জ্বালানি দরে ন্যায্যতা

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৪, ১২:৪১ এএম

দেশে প্রতিদিন প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার টন ডিজেল ব্যবহার করা হয়। আমদানি করা ডিজেলের বড় অংশ পরিবহন খাত এবং কৃষিতে  সেচ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। অতীতে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাস, ট্রাক, লঞ্চ থেকে শুরু করে সবরকম পরিবহন ব্যয় বাড়ে। ফলে বেড়েছে জিনিসপত্রের দাম। কিন্তু যে দুই-একবার জ্বালানি তেলের দাম কমানো হয়েছে, সেই অনুযায়ী পরিবহন ব্যয় কমেনি। সেখানে চলেছে ইচ্ছাতন্ত্র। জ্বালানি তেলের দাম একটু বাড়লে, হু হু করে সব কিছুর দাম বেড়ে যায়। কিন্তু দাম কমলে আর কমে না। কমলেও না কমার মতোই।

বাজারে প্রতি বছর বিপিসির জ্বালানি তেল বিক্রি হয় ৭২ থেকে ৭৫ লাখ টন, যার বেশিরভাগই ডিজেল। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যস্ফীতির হিট ম্যাপের তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতিতে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মধ্যে জ্বালানি খাতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে আবার জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, খাদ্য ও সেবার ব্যয়ও বেড়ে যায়। বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি প্রাইস সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও সেই প্রভাব দেশের বাজারে কখনো পড়েনি। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ববাজারে গড়ে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ছিল ৮০ ডলার। সেই  হিসাবে প্রথমবার দেশে ডিজেলের দাম ১০৯ টাকা থেকে কমিয়ে ১০৮, পেট্রোলের দাম ১২৫ টাকা থেকে কমিয়ে ১২২ ও অকটেনের দাম ১৩০ থেকে কমিয়ে ১২৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এপ্রিল মাসে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা বেড়ে পৌঁছায় ৮৮ ডলারে। আবার মে মাসে ডিজেলের দাম ১ টাকা, পেট্রোলের দাম ২ টাকা ৫০ পয়সা ও অকটেনের দাম ২ টাকা ৫০ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়। একই মাসের শুরুতেই ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬ ডলার কমলেও দেশের বাজারে সেই চিত্র ছিল উল্টো।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। বাজারে সব জিনিসের দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে পরিবহন খরচও। এতদিন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে তেল কিনেছে গত সরকার। আর সে চুক্তি হতো মূলত কত জাহাজ ও লিটার তেল কেনা হবে তার ওপর। ফলে যখন যে চুক্তি হয়েছে, সে অনুযায়ীই তেল পাওয়া গেছে বিশ্ববাজারে দাম যাই হোক না কেন। কিন্তু এবার জানা গেল, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম হওয়ায় আগামী মাস থেকে দেশে দাম কমাতে পারে অন্তর্বর্তী সরকার। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) হিসাব-নিকাশ করছে। সেটি হাতে আসার পর সরকার সিদ্ধান্ত নেবে জ্বালানির দাম কী হবে। দেশ রূপান্তরে বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি গড়মূল্য প্রাক্কলন করেছিল প্রায় ১২২ ডলার। যদিও বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যটির গড়মূল্য এখন ৮০ ডলারের আশপাশে। সামনে তা আরও কমার পূর্বাভাস রয়েছে।

নির্বাহী আদেশে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের আইন বাতিলে গত ২২ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় খসড়া অধ্যাদেশ অনুমোদন দেওয়া হয়। মঙ্গলবার ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ জারি করেছেন রাষ্ট্রপতি। ফলে এখন থেকে গণশুনানির মাধ্যমে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের একক ক্ষমতা ফিরে পেল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে এমন প্রত্যাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক যে, অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে নেমে আসবে। অভ্যন্তরীণ মার্কেটে সরকার যে দাম ঠিক করে দেয়, সে দামেই ভোক্তা ক্রয় করতে বাধ্য। এই দাম এতদিন নির্ধারিত হয়েছে সরকারি সিদ্ধান্তে, বাজার প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে নয়। তাই যখন যেমন খুশি, তেমনি হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। কিন্তু এখন থেকে যেহেতু গণশুনানি হবে, একটা স্বচ্ছতা আশা করাই যায়। ফলে শুধু পরিবহন খরচই নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যও কমে আসা স্বাভাবিক। সরকারের পক্ষ থেকে পরিবহন এবং বাজার মনিটর করা জরুরি। আমাদের চাওয়া, জ্বালানি দরে ন্যায্যতা ফিরে আসুক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত