নির্বাহী আদেশে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ আইন বাতিল

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৪, ০২:৪০ এএম

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম হওয়ায় আগামী মাস থেকে দেশে দাম কমাতে পারে অন্তর্র্বর্তী সরকার। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) হিসাবনিকাশ করছে। সেটি হাতে আসার পর সরকার সিদ্ধান্ত নেবে জ্বালানির দাম কী হবে।

আরেক কর্মকর্তা জানান, সেপ্টেম্বর থেকে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমবে। কোন জ্বালানির দাম কতটুকু কমবে, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে খুব বেশি দাম হয়তো কমবে না।

এদিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার যে আইনে খেয়ালখুশিমতো নির্বাহী আদেশে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করছিল, সেই আইন বাতিল করে গতকাল মঙ্গলবার গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে।

কমতে পারে তেলের দাম : চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি গড়মূল্য প্রাক্কলন করেছিল প্রায় ১২২ ডলার। যদিও বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যটির গড়মূল্য এখন ৮০ ডলারের আশপাশে। সামনে তা আরও কমার পূর্বাভাস রয়েছে।

বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গত মার্চ থেকে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ করে আসছে সরকার। এই হিসেবে প্রতি মাসে নতুন দাম ঘোষণা করছে সরকার। যদিও জ্বালানি বিশেষজ্ঞের অনেকের অভিযোগ, যে ফর্মুলায় বিপিসি জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করছে, তাতে অস্বচ্ছতা রয়েছে। চলতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত ছিল।

সর্বশেষ গত জুলাইয়ের জন্য প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ১ টাকা কমিয়ে নতুন দর নির্ধারণ করা হয় ১০৬ টাকা ৭৫ পয়সা। আর পেট্রোলের দাম লিটারে ১২৭ এবং অকটেনে ১৩১ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়। এর আগে জুন মাসে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৭৫ পয়সা এবং পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়ানো হয়েছে আড়াই টাকা করে। তখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও দেশে বাড়ানো হয়। মে মাসেও বাড়ানো হয়। আর এপ্রিলে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম কমানো হলেও অপরিবর্তিত রাখা হয় পেট্রোল ও অকটেনের দাম। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে মূল্য সমন্বয়ের প্রথম মাস মার্চে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৭৫ পয়সা, অকটেনের দাম ৪ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ৩ টাকা কমানো হয়।

আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করতে গত ২০ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ফর্মুলার নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, দেশে ব্যবহৃত অকটেন ও পেট্রোল ব্যক্তিগত যানবাহনে অধিক পরিমাণে ব্যবহার হয়। তাই বাস্তবতার নিরিখে বিলাসদ্রব্য হিসেবে সব সময় ডিজেলের চেয়ে অকটেন ও পেট্রোলের দাম বেশি রাখা হয়। ভর্তুকির চাপ এড়াতে ২০২২ সালের আগস্টে গড়ে ৪২ শতাংশ বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের দাম। এরপর ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২৩ দিনের মাথায় সব জ্বালানি তেলের লিটারে ৫ টাকা করে কমানো হয়।

ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম জ্বালানি বিভাগ নির্ধারণ করে। এ ছাড়া উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম নিয়মিত সমন্বয় করে বিপিসি।

আইন বাতিল : নির্বাহী আদেশে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের আইন বাতিলে গত ২২ আগস্ট অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় খসড়া অধ্যাদেশ অনুমোদন দেওয়া হয়। গতকাল ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ জারি করেছেন রাষ্ট্রপতি।

ফলে এখন থেকে গণশুনানির মাধ্যমে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের একক ক্ষমতা ফিরে পেল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

বিইআরসি আইনে ৩৪(ক) ধারা সংযোজন করে নির্বাহী আদেশে দাম নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয় নির্বাহী বিভাগকে। গেজেটে ৩৪(ক) ধারা বিলুপ্ত করা হয়েছে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে গণশুনানির মাধ্যমে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করে আসছিল সরকার। এতে অযৌক্তিকভাবে ইচ্ছেমতো দাম বৃদ্ধির সুযোগ খুব একটা ছিল না।

২০২৩ সালে হঠাৎ করেই আইন সংশোধন করে নির্বাহী আদেশে দাম সমন্বয় (কম/বেশি) করার বিধান যুক্ত করে সরকার। তারপর থেকে বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে গণশুনানি ছাড়াই দফায় দফায় নির্বাহী আদেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করে শেখ হাসিনার সরকার।

অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান নির্বাহী আদেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম সমন্বয়ের বিপক্ষে মত দেন। ১৮ আগস্ট তিনি বলেছিলেন, আপাতত নির্বাহী আদেশে আর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হবে না। দাম সমন্বয় করতে হলে বিইআরসিতে পাঠানো হবে। আর আইনটি সংশোধনের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবেন তিনি। মাত্র আট দিনের মাথায় বিইআরসি আইনের বিতর্কিত ধারাটি বাতিল করা হলো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত