বিপ্লব পথ হারাবে না

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৪, ১২:০১ এএম

গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে প্রতিনিয়ত শঙ্কা ছিল, এই বুঝি আন্দোলন দমে গেল। এখন প্রতিদিনের শঙ্কা, এই বুঝি বিপ্লব হাতছাড়া হয়ে গেল! মানুষ যা দাম দিয়ে কেনে, তা যত্নে রাখে, আগলে রাখে। মাঝে মাঝে বের করে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে, সব ঠিকঠাক আছে কি না? আমাদের অবস্থাও হয়েছে সে রকম। নতুন সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা হিসাবের সময় এখনো আসেনি। ১৫ বছরের জঞ্জাল ও গত কয়েক মাসের সংকট সামলে নিতেই বেশ কিছুটা সময় লাগবে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু যে বিষয়টি সব কিছুকে ছাপিয়ে সামনে চলে আসে তা হলো, এই বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট ধরে রাখা। যে আকাক্সক্ষা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে নিয়ে এই গণজাগরণের জোয়ার উঠেছে তা রক্ষা করা। ভুলে যাওয়া ও শিথিলতার কাছে আত্মসমর্পণ মানবীয় বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এর জন্য একমাত্র কার্যকর উপায় হচ্ছে, জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো। এমন একটি চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের প্রক্রিয়া সামনে নিয়ে আসা, যাতে বিস্মৃতি ও শৈথিল্যের বিকার থেকে তা আমাদের রক্ষা করতে পারে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, নিজেদের ক্ষমতা সুসংহত করা ও প্রতিবিপ্লবের চোরাপথ বন্ধ করা। সেটি এখন পর্যন্ত করা হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। যদিও এটি চলমান প্রক্রিয়া। সাংবিধানিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্র কাঠামোগত দীর্ঘমেয়াদি যেসব অনিবার্য সংস্কারের আলাপ উঠে আসছে, তার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি বেশ কিছু উদ্যোগ এখনই নেওয়া দরকার । যাদের রক্তে ও ত্যাগে এই গণবিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, তাদের তালিকা প্রস্তুত করা একান্ত জরুরি। যারা আহত হয়ে বেঁচে আছেন তাদের চিকিৎসা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সাহায্য প্রদান, শহীদদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা দান দ্রুত সময়ে করা দরকার। আশা করা যায়, সরকার এটি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে কাজ শুরু করেছে।

একই সঙ্গে পতিত স্বৈরাচারের প্রেতাত্মা যাতে কিছুতেই পুনর্বাসিত হতে না পারে, সেজন্য তাদের সীমাহীন দুর্নীতি, অন্যায় ও অপকর্মের দলিল প্রস্তুত ও জনসমক্ষে তা উপস্থাপন করা জরুরি। যত দিন যাবে ততই প্রমাণাদি হারিয়ে যেতে থাকবে। এ ধরনের উদ্যোগ প্রকারান্তরে প্রতিবিপ্লবের অনেক পথ কার্যকরভাবে প্রতিহত করতে সহায়তা করবে। অন্যথায় তাদের বিকৃত বয়ান ক্রমে শক্তিশালী হয়ে সব অর্জন গিলে খেতে আসবে। এটি একটি ব্যাপক কার্যক্রম এবং যেনতেন প্রকারে কাজটি করার চিন্তা করলে, তা হিতে বিপরীত হবে নিশ্চিতভাবেই। আমাদের বাজেটের স্বল্পতা আছে, কিন্তু তারুণ্যের ইচ্ছাশক্তির ঘাটতি নেই। এরাই ট্রাফিক পুলিশকে আরও বেশি সংখ্যায় আরও ভালোভাবে সাহায্য করতে পারে। হাসপাতালে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে দারুণভাবে হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। বাস স্টপেজ, সমুদ্র সৈকতসহ নানা জায়গায় ভোগান্তি কমাতে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে অসাধারণ সেবা দিতে পারে। আমরা কি তাদের বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরতে প্রস্তুত? সন্দেহ নেই, এক শ্রেণির ঘুষখোর আমলা আর দালাল শ্রেণি কখনোই তা চাইবে না। অযুত অজুহাত নিয়ে তারা হাজির হবে। ছাত্র প্রতিনিধি, সমন্বয়কদের দায়িত্ব দেওয়া হোক কোন মডেলে এমন কাজ করা সম্ভব? বাকিটা অভিজ্ঞরা সংশোধন করে দেবেন। খেয়াল রাখতে হবে, এটি যেন কোনোভাবেই এমন কোনো লাভজনক কাঠামোয় পরিণত না হয়, যাতে নতুন এক স্বার্থান্বেষী শ্রেণি গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়ে যায়।

উপদেষ্টা পরিষদের ওপর আমাদের সব আস্থা সত্ত্বেও তারা যাতে কোনোভাবেই একগুঁয়েমির গর্তে গড়িয়ে না পড়েন এবং সর্বক্ষণ জনআকাক্সক্ষার সঙ্গে তাদের কর্মকাণ্ড মিলিয়ে নিতে পারেন, সে জন্য মাসিক সভা অতি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। সে সভায় সমন্বয়কদের একটি পরিষদ, সাধারণ ছাত্রদের প্রতিনিধি, আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন ব্যক্তি ও অন্যরা উপস্থিত থাকতে পারেন। এই সভার মূল বিষয় হতে পারে, এ পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং নিকট ভবিষ্যতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা উপদেষ্টা পরিষদের পক্ষ থেকে তুলে ধরা। সেই সঙ্গে উত্থাপিত বিষয়ে এবং অন্যান্য বিষয়ে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আলোচনা করা। একটি সহজ অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ থাকলে এই পোর্টালটিই জনআকাক্সক্ষার বিষয়বস্তুর প্রতিবিম্ব হয়ে উঠতে পারে। পরবর্তী সময়ে যেটি উপদেষ্টারা এবং তাদের অধীন বিভাগসমূহ নিজেদের কর্মপন্থা নির্ধারণে কাজে লাগাতে পারে অনায়াসে। এই ব্যবস্থার অন্যতম একটি সুবিধা হচ্ছে, এটি যেকোনো রকমের ভেতরের বা বাইরের ষড়যন্ত্রের বিপরীতে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারবে। সেই সঙ্গে উপদেষ্টারাও তাদের ওপর অনাকাক্সিক্ষত কোনো চাপ সামলাতে এই ব্যবস্থার সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।

আগে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতায় কোনো আলোচনা ছাড়াই মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হতো। তার যোগ্যতা কী, কেন তিনি উপযুক্ত সে আলোচনার কোনো সুযোগ ছিল না। অনেক উন্নত দেশে এমনকি ইরানের মতো থিওক্রেটিক দেশেও পার্লামেন্ট থেকে প্রতিটি মন্ত্রীর জন্য আলাদাভাবে আস্থা অর্জনের প্রয়োজন পড়ে। কিছুদিন আগেই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বস্ত্র ও পাটের দায়িত্বে সরানো হয়েছে, অপরদিকে একেবারে নবীন দুজন উপদেষ্টার কাঁধে আরও দুটি করে মন্ত্রণালয়ের ভার দেওয়া হয়েছে। ১৮  আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ‘বিপ্লব কেন ব্যর্থ হয়?’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। বিপ্লব ব্যর্থ হতে পারে, বেহাত হতে পারে অথবা বিপথেও যেতে পারে যদি জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হয় অথবা এর কারিগররা অসতর্ক অথবা পথচ্যুত হন। তাই যে বিপ্লব জনসম্পৃক্ত; জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং সদাসতর্ক ও সক্রিয় পর্যবেক্ষণে থাকে, তা সহজে পথ হারায় না।

লেখক : হিউম্যান রিসার্চ কনসালট্যান্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত