অপরূপ প্রকৃতি দিয়ে ঘেরা আমাদের বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম দুটি নদ ও নদী ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা যেখানে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে, সেখানেই কালের পরিক্রমায় গড়ে ওঠা বঙ্গীয় ব-দ্বীপ। এই গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র মোহনা অঞ্চলে প্রায় তিন হাজার বছর বা তারও আগে থেকে যে জনগোষ্ঠীর বসবাস, তা-ই ইতিহাসের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে আজকের স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ হিসেবে।
ভৌগোলিক বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায়, ভারত ও মিয়ানমারের মাঝখানে। সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক ২০২১ অনুসারে এর ভূখণ্ড ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬০ বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশের পশ্চিম, উত্তর আর পূর্ব জুড়ে রয়েছে ভারত। পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। উত্তরে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় রাজ্য। পূর্বে আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম। তবে পূর্বে ভারত ছাড়াও মিয়ানমারের (বার্মা) সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে। দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। বাংলাদেশের স্থল সীমান্তরেখার দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ২৪৬ কিলোমিটার। যার চুরানববই শতাংশ ভারতের সঙ্গে এবং বাকি ৬ শতাংশ মিয়ানমারের সঙ্গে। বাংলাদেশের তটরেখার দৈর্ঘ্য ৫৮০ কিলোমিটার।
বাংলাদেশের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। বছরে বৃষ্টিপাতের মাত্রা ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ মিলিমিটার, ৬০ থেকে ১০০ ইঞ্চি। বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ২৫০ সেলসিয়াস। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে কর্কটক্রান্তি অতিক্রম করেছে। এখানকার আবহাওয়াতে নিরক্ষীয় প্রভাব দেখা যায়। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত হালকা শীত অনুভূত হয়। মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে বর্ষা মৌসুম। এ সময় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো ও জলোচ্ছ্বাস প্রায় প্রতি বছরই আমাদের দেশে আঘাত হানে।
১৯৭১ পরবর্তী ফারাক্কা বাঁধ, সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যা, চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীসহ বিভিন্ন বিষয়ে উল্লেখযোগ্য দূরত্ব থাকলেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সার্বিক দিক দিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ। দুটি দেশই একই সঙ্গে সার্ক, বিমসটেক, আইওরা এবং কমনওয়েলথের সাধারণ সদস্য। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে বাঙালিদের বসবাস, যারা ১৯৪৬-৪৭ এর দাঙ্গার পর পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) পরিত্যাগে বাধ্য হয়। পরবর্তীকালে ১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশই সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখছে। ফলে তারা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী।
বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এর অন্যতম কারণ, ভারতের বাঁধ খুলে দেওয়া। বাঁধ খুলে দেওয়ার আগে, বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। জানালে পূর্বপ্রস্তুতি থাকত। যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তার চেয়ে অনেক কম হতো। বিষয়টি আরও পোক্ত হয়েছে এই কারণে যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতের দিল্লিতে অবস্থান করছেন। এ বিষয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, তা খন্ডানোর দায় ভারতের। গত সপ্তাহে ভারতীয় হাইকমিশনার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, প্রবল বৃষ্টির কারণে বন্যা হয়েছে। তিনি জানান, ভারতের ত্রিপুরার বন্যা পরিস্থিতি ধারণারও বাইরে।
অন্যদিকে, ভারতের বিহারের গঙ্গায় পানির স্তর অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কা ব্যারেজের ১০৯টি গেটের সবগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে বলে ভারত সরকারের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। ফারাক্কা ব্যারেজে পানির স্তর বিপদসীমা (৭২ ফুট) ছাড়িয়েছে। বর্তমানে সেখানে পানির উচ্চতা ৭৬ ফুট রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে ফারাক্কার গেট খোলার জন্য এখনই বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বা আদৌ হবে কি না, তা বলা যাচ্ছে না। কারণ, নিয়ন্ত্রিতভাবে ১০৯টি গেট থেকে পানি ছাড়া হচ্ছে। ভারত সরকারের ওই সূত্র আরও জানিয়েছে ‘এখানে নিয়ন্ত্রিত কথার অর্থ সব গেট একই উচ্চতায় খোলা হয়নি। কোথাও একটি গেটের ১০ বা ১২ ফুট খোলা হয়েছে তো অন্য কোথাও গেট খোলা হয়েছে ৩ বা ৪ ফুট। ফলে সব গেট দিয়ে একই পরিমাণে জল ছাড়া হচ্ছে না।’ যাতে কোথাও বন্যা না হয়, সেটা মাথায় রেখেই এটা করা হচ্ছে বলে ওই সূত্র জানায়!
বলার অপেক্ষা রাখে না, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই ভিন্নরকম। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলে, দৈবক্রমে শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা বেঁচে যান। কারণ তখন তারা বেলজিয়ামে ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের অনিশ্চিত খবর জানার পর, জার্মানি চলে আসেন। এরপর আসেন ভারতে। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছেই তারা হত্যাকাণ্ডের নিশ্চিত খবর পান। এরপর ইন্দিরা গান্ধীর আন্তরিক সহযোগিতায় তাদের ভারতে আশ্রয় দেওয়া হয়। কিন্তু তারা এমন জায়গায় ছিলেন, যা ছিল অসম্ভব গোপন এবং নিরাপত্তাঘেরা। অধিকাংশ ভারতীয় জানতেন, দিল্লিতে আছেন। কিন্তু কোথায় তা জানা ছিল না।
এখন আমরা জানি, ভারত সরকারের দুই কর্মকর্তা দুপুরের দিকে তাদের বিমানবন্দর থেকে নিয়ে যান দিল্লির ডিফেন্স কলোনির একটি বাসায়। যেখানে ছিল একটি ড্রইং-কাম-ডাইনিং রুম এবং দুটো শয়নকক্ষ যার প্রত্যেকটির সঙ্গে একটি করে বাথরুম। ওই বাড়ির বাইরে না যাওয়া, সেখানকার কারও কাছে তাদের পরিচয় না দেওয়া এবং দিল্লির কারও সঙ্গে যোগাযোগ না রাখা ভারতের কর্মকর্তারা তাদের এই তিনটি পরামর্শ দিয়েছিলেন। অবশেষে প্রায় ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশে ফিরে আসেন তিনি।
বর্তমানে দিল্লিতে কোথায় শেখ হাসিনা আছেন, তা সাধারণ জনগণ জানে না। মনে রাখতে হবে, শেখ হাসিনাকে বর্তমান ইউনূস সরকার মামলার জালে জড়িয়ে ফেলেছে। বন্যা বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে কেউ দেখলে, তাকে কোনোভাবেই দোষী বলা যাবে না। আমরা অবশ্যই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্কপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখতে চাই। এটি ভৌগোলিক কারণেই জরুরি। তার মানে এই নয় যে, সবকিছুই হবে একতরফাভাবে। আমাদের যেমন ভারতকে দরকার, তেমনি ভৌগোলিক এবং বাণিজ্যিক কারণে ভারতেরও বাংলাদেশকে দরকার। পারস্পরিক হৃদ্যতা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উভয়ের প্রয়োজন। কী কারণে কী হলো, তা খুঁজতে গিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যখন ভারতকে খুঁজে পাওয়া যায়, তখন কিন্তু দায় এড়ানোর সুযোগ থাকে না। যদি এ বিষয়ে ভারত নীরবতা পালন করে, তখন ধরে নিতে হবে, কোথাও না কোথাও সমস্যা রয়েছে। আমরা অবশ্যই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। কিন্তু সেটি কি একতরফা ভাবে সম্ভব? বন্যা, খরা , নদীর পানিবণ্টন এবং সীমান্ত নিয়ে যে সমস্যা রয়েছে, তার সমাধান দ্রুত দরকার। এগুলো যতদিন ঝুলে থাকবে, ততদিন এই ধরনের অভিযোগ থাকবে।
আমরা সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে চাই। প্রতিবেশীর সঙ্গে বিবাদ রেখে কোনো দেশই কি নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে? প্রত্যেক গণতন্ত্রকামী মানুষ বিশ্বাস করে, পারস্পরিক সৌহার্দ্য এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে এমন কোনো বিষয় নেই, যা সমাধান করা যায় না। ভারত যদি শান্তির প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসে, তাহলে সম্ভবত আমাদের দেশও মুখ ফিরিয়ে থাকবে না। এখন ভারতকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা আলোচনা চান, নাকি সমস্যা জিইয়ে রেখে বিতর্ক উসকে দেবেন? কোনটা আংশিক পরিকল্পিত আর কোনটা প্রাকৃতিক, সেটুকু উপলব্ধি করা মতো জ্ঞান আমাদের আছে।
লেখক: সংবাদ বিশ্লেষক
