এক গুলিতেই ঢলে পড়েন রাজু ১৭ গুলি নিয়ে ধুঁকছেন সামী

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৪, ০১:৩০ এএম

পরিবারের অভাব ঘুচাতে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন মাগুরার রাজু আহমেদ। এ কারণেই গিয়েছিলেন ঢাকায়। মৃত্যুর একদিন আগে মাকে ফোন করে বলেছিলেন, সৌদি আরব যাওয়ার ইচ্ছার কথা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে এমন কথা জানাচ্ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ঢাকার মোহাম্মদপুরে গুলিতে নিহত রাজু আহমেদের মা।

মাগুরা সদর উপজেলার আজমপুর গ্রামের কালাম মোল্যার ছেলে রাজু আহমেদ জগদল সম্মিলনী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে মাগুরা আদর্শ কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হলেও পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে লেখাপড়ায় নিয়মিত হয়নি। তিন বছর আগে মা নাছিমা খাতুন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। অভাবের সংসারে মায়ের চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে ডিগ্রি পড়াটা হয়ে ওঠেনি রাজুর। দিনমজুর বাবার একার আয়ে ধারদেনা করে রাজুর বড়ভাইকে মালয়েশিয়া পাঠালেও শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে তিন মাস আগে দেশে ফেরত আসে। ফলে নিরূপায় হয়েই তিন মাস আগে ঢাকায় জননী কুরিয়ার সার্ভিসে বুকিং অফিসার হিসেবে কাজ নিয়ে বাড়ি ছাড়েন রাজু। এরমধ্যে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে প্রতি দিনই রাজু কাজের ফাঁকে আন্দোলনে অংশ নিতেন বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা। গত ১৯ জুলাই রাজু কালো পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে মোহম্মদপুর এলাকায় ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেয়। সেখানেই রাজু গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। এক গুলিতে সড়কে লুটিয়ে পড়েন তিনি। 

রাজুর গ্রামের বাড়ি জেলা সদরের আজমপুর গিয়ে দেখা যায়, তার মা নাসিমা খাতুন নিহত সন্তানের কাপড়সহ ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিয়ে বিলাপ করছেন। তিনি বলেন, ‘আগের রাতেও রাজুর সঙ্গে তার কথা হয়েছে। মোবাইলে সবার খবর নিয়েছে। বিদেশে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছিল সে। আমার ছেলের সে ইচ্ছা আর পূরণ হলো না। এক ছেলে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল, আরেক ছেলে অসুস্থতা নিয়ে বিদেশ থেকে বাড়িতে এসেছে। আমি নিজেও খুব অসুস্থ। এখন আমরা কীভাবে চলব।’

এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার সন্তান মোস্তাহিদ হোসেন সামী ১৭টি ছররা গুলি শরীরে নিয়ে ধুঁকছেন। তার চোখ, মুখসহ সারা শরীরে গুলি লাগে। দুটি স্প্রিন্টার বাঁ চোখে ঢুকে যায়। কয়েক দফা অস্ত্রোপচারের পরও চোখ থেকে গুলি বের করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে বাঁ চোখ দিয়ে কিছুই দেখতে পান না তিনি।

মোস্তাহিদ হোসেন সামী আখাউড়া পৌরশহরের খড়মপুর এলাকার আক্তার হোসেন ভূঁইয়ার ছেলে। সে উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৭টি পরীক্ষা দিয়েছে। এক মাস ধরে চোখের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে সামী। সারাজীবনের জন্য একটি চোখ হারানোর দুশ্চিন্তায় ভুগছে সামীসহ তার পরিবার। তার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত স্বজনরা।

সামীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টঙ্গীর পূর্ব আরিচপুরে মা-বাবার সঙ্গে বসবাস করে সামী। কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে বন্ধুদের সঙ্গে সেও যোগ দেয়। ১৮ জুলাই রাজউক স্কুলের সামনে আন্দোলন করার সময় পুলিশ এলোপাথাড়ি গুলি চলায়। এ সময় তার বাঁ চোখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির স্প্রিন্টার বিঁধে যায়। পরিচিতরা তাকে উদ্ধার করে আগারগাঁও জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে কারফিউ শিথিল হলে হাসপাতালে গিয়ে শরীরের স্প্রিন্টার বের করা হয়। কিন্তু গুলির কিছু অংশ চোখে রয়ে যায়। এটি বের করতে না পারলে আজীবন এক চোখ অন্ধত্ব নিয়ে চলতে হবে। চিকিৎসকরা তাকে দেশের বাইরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এজন্য প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ টাকা। ইতিমধ্যে তার চিকিৎসায় বহু টাকা খরচ হয়েছে। তার চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত স্বজনরা।

সামী বলেন, ‘দেশের জন্য কিছুটা হলেও অবদান রাখতে পেরেছি। এজন্য গর্ববোধ করছি। আমার একটি চোখ গেলেও আরেকটি চোখ তো ভালো আছে। অনেকে তো দুটি চোখই হারিয়েছেন।’

সামীর বাবা আক্তার হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘সামীর চোখে দুবার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। প্রথমে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, পরে ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হয়েছে। গুলির একটি অংশ এখনো চোখে রয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছে এটি বের করা সম্ভব নয়। দেশের বাইরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এজন্য ২০-২৫ লাখ টাকার প্রয়োজন। নতুবা এই চোখে আর কোনোদিন দেখতে পারবে না সামী।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত