সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা অমর ছোটগল্প ‘প-িতমশাই’। সেই গল্পে দেখা যায়, ইংরেজ আমলে হাইস্কুলের এক সংস্কৃতির পন্ডিত মাস গেলে ২৫ টাকা বেতন পান। সেই বেতনে ব্রাহ্মণী, বৃদ্ধা মাতা, তিন কন্যা, বিধবা পিসি, দাসী নিয়ে গড়া প-িত মশাইয়ের সংসার চালাতে হতো। সাহেব কমিশনার এনডি বিটসন বেলের স্কুল পরিদর্শনের সময় সঙ্গে ছিল একটা তিনপেয়ে কুকুর। পন্ডিত জানতে পারেন, সেই তিনপেয়ে কুকুরের পেছনে মাসে ব্যয় হয় পঁচাত্তর টাকা। পান্ডিত্যের গৌরবে গর্বিত শিক্ষক ছাত্রদের কাছে সরল অঙ্কের উত্তর খোঁজেন, তার পরিবার লাট সাহেবের কুকুরের কটা ঠ্যাঙের সমান?
ঔপনিবেশিক দেশে শিক্ষকের আর্থিক দৈন্যের এই মর্মান্তিক গল্প আমাদের পীড়া দিলেও একই গল্পে আমরা দেখতে পাই শিক্ষক কী দারুণ পরিমাণ সামাজিক সম্মান পেতেন। ফলত, আত্মগর্বী পন্ডিত মশাইরা গ্লানিবোধ থেকে অনেকটাই রক্ষা পেতেন। কিন্তু এখনকার যুগের পন্ডিত মশাইরা গ্লানি থেকে রক্ষা পাচ্ছেন কি? দেশের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকান্ড সেই প্রশ্নই তুলে দিয়েছে। আশঙ্কাজনকভাবে দেখা যাচ্ছে যে, দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করা হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, অনেক জায়গায় প্রধান শিক্ষকসহ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করানো হচ্ছে। উল্লাসরত ছাত্রছাত্রীদের ভিড়ে শিক্ষকদের অসহায় মনে হচ্ছে। কোথাও কোথাও বহিরাগতরা এসে শিক্ষকদের ওপর হামলা করছেন বলে অভিযোগ আছে। আবার কোথাও শিক্ষকরাও নিজেদের লোক দিয়ে ছাত্রদের ওপর হামলা করছেন বলেও পাল্টা অভিযোগ শোনা গেছে।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের সব ক্ষেত্রেই দলীয়করণ, পেশিশক্তির প্রদর্শন এবং দুর্নীতি হয়েছে। শিক্ষকরাও এর বাইরে নন। অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো শিক্ষকদের কিছু অংশ দুর্নীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। কেউ কেউ দুর্নীতি করতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে, তাদের ঢালাওভাবে অপমান করা, দোষারোপ করা অন্যায়। এর চেয়েও বড় কথা, যদি তারা অন্যায় করেও থাকেন, তার বিচার হতে হবে সুষ্ঠু উপায়ে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পতনের যে আদর্শ তা ছিল একটা বৈষম্যমুক্ত, নাগরিক অধিকারের দেশ গড়ে তোলা। গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার। লোকরঞ্জন আর জনতার রোষের বিচার নয় বরং ন্যায্য আইনের মাধ্যমে সমাজকে বিনির্মাণ।
গত কয়েক যুগে শিক্ষকের মর্যাদা ক্ষয় করে এমনিতেই সমাজ বিপদগ্রস্ত। এর সঙ্গে যদি প্রতিশোধপরায়ণতা যুক্ত হয় তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। সুখের কথা, সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পদত্যাগের জন্য বলপ্রয়োগ করা যাবে না বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। পদত্যাগে বাধ্য করে অস্থিরতা সৃষ্টি করলে ‘প্রশাসন ভেঙে পড়তে পারে’ বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তাদের কারও বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছেন উপদেষ্টা। পদত্যাগে বাধ্য করা নিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মবিধি অনুযায়ী পদায়ন ও বদল করা হয়। তাদের বলপূর্বক পদত্যাগের সুযোগ নেই।’ একটি সফল অভ্যুত্থানের পর সুশৃঙ্খল সমাজের প্রত্যাশায় ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কাউকে ব্যক্তিগতভাবে অপমান করা যাবে না। শিক্ষাঙ্গনে ভদ্রতা বজায় রাখতে হবে।’
উপদেষ্টার শেষ কথাটি ভীষণ জরুরি। বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ বরাবরই দেশকে দিশা দেখিয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে জনতাকে সংগঠিত করতে ছাত্রদের আন্দোলনের ভূমিকা ছিল অসীম। আর ২০২৪ সালে স্বৈরাচার পতন হয় ছাত্রদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। যেই আন্দোলনে সক্রিয় এবং অতিগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল শিক্ষকদের। ফলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শৃঙ্খলা ও ন্যায্যতা ফেরানো গোটা দেশের জন্যই খুব প্রয়োজনীয়।
