ্গা জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বাঁধাগ্রস্ত রোহিঙ্গা জনগণের সাথে চলমান সংঘাতের একটি চিহ্ন। লাল কাপড়ে আবৃত্ত সেই বইটি; যেখানে সেই পক্ষপাতদুষ্ট আইন লেখা রয়েছে সেটি অসাম্প্রদায়িক রোহিঙ্গা শিশু মোহাম্মদ সেলিমদের প্রশ্নবিদ্ধ ভবিষ্যত নির্দেশ করে উখিয়া ক্যাম্পের প্লাস্টিকের ছাউনিগুলোর নিচে আজ চাপা পড়ে আছে। রচিত হয়েছে মানব সভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম ঘৃণ্য জাতিগত নির্মূলের গল্প। 
 
মোহাম্মদ সেলিমরা বড় হয়ে কাকে তাদের দোষ জিজ্ঞাসা করবে? জাতিসংঘ এই বর্বরতাকে জাতিগত নির্মূলের একটি আভিধানিক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে এটিকে চূড়ান্ত মানবিক অবস্থা বিবেচনা এবং মিয়ানমার সরকারের একটি ‘গণহত্যা অভিপ্রায়’ হিসেবে ঘোষণা করে। জাতিসংঘের তদন্ত কমিটি সেনাবাহিনী অপব্যবহার করে অসামরিক জনসাধারণকে হত্যা, প্রহার, লুণ্ঠন, যৌন নির্যাতনসহ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার যথেষ্ট আলামত লক্ষ্য করেছেন। এখন আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ এবং মিয়ানমার সরকারের উচিত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে স্বীকার করে সমস্যাগুলোর মৌলিকতা নিরূপণপূর্বক মিয়ানমারের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রসারের মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাসকে পুনরুদ্ধার করে মূল জনগোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত করা যেখানে তারা কোনরূপ ভয় এবং বিভেদ ছাড়াই তারা স্বাভাবিক জীবনধারায় যুক্ত হতে পারবে।
 
লেখক: একজন সামরিক কর্মকর্তা
 
 
 
 
 
 
×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত