জরুরি অবস্থায় প্লাস্টিক দূষণ!

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৪, ১২:৫৪ এএম

সমুদ্রের তলদেশ থেকে মহাকাশে, মাছের পেট থেকে মানুষের মগজে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে প্লাস্টিক দূষণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন জরুরি অবস্থা জারির কথা। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

চলতি বছরের শুরুতে ২৪টি মানব মস্তিষ্কের নমুনা নিরীক্ষণ করে গড়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ প্লাস্টিক পাওয়া যায়। বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে দেখা যায়, অতি ক্ষুদ্র মাইক্রো প্লাস্টিক মস্তিষ্কসহ গুরুতর মানব অঙ্গে জমা হচ্ছে। গবেষণায় মানুষের ফুসফুস, প্ল্যাসেন্টাস, প্রজনন অঙ্গ, লিভার, কিডনি, হাঁটু এবং কনুইয়ের সংযোগ, রক্তনালি ও অস্থিমজ্জায় প্লাস্টিকের কণা অথবা এর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। গবেষকরা প্লাস্টিক দূষণের লাগাম টেনে আনতে আরও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তুরস্কের কুকুরোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রো প্লাস্টিক গবেষক সেদাত গুন্দোগদু বলেছেন, ফলাফলের প্রেক্ষিতে প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা অপরিহার্য।

মাইক্রো বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক হলো ৫ মিলি মিটার বা তারচেয়ে ক্ষুদ্র ব্যাসের প্লাস্টিকের অংশ। যা বায়ু, পানি এবং এমনকি খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে থাকে। তবে এসব প্লাস্টিক কণা মানুষের শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে কতটা ক্ষতি ডেকে আনে তা নিশ্চিত নয়। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কণা বিভিন্ন শারীরিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যেমন এসব কণা কোষের ক্ষতি করতে পারে। প্রদাহের পাশাপাশি হৃদরোগেরও কারণ হতে পারে। এ ছাড়া বলা হচ্ছে, বিভিন্ন প্রাণীতে মাইক্রো প্লাস্টিকের উপস্থিতির কারণে তাদের সন্তান জন্মদানে সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধিত্বও দেখা যাচ্ছে। সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোটক্সিকোলজিস্ট বেথানি কার্নি অ্যালমরথ বলেছেন, আরও বেশি সংখ্যক মানুষের অঙ্গে মাইক্রো প্লাস্টিক খুঁজে পাওয়া অনেক উদ্বেগের কারণ। আমি বলব এটা ভীতিকর।

দ্য গার্ডিয়ান গত সপ্তাহে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেটি লিখেছেন পরিবেশবিদ, লেখক ও সম্পাদক ডগলাস মেইন।

উদ্বেগজনক

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক এবং গবেষণার প্রধান লেখক ম্যাথিউ ক্যাম্পেন জানাচ্ছেন, সাম্প্রতিক গবেষণায় ময়নাতদন্ত করা মৃতদেহের লিভার, কিডনি এবং মস্তিষ্কের পরীক্ষায় দেখা গেছে সবটিতেই মাইক্রো প্লাস্টিক রয়েছে। তবে অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় মোট ৯১টি মস্তিষ্কের নমুনায় গড়ে প্রায় ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি প্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকরা দেখেছেন, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে সংগ্রহ করা ২৪টি মস্তিষ্কের ওজনের গড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ প্লাস্টিক পরিমাপ করা হয়েছিল। ক্যাম্পেনের মতে, এটি বেশ উদ্বেগজনক। আমাদের মস্তিষ্কে যত প্লাস্টিক আছে বলে ভেবেছিলাম তারচেয়ে অনেক বেশি প্লাস্টিক আছে, যা আমি কল্পনাও করিনি। গবেষণা প্রতিবেদনে মস্তিষ্ক থেকে নমুনা নেওয়া সবচেয়ে প্লাস্টিক-দূষিত টিস্যুর একটি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। গবেষকরা আলঝেইমার রোগসহ ডিমেনশিয়ায় মারা যাওয়া লোকদের থেকে ১২টি মস্তিষ্কের নমুনা পর্যবেক্ষণ করেছেন। এসব মস্তিষ্কে স্বাস্থ্যকর নমুনার তুলনায় ১০ গুণ বেশি প্লাস্টিক রয়েছে। ক্যাম্পেন বলেন, আমি জানি না যে আমাদের মস্তিষ্কে প্লাস্টিক আরও কত সমস্যা সৃষ্টি কর কিনা।

গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, মস্তিষ্কে মাইক্রো প্লাস্টিকের উপস্থিতি ২০১৬ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি ছিল। গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালমরোথ বলেন, অন্যান্য প্রাণীর মস্তিষ্কেও মাইক্রো প্লাস্টিক খুঁজে পাওয়া গেছে। তাই এটি আশ্চর্যজনক নয় যে, মানুষের মগজেও তা পাওয়া যাবে।

গবেষণা

ম্যাটেরিয়ালস গত মাসে একটি গবেষণা প্রকাশ করেছে। যাতে দেখা গেছে, অস্থিমজ্জার ১৬টি নমুনায় মাইক্রো প্লাস্টিক পাওয়া গেছে। সব নমুনায় পলিস্টাইরিন রয়েছে, যা বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের প্যাকিং তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া এটি খাবারের মোড়ক, ডিটারজেন্টের বোতল এবং অন্যান্য সাধারণ গৃহস্থালি পণ্য তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। চীনের বেইজিংয়ে ৪৫ জন রোগীর নিতম্ব বা হাঁটুর অস্ত্রোপচারের পর প্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। টক্সিকোলজিক্যাল সায়েন্সেস জার্নালে এ বছরের ১৫ মে প্রকাশিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, মানুষের নমুনায় কুকুরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি প্লাস্টিকের ঘনত্ব রয়েছে। প্লাস্টিকের পানির বোতলের প্রধান উপাদান পলিথিনসহ নির্দিষ্ট ধরনের প্লাস্টিকের কণার উচ্চ পরিমাণ উপস্থিতি কুকুরের তুলনায় মানুষের শরীরে বেশি। আরেকটি গবেষণাপত্র প্রকাশ হয় ১৯ জুন ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ইমপোটেন্স রিসার্চে। সেখানে ‘ইরেক্টাইল ডিসফাংশনের চিকিৎসা নিতে যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে চারজনের পুরুষাঙ্গে প্লাস্টিকের কণা শনাক্ত করা হয়। গবেষণার প্রধান লেখক এবং মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও ইউরোলজিস্ট রঞ্জিত রামাসামি বলেছেন, প্রজনন অঙ্গের মতো সংবেদনশীল অঙ্গের টিস্যুতে মাইক্রো প্লাস্টিকের উপস্থিতি অজানা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে। একটি চীনা গ্রুপ মে মাসের এক সমীক্ষায় দেখিয়েছে, ৪০ অংশগ্রহণকারীর শুক্রাণুতে অল্প পরিমাণে মাইক্রো প্লাস্টিক রয়েছে।

গবেষকরা বলেছেন, মানুষের শরীরে প্লাস্টিক কণা প্রবেশের পর সেগুলো বের হতে পারে না। কারণ বর্জ্য অপসারণের কাজ করে যেসব কোষ, তারা এসব প্লাস্টিক কণা ভেঙে শরীর থেকে বের করে দিতে পারে না। ফলে তা শরীরে জমা হতে থাকে। মানুষের রক্ত এবং ফুসফুস এবং ডিম্বাশয়ের মতো অঙ্গগুলোতে পাওয়া গেছে এ প্লাস্টিক কণা। এসব কণা জমা হওয়ার পর মানব শরীরে কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে তা জানতে বিজ্ঞানীরা প্রায় ২০ বছর ধরে উদ্বিগ্ন। ইতালির কাসের্তায় অবস্থিত ক্যাম্পানিয়া লুইগি ভ্যানভিটেলি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক জিউসেপ পাওলিসো এবং তার সহকর্মীরা জানান, মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলো চর্বির প্রতি আকৃষ্ট হয়। এসব কণা চর্বির সঙ্গে যুক্ত হয়ে রক্তনালিতে ‘প্লাক’ নামক একটি অংশ তৈরি করে।

ইতালিতে গবেষকরা ৩১২ রোগীকে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, তাদের প্রায় ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছিল এমনই ‘প্লাক’ হিসেবে। পরবর্তী ৩৪ মাসে তাদের হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক বা মারা যাওয়ার সম্ভাবনা দুই দশমিক এক গুণ বেশি ছিল।

পৃথিবীটা প্লাস্টিকের

বিজ্ঞানীরা বলছেন, তারা পৃথিবীর প্রায় সব জায়গায় মাইক্রোপ্লাস্টিক খুঁজে পেয়েছেন। হোক সেটা মহাসাগরের গভীরে পড়ে থাকা ঝিনুকে, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মায়ের বুকের দুধে, পানিতে, বাতাসে, বৃষ্টিতে। এসব কণা দীর্ঘস্থায়ীও হয়। এগুলো নিশ্চিহ্ন হতে শতাব্দীকাল প্রয়োজন। চলতি মাসের প্রথম বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গবেষকরা ২২ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির মধ্যে ১৭ জনের রক্তের নমুনায় প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেছেন। এদের অর্ধেকের রক্তে আবার পিইটি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। এ ধরনের প্লাস্টিক সাধারণত পানির বোতলে ব্যবহার করা হয়। কিছু রক্তে পাওয়া গেছে পলিস্টাইরিন, যা খাদ্য এবং অন্যান্য পণ্যের মোড়কে ব্যবহার হয়। এক-চতুর্থাংশের রক্তে পাওয়া গেছে প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরিতে ব্যবহৃত পলিথিলিন। গবেষকরা বলছেন, এটি যুগান্তকারী গবেষণা ফল। তবে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। এর আগে কয়েকটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের মলে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি ১০ গুণ বেশি। শিশুদের প্লাস্টিক বোতলে খাবার দেওয়ার কারণে এটা হয় বলে অনুমান গবেষকদের।

বাংলাদেশেও ২০২১ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৩ শতাংশ মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা রয়েছে। বাজারে পাওয়া যায় এমন দেশি মাছের ওপর গবেষণা করে জানা যায়, ১৫ প্রজাতির মাছে প্লাস্টিকের এই ক্ষুদ্র কণার উপস্থিতি রয়েছে। যেসব মাছের পেটে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে তার মধ্যে রয়েছে রুই, তেলাপিয়া, কই, কালিবাউশ, বেলে, টেংরা, কমন কার্প, পাবদা, পুঁটি, শিং, টাটকিনি, বাইম, বাটা, মেনি ও বাছা। তার মধ্যে টেংরা, টাটকিনি ও মেনি মাছে বেশি পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ এসব মাছ খেলে তার শরীরে প্লাস্টিক কণা জমা হতে থাকবে।

কিছু আর অবশিষ্ট নেই

গবেষকরা বলেছেন, গভীর সমুদ্র থেকে বায়ুমণ্ডল বা মানুষের মস্তিষ্ক পর্যন্ত কোথাও অবশিষ্ট নেই, সর্বত্রই প্লাস্টিক। মাইক্রোপ্লাস্টিক পাঁচ মিলিমিটারের কম আকারের টুকরা, যা সাধারণত খালি চোখে দেখা যায়। তবে ন্যানোপ্লাস্টিক ধূলিকণার চেয়েও ছোট এবং প্রায়শই প্লাস্টিক উৎপাদনের উপজাত হিসেবে তৈরি হয়। মানুষের শরীরে ন্যানো প্লাস্টিকের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব নিয়ে গবেষণা গত কয়েক বছর ধরে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন তার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলেছে, বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এখনো প্রমাণিত না যে, যে খাবারে শনাক্ত করা মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ন্যানো প্লাস্টিকের মাত্রা মানব স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। তবুও গবেষকরা বলছেন, খাবার তৈরিতে প্লাস্টিকের ব্যবহার এড়িয়ে যাওয়া উচিত। বিশেষ করে মাইক্রোওয়েভ ব্যবহারের সময়। এ ছাড়া প্লাস্টিকের বোতলজাত পানির পরিবর্তে কলের পানি পান করা এবং প্লাস্টিকের ধুল জমা প্রতিরোধের চেষ্টার কথা বলছেন তারা। কিছু গবেষক কম মাংস এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়ার পরামর্শ দেন। জাতিসংঘের পরিবেশ পরিষদ প্লাস্টিক দূষণের অবসানের জন্য একটি বৈশ্বিক চুক্তির দিকে কাজ শুরু করতে দুই বছর আগে সম্মত হয়েছিল, একটি প্রক্রিয়া যা চলমান রয়েছে। গত সপ্তাহে বেশ কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদনে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে প্লাস্টিকের বৈশ্বিক উৎপাদন হ্রাস করার। প্রায় চার বছর আগের এক গবেষণায় বলা হয়, বাতাসে মিশে থাকা প্লাস্টিক কণা শিশুদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। যা আলঝেইমার এবং পারকিনসন রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

প্লাস্টিক দূষণ মহামারী আকার ধারণ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বিশ্বনেতাদের যৌথ উদ্যোগ জরুরি। না হলে হয়তো প্লাস্টিকের কারণে মানবজাতি ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত