বাংলাদেশে একসময় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন ড্যান ডব্লিউ মজিনা। তিনি এখন মার্কিন নীতিনির্ধারণে সহায়ক ভূমিকায় রয়েছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাংলা গণমাধ্যম টাইম টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটতে পারে, এমন আভাস দিয়েছেন। এই আভাসটা আমরাও পাচ্ছিলাম, বেশ কিছু দিন থেকে। যখন এ বিষয়ে বলেছি, তখন অনেকেই বিষয়টাকে ‘হাইপোথিসিস’ হিসেবে ধরে নিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তা ক্রমেই সঠিক হিসেবে দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগ সরকারের করুণ পতনের পর।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সমাজের সমন্বয়কদের কথাতেও আভাস মিলেছে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের। এদিকে ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই বিএনপির কিছু কার্যকলাপ ইতিমধ্যেই জনমনে বিরক্তি সৃষ্টি করেছে। চাঁদাবাজি, দখলের অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে বিএনপির কোনো কোনো নেতার বিরুদ্ধে। আর সে অভিযোগ স্বীকৃত। যার ফলে বিএনপির হাইকমান্ড অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু তৃণমূল পর্যন্ত সবকিছুর বিষয়ে হাইকমান্ডের দৃষ্টি রাখা সম্ভব হয়ে উঠছে না। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কিছু কিছু নেতার দৌরাত্ম্যে ক্রমেই মানুষ বিরক্ত হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়ের কথা, বিএনপির যে সুপ্রিমো তারেক রহমান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে সৎ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি নিজেও তার ব্যাপারে জানি। কিন্তু একটা চক্র সবসময় তারেক রহমানকে নিয়ে ভয়ে ছিল এবং এখনো আছে। তারা জানত এবং জানে, তারেক রহমান ক্ষমতায় এলে তাকে নামানো কঠিন হবে। তাই প্রথম থেকেই তার চরিত্র হননের টার্গেট নিয়ে মাঠে নেমেছিল চক্রটি।
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিএনপির কিছু লোক অনেক আগে থেকেই তারেক রহমানের নাম ভাঙিয়ে চলা শুরু করেছিল। তাদের সামনে রেখে তারেক রহমানের চরিত্র হননের চেষ্টায় অনেকটাই সফল হয়েছিল ষড়যন্ত্রীরা। এবারও কি সেই খেলা শুরু হয়েছে? জানা যাচ্ছে, জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কোনো কোনো নেতা কথায় কথায় তারেক রহমানের নাম ভাঙানো শুরু করেছেন। তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে, তারেক রহমান দেশের ফিরবেন তার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব তাদের কাঁধে, এমনসব কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন তারা।
আওয়ামী লীগের যেভাবে পতন হয়েছে, তাতে দলটির ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে। গণহত্যার যে কালো দাগ আওয়ামী লীগের শরীরে লেগেছে, তা মোছা প্রায় দুঃসাধ্য ব্যাপার। বিশেষ করে, প্রযুক্তির কল্যাণে ছাত্রহত্যার দৃশ্যগুলো থেকে যাবে। যখনই দলটি পুনর্গঠনের কথা উঠবে, তখনই সেই দৃশ্যগুলো সামনে দাঁড়াবে বাধা হিসেবে। এই বাধা পেরুনো ভয়াবহ কঠিন কাজ। সুতরাং বিকল্প হিসেবে আরেকটি দল গণতন্ত্রের প্রয়োজনেই দরকার। অনেকে হয়তো বলবেন, জামায়াতে ইসলামী বিকল্প হতে পারে। কিন্তু ভূ-রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক একটি দলকে ক্ষমতার বিকল্প ভাবার পরিস্থিতি এখনো সৃষ্টি হয়নি। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কিছু নেই। সংগতই আরেকটি গণতান্ত্রিক দল প্রতিষ্ঠার এটাই সুযোগ।
ড. ইউনূসের মতো কেউ যদি সেই দলের হাল ধরেন, তাহলে তা বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতেই পারে। বিরোধী শক্তি ছাড়া যে কোনো দলই মনস্টার হয়ে উঠতে পারে। আওয়ামী লীগ তার সদ্য প্রমাণ। অতীতে বিএনপিও যখন ব্রুট মেজরিটি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের পরিণতিও ভালো হয়নি। সুতরাং একটা দেশকে চালাতে গেলে ভারসাম্য বিষয়টি খুবই জরুরি। বাংলাদেশকে যারা রিফর্ম করতে চান সম্ভবত তাদের ধারণাও তাই।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রয়োজনটা বুঝতেন। তাই চালু করেছিলেন, রাজনৈতিক নেতাদের জন্য একধরনের স্কুল। যেখানে রাজনীতি শেখানো হতো। যতদূর মনে পড়ে, বর্ষীয়ান এবং প্রাজ্ঞ বিএনপি নেতা ফিরোজ খান নুনের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল নেতাদের সঠিক রাজনীতি শেখানোর সেই প্রক্রিয়া। মন্ত্রী-এমপিদেরও সেখানে ক্লাস করতে হয়েছে। যারা সত্যিকার অর্থেই রাজনীতি বোঝেন, তাদের মনে পতনের চিন্তাটা ঢুকে যায়। তারা বুঝতে পারেন, কখন থামলে পুনর্বার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন সম্ভব। কিন্তু অনেক নেতাই নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারেন না, কোথায় থামতে হবে জানেন না। তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। ফলে তাদের পতন নিশ্চিত হয়ে যায়।
এখনো নির্বাচনের ঢের বাকি। যতদূর শোনা যায়, কম করে হলেও দ্ইু বছর লাগবে রিফর্মের। আবার কেউ কেউ বলছেন চার বছরের কথা। জানি না, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কত বছর সময় নেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে খুব সহসাই যে নির্বাচন হচ্ছে না, তা নিশ্চিত। পশ্চিমা বিশ্বও চাচ্ছে, আমাদের দেশের রাজনীতির রিফর্ম। কিছুদিন আগেই বিএনপি দ্রুত নির্বাচন দাবি করে সমাবেশ করেছিল। এরপর বিএনপি মহাসচিব গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে। সেখান থেকে ফিরেই ড. ইউনূসের সরকার ভালো কাজ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। বিএনপির মুখ থেকেই এসেছে, তারা বর্তমান সরকারকে নির্বাচনের সময়সীমা বেঁধে দেবে না। এর মানে তারা সরকারকে সময় দেবে।
আবার প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ না থাকায় বিএনপির পক্ষ থেকে এক ধরনের আক্ষেপ প্রকাশ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনামুখর না হলেও তাদের প্রত্যাশা যে পূরণ হয়নি, নেতাদের বক্তব্যে সেটি স্পষ্ট। বিএনপির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলেন, ‘সরকার পরিচালনার দায়িত্বে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা না থাকলে এক ধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়। সেই ধরনের প্রেক্ষাপট তৈরি হওয়ার আগেই অন্তর্র্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কারকাজে হাত দেওয়া উচিত। আমরা মনে করি, সংস্কারের বিষয়টি চলমান প্রক্রিয়া। তাই সরকারকে সুনির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংস্কার করে নির্বাচনের দিকে এগোতে হবে।’ মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারকে দ্রুত সংলাপে বসা উচিত। বুধবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের টাইম টেলিভিশনের সাক্ষাৎকারে ড্যান মজিনা বলেছেন, ‘বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক অচলাবস্থা চলছে। এটা ভাঙা উচিত। আমি বহুদলীয় প্রক্রিয়া সমর্থন করি। এ জন্য প্রয়োজন অর্থপূর্ণ সংস্কার।’ কথাটা খেয়াল করবেন, ‘অর্থপূর্ণ সংস্কার’।
আওয়ামী লীগের যারা ভারতের ওপর নির্ভর করে আছেন, তাদের জন্য খারাপ খবর এটি। ইতিমধ্যে ভারত বুঝে গেছে, আওয়ামী লীগের জনবিচ্ছিন্নতার কথা। সুতরাং মরা ঘোড়া দিয়ে রেস জেতা যায় না। বলবেন, শেখ হাসিনাকে তো আশ্রয় দিয়েছে। এটারও আরেকটা বিপরীত দিক রয়েছে। ভারতের আশ্রয়ে থাকাকালে শেখ হাসিনা থাকবেন ভারতের নিয়ন্ত্রণে। সুতরাং ভারতের বিপক্ষে কথা বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। যেমন সম্ভব হতো যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে থাকলে। এই বিষয়টা আওয়ামী লীগের লোকজনের ভেবে দেখা উচিত। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাবে না। এখন যদি যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমা শক্তি মিলে আওয়ামী লীগের বিকল্প দাঁড় করায়, তাতেও সম্ভবত ভারতের আপত্তি থাকবে না। যে কারণে ড্যান মজিনা ভারতের প্রসঙ্গ টেনেছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক রিফর্মে। যতটা ধারণা করা যায় সব মিলিয়ে, আরেকটা রাজনৈতিক দলের উত্থান অসম্ভব কিছু নয়। আগামী দু’এক বছরের মধ্যেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
আমরা আশা করব, এদেশে যেন সুষ্ঠু এবং সুস্থ রাজনৈতিক ধারা চলমান থাকে। মানুষ যেন নিরপেক্ষ ভোটের মাধ্যমে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে তাদের নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারে। কারণ পরবর্তী নির্বাচনের সময়, রাজনৈতিক নেতাদের কিন্তু মানুষের কাছেই ফিরে আসতে হয়। মানুষের ক্ষমতাটাই এখানে। এখন সময়ই বলবে, কী হতে পারে নিকট অথবা দূর ভবিষ্যতে?
লেখক: সাংবাদিক, লেখক
