কৃষিঋণ বিতরণে দালালদের আধিপত্য রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। এছাড়া কৃষিঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ছোট ও সমস্যাগ্রস্ত গ্রাহকদের হয়রানি না করে তাদের প্রতি মানবিক হতে ব্যাংকগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত কৃষি ও পল্লীঋণ নীতিমালা প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের উৎপাদনশীলতা কম। যে হারে আমাদের দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে সে হারে উৎপাদন বাড়ছে না। কৃষিজমির পরিমাণও কমছে। তাই কৃষি খাতে গবেষণাকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন বীজ উদ্ভাবন ও যান্ত্রিক সহায়তা নিয়ে উৎপাদন বাড়াতে হবে।
গভর্নর বলেন, কৃষিকাজ করে তেমন মুনাফা হয় না। তাই এ খাতে নতুন করে মানুষ আকৃষ্ট হচ্ছে না। যে কারণে এই খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। কিন্তু এখনো বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। কৃষিতে যেন মানুষ আকৃষ্ট হয় সে বিষয়টা সরকারকে দেখতে হবে। প্রতি বছরই আমাদের কৃষিঋণ বিতরণ বাড়ছে। আমরা একটি স্টাডি শুরু করেছি, যার মাধ্যমে দেখা হবে প্রকৃত কৃষকরা ঋণ পাচ্ছেন কি-না। কৃষিতে সম্ভাবনা অনেক কিন্তু আমরা কাজে লাগাতে পারছি না।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিঋণ ৩৮ হাজার কোটি টাকা বিতরণের লক্ষ্যমাত্রাকে প্রয়োজনের তুলনায় কম বলে মনে করেন গভর্নর। দেশে
কৃষিঋণের প্রয়োজনীয়তা অনুসারে ব্যাংকগুলোর জন্য এই লক্ষ্য অর্জন করা তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন হতে কৃষিঋণ আরও অনেকগুণ বাড়াতে হবে।
বন্যাকবলিত এলাকার জন্য কৃষিনীতিতে কী ধরনের সুযোগ রাখা হয়েছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে গভর্নর বলেন, নীতিমালাটা বন্যা শুরুর আগেই প্রস্তুত করা হয়েছে। তাই এখানে বন্যাকবলিত এলাকার জন্য কিছু নেই। তবে খুব শিগগিরই সার্কুলারের মাধ্যমে ওই এলাকার কৃষকদের বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির অবদান অনেক। যেহেতু এটা দাবি-দাওয়ার মৌসুম, তাই কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা আরও ৩০ শতাংশ বাড়ানো উচিত বলে আমি মনে করি। কৃষি খাতে বিদ্যমান পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের পাশাপাশি আরও কিছু স্কিম করলে ভালো হয়। কারণ কৃষিঋণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রণীত মুদ্রানীতি বাস্তবায়নেও সহায়তা করে।
কৃষি ব্যাংকের এমডি মো. শওকত আলী খান বলেন, বন্যার কারণে এ বছর লক্ষ্যের তুলনায় বেশি ঋণ প্রয়োজন হবে। আমাদের ব্যাংকের মোট ঋণের ৭০ শতাংশ কৃষি খাতে বিতরণ করা হয়। তাই চাহিদা অনুযায়ী কৃষকদের আরও ঋণ দিতে পুরো ঋণে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা চেয়েছি আমরা। পাশাপাশি এসব ঋণের বিপরীতে সংরক্ষিত প্রভিশনের হার কমানোর আবেদনও করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গতকাল ২০২৪ ২৫ অর্থবছরের জন্য কৃষি ও পল্লীঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিমালা অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণের লক্ষ্য ঠিক করা হয় ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি। তবে গেল অর্থবছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যার পরিমাণ ৩৭ হাজার ১৫৩ কোটি ৯০ লাখ।
এবার চাহিদা বিবেচনায় চলতি অর্থবছরে মোট লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো ১২ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ২৪ হাজার ১২১ কোটি টাকা, বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ১ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। মোট ঋণের অর্ধেক দেবে ব্যাংক নিজেই আর বাকি অর্ধেক দেবে এনজিওর মাধ্যমে।
