আকাশে নদী ও বৃষ্টির বিস্ফোরণ

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৪, ১২:৩৯ এএম

বিশ্ব জুড়ে বন্যার জন্য দায়ী করা হচ্ছে মেঘের নদী, বৃষ্টি বোমা অথবা মেঘের বিস্ফোরণকে। এসব নিয়ে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

বিশ্ব জুড়ে গত কয়েক বছর ধরে আবহাওয়াবিদরা কথা বলছেন কিছু শব্দ নিয়ে। যেমন মেঘের নদী, বৃষ্টির বোমা বা মেঘের বিস্ফোরণ। এসব শব্দ জনমানুষের কাছে এখনো খুব একটা পরিচিত নয়। তবে পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে নতুন নতুন প্রপঞ্চ যুক্ত হচ্ছে আবহাওয়াবিদ্যায়। বলা হচ্ছে, এ ধরনের আবহাওয়া পরিস্থিতি প্রবল বৃষ্টি ও মারাত্মক বন্যার জন্য দায়ী। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া বা এশিয়া কোনো মহাদেশই এমন পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাচ্ছে না। গত বছর এপ্রিলে যেমন দুবাইয়ে ব্যাপক বৃষ্টি এবং তারপর বন্যা দেখা দেয়। তখন এ ধরনের বৃষ্টি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। দুবাইয়ের মতো শুষ্ক এলাকায় কীভাবে এমন বৃষ্টি হলো তা নিয়ে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। এমন অভিযোগও ওঠে যে তারা ‘ক্লাউড সিড’ দিয়ে বৃষ্টি তৈরি করেছে যা মারাত্মক আকার ধারণ করে। বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পৃথিবীর এ অংশে বৃষ্টিপাত খুব হয়, হলেও অনিয়মিত। আর ওই বৃষ্টিটি ছিল খুব বিরল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই বৃষ্টির তীব্রতা ছিল রেকর্ড ভাঙা। আর এর কারণ ছিল উষ্ণ জলবায়ু। যা ভারী বৃষ্টিপাত এবং এর ফলে সৃষ্ট বন্যাকে ক্রমশ শক্তিশালী করে তোলে। বিশেষজ্ঞরা তখন বলেন, মানুষ যদি তেল, গ্যাস এবং কয়লা পোড়াতে থাকে, তাহলে জলবায়ু উষ্ণ হতে থাকবে, বৃষ্টিপাত বাড়বে এবং মানুষ বন্যায় প্রাণ হারাতে থাকবে।

বৃষ্টি বোমা

‘রেইন বোমা’ শব্দটি পরিচিতি পেতে থাকে ২০২১ সালে। যখন অস্ট্রেলিয়ার আকাশে বৃষ্টি ও বজ্রঝড়ের আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে। ওয়েদার জোন ডটকম জানাচ্ছে, আবহাওয়াবিদ্যায় ‘বৃষ্টি বোমা’ বলে আসলে কিছু নেই। এ অভিধাটি দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিকরা। বিবিসি বাংলায় নাভিন সিং খাড়কার প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বৃষ্টির ফলে অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে বন্যা আঘাত হানে। যাকে সেই দেশের রাজনীতিবিদরা ‘রেইন বোমা’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। ওই বন্যায় ২০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং হাজার হাজার মানুষকে তাদের ভিটেবাড়ি থেকে সরিয়ে নিতে হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে, এসব ঘটনা বায়ুমণ্ডলীয় নদীগুলোর কারণে হয়েছে, যা ক্রমেই আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। আকাশে বজ্রপাত যা ভারী বৃষ্টিপাতের একটি মেঘাবরণ তৈরি হলে তাকে রেইন বোমার মতো বর্ণনা করা হয়েছে। ‘বিস্ফোরক বোম্বোজেনেসিস’ নামেও এই জলবায়ু অবস্থাকে বিবৃত করা হয়। যা উপকূলীয় নিম্নচাপের মতো একটি পরিস্থিতিকে বোঝায়। ওই বছর অস্ট্রেলিয়ার আকাশে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি এবং বজ্রঝড় উৎপাদনকারী মেঘ জমা হয়। বিপুল বৃষ্টিপাতের কারণ হয়ে ওঠে। এ ধরনের বৃষ্টি ব্যাপক বন্যাও সৃষ্টি করে। যেমন চলতি বছর জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপলিস এবং পশ্চিম টুইন সিটিস মেট্রো এলাকায় দেখা দেয়। আকস্মিক বৃষ্টিপাতের ফলে সেখানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, শিলাবৃষ্টি এবং উচ্চ বাতাসের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় সংবাদে বলা হয়, কেউ কেউ এটাকে রেইন বোমা বলে। এ সময় বাতাস হয়, প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি ঝরে এবং এ দুর্যোগ এগিয়ে যেতে থাকে। মিনিয়াপলিসের কিছু অংশে এক ঘণ্টারও কম সময়ে ১ থেকে ২ ইঞ্চি বৃষ্টি হয়।

মেঘ বিস্ফোরণ

ক্লাউড ব্রাস্ট বা মেঘ বিস্ফোরণও আবহাওয়াবিদ্যার জগতে নতুন শব্দ। সম্প্রতি ভারত ও বাংলাদেশের কিছু অংশে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণ অনুসন্ধানে গিয়ে এই মেঘ বিস্ফোরণ শব্দবন্ধ পরিচিতি পায়। আবহাওয়া সংক্রান্ত একটি ওয়েবসাইটে বলা হচ্ছে, ‘মেঘ বিস্ফোরণ’ হলো অল্প সময়ের মধ্যে চরম পরিমাণে আকস্মিক বৃষ্টিপাত। এটি সাধারণত মাত্র কয়েক কিলোমিটার এলাকায় কেন্দ্রীভূত হয়, যার ফলে আকস্মিক বন্যা হয় এবং নদীগুলো বিপদসীমার বিপর্যয়কর উচ্চতায় বইতে থাকে। বলা হচ্ছে, পৃথিবী সবসময় সহিংস ঝড়ের শিকার হয়েছে। তবে এমন ঝড় সম্প্রতি আগের চেয়ে ঘন ঘন হচ্ছে। এর কারণগুলোর একটি মেঘ বিস্ফোরণ। বলা হচ্ছে, মেঘ বিস্ফোরণ তৈরি হয় তখন, যখন গরম বাতাসের একটি শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী স্রোত ঘনীভূত বৃষ্টির ফোঁটাকে মাটিতে পড়তে বাধা দেয়। যার ফলে ইতিমধ্যে গঠিত বৃষ্টির ফোঁটা সংখ্যা এবং আকারে বৃদ্ধি পায়। আর এর নিচে বৃষ্টির আরও ছোট ফোঁটা গঠিত হয়। তাই বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে জল জমে থাকে। মেঘের ভারের তুলনায় তখন ঊর্ধ্বমুখী ওই স্রোত দুর্বল হয়ে পড়ে। যা মেঘকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। পাহাড় এবং পর্বতে মেঘের বিস্ফোরণ বেশি দেখা যায়। কারণ এর ঢালু ভূখণ্ড বায়ুমণ্ডলের দিকে উষ্ণ বাতাসের স্রোতকে আরোহণের সুবিধা দেয়। কিন্তু আকস্মিক বৃষ্টি ঝড় যে কোনো জায়গায় আঘাত হানতে পারে। যেমন ইউরোপ জুড়ে এ ধরনের বৃষ্টির ধ্বংসাত্মক রূপ দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত পঞ্চাশ বছরে সমুদ্রের তাপমাত্রা প্রতি বছর প্রায় ০.০১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা অর্ধ শতাব্দীতে মোট ০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রমবর্ধমান সমুদ্রের তাপমাত্রা জলের বাষ্পীভবন বাড়ায়। যা তীব্র বা অন্যান্য আরও চরম ধরনের বৃষ্টিপাতের জন্য দায়ী। ২০২১ সালে ইতালি প্রায় ১৬০০টি চরম আবহাওয়ার ঘটনা দেখেছে। আগের বছরের তুলনায় যা ৩৩ শতাংশ বেশি ছিল। যার মধ্যে ছিল শিলাবৃষ্টি, তুষার ঝড় এবং বিশেষ করে মেঘ বিস্ফোরণ। ভারতের সংবাদমাধ্যম জি নিউজ বলছে, চলমান বর্ষা মৌসুমে হিমাচল প্রদেশে ২৭ জুন থেকে ১৬ আগস্টের মধ্যে মেঘ বিস্ফোরণ এবং আকস্মিক বন্যার ৫১টি ঘটনা ঘটেছে। যাতে অন্তত ৩১ জন নিহত হয়েছে। বাংলাদেশেও চলতি মাসে এ মেঘ বিস্ফোরণ ঘটে। ভারত থেকে আসা আকস্মিক পানির স্রোতের সঙ্গে এই বিস্ফোরিত বৃষ্টি যুক্ত হয়ে প্রবল বন্যা সৃষ্টি করে। এক সপ্তাহের অধিক সময় ধরে এই বন্যার পানিতে কয়েক লাখ মানুষ বন্দি হয়ে আছে। মৃত্যুও হয়েছে অনেকের।

আকাশের নদী

ডয়চে ভেলে তাদের গত বছরের এক প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, বিশ বছর আগে ব্রাজিলের বিজ্ঞানী আন্তোনিও ডি. নোব্রে দক্ষিণ আমেরিকায় মেঘে অবস্থিত জলের ভর বোঝাতে ‘উড়ন্ত নদী’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি অক্লান্ত গবেষণায় দেখিয়েছেন এটি কীভাবে কাজ করে। নাভিন সিং খাড়কা বিবিসি বাংলায় তার প্রতিবেদনে জানান, ‘আকাশের নদী’ বা ‘উড়ন্ত নদী’ হলো ভূপৃষ্ঠ থেকে বায়ুমণ্ডল পর্যন্ত লম্বা ও প্রশস্ত জলীয় বাষ্পের স্তম্ভ। এর উদ্ভব হয় সাধারণত গ্রীষ্মম-লীয় অঞ্চল থেকে পরে তারা ঠান্ডা মেরু অঞ্চলের দিকে সরতে থাকে। আন্তোনিও ডি. নোব্রে অবশ্য গবেষণা করেছেন আমাজনের ওপর। তিনি দেখিয়েছেন, ‘উড়ন্ত নদী’ যদি আন্দিজে আঘাত করে তখন তারা দক্ষিণে ধাক্কা দেয় এবং দক্ষিণ আমেরিকার শহরগুলোর ওপর বৃষ্টিপাত ঘটায়।

নাভিন সিং বলছেন, উড়ন্ত নদীগুলো পৃথিবীর মধ্য-অক্ষাংশ জুড়ে চলাচল করা মোট জলীয় বাষ্পের প্রায় ৯০ শতাংশ বহন করে। একটি বায়ুমণ্ডলীয় নদী গড়ে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ, ৫০০ কিলোমিটার প্রশস্ত এবং প্রায় তিন কিলোমিটার গভীর হয়ে থাকে। যদিও এমন নদী ক্রমে আরও দীর্ঘ ও প্রশস্ত হচ্ছে। যার ফলে তা পাঁচ হাজার কিলোমিটারের চেয়েও বেশি দীর্ঘ হয় এবং আরও প্রশস্ত হয়। খালি চোখে মানুষ এ নদী দেখতে পায় না। তারা শুধু দেখে পুঞ্জীভূত মেঘ। নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির বায়ুমণ্ডলীয় গবেষক ব্রায়ান কান বলেছেন, এ নদীর অস্তিত্ব ইনফ্রারেড এবং মাইক্রোওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সি দিয়ে দেখা যেতে পারে। উত্তর আমেরিকার দীর্ঘতম নদী মিসিসিপি যতটা না আর্দ্রতা ছড়ায় তার চেয়ে ১৫ গুণ বেশি আর্দ্রতা ছড়াতে পারে বায়ুমণ্ডলের বিশাল ও শক্তিশালী নদীগুলো। চলতি বছরের শুরুতে বিবিসির এক সংবাদের জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি শক্তিশালী ঝড়ে বন্যা, ভূমিধস এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়। এতে অন্তত তিনজন নিহত হন। রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিপাতের কারণে আটটি কাউন্টিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়। যে ঝড় এ ‘বায়ুমণ্ডলীয় নদী’ প্রভাবের কারণে হয়েছিল। এটি এমন এক নদী যেখানে পানি বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে বাহিত হয় এবং দীর্ঘ স্রোত তৈরি করে আকাশে প্রবাহিত হয়। অনেক নদী যেমন ভূমিতে প্রবাহিত হয় সেভাবে। এ ধরনের ঝড় ক্যালিফোর্নিয়ায়ও আঘাত হানে। গবেষকরা বলছেন, উড়ন্ত নদী গড়ে যে পরিমাণ পানি নিঃসরণ করে তা বিশ্বের সবচেয়ে বড় নদী আমাজনের নিয়মিত পানিপ্রবাহের প্রায় দ্বিগুণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা আরও বেশি জলীয় বাষ্প তৈরি করছে যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অল্প সময়ে ভূপৃষ্ঠে প্রচুর পরিমাণে পানি ঝরে। যার কারণে বিপর্যয়কর বন্যা এবং ভূমিধস দেখা দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে ১৯৬০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী বায়ুমণ্ডলীয় জলীয় বাষ্প ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই বাড়ছে।

তবে আমাজনের জন্য এ বৃষ্টি আবার আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দেয়। কারণ সেখানে প্রচুর পরিমাণে প্রাণের উপস্থিতি রয়েছে। যাদের জন্য বৃষ্টি অপরিহার্য। পশুপাখি থেকে শুরু করে মানুষের কৃষিকাজের জন্যও এই আকাশ নদী বা মেঘের নদী উপকারী। যার ফলে আমাজনের প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। তবে মানুষের জন্য এ বৃষ্টি চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আগাম সতর্কতা না থাকলে ঘটতে পারে বড় ধরনের বিপদ। সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিসহ প্রাণহানি ঘটতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যে কারণে আবহাওয়া প্রযুক্তিতেও উন্নতি করা জরুরি হয়ে পড়েছে এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত