১৯৭১ সালের আকাক্সক্ষাকে পাশ কাটাতে চাইলে, তা আত্মঘাতী হবে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম। তিনি বলেছেন, সংবিধান পুনর্লিখন করতে হলে তা ১৯৭১-এর মানুষের আকাক্সক্ষার ধারাবাহিক হতে হবে। গতকাল শনিবার রাজধানীতে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংলাপ, সংবিধান প্রসঙ্গ’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা বলেন মাহফুজ আলম। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে এ সংলাপের আয়োজন করা হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির সাবেক সমন্বয়ক মাহফুজ আলম বলেন, ‘অনেকেই আছেন, যারা ১৯৭১ সালের আকাক্সক্ষাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইছেন। সেটা করা যাবে না। ১৯৭১-কে পাশ কাটিয়ে এগোতে চাইলে তা আত্মঘাতী হবে। ১৯৭১ সালের মানুষের আকাক্সক্ষার সঙ্গে এখনকার মানুষের আকাক্সক্ষাকে যুক্ত করতে হবে। এটা শুধু রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কথা শুনতে হবে। সংবিধান পুনর্লিখন করতে হলে তা ১৯৭১-এর মানুষের আকাক্সক্ষার ধারাবাহিক হতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই সরকার মানুষের ইচ্ছাকে কতটা মূল্যায়ন করে, সেটা দেখতে হবে। ১৯৭২ সালের সংবিধান আদর্শিকভাবে একপক্ষীয় ছিল। সেখানে দলের মূলনীতি ও সংবিধানের মূলনীতি এক ছিল। সেই জায়গা কিন্তু এখন নেই। ওই আদর্শিক জায়গায়টা পুনর্নির্মাণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের আদর্শিক জায়গার এখনো পরিবর্তন হয়নি। তাদেরও সেই জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে।’
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান। এতে অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ বলেন, ‘৭১-এর প্রত্যাশা এবং ২০২৪-এর প্রত্যাশা অভিন্ন নয়। ১৯৭১-এর প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বিধায় ২০২৪-এর এই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটেছে। অনেক রক্তের বিনিময়ে আমরা যে স্বাধীন দেশ পেয়েছিলাম, তাকে সমুন্নত রাখার জন্যই দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র গঠনের প্রয়োজন। ১৯৭১-এর পর সংবিধান রচনায় যে ধরনের আলোচনা হয়েছিল, তা থেকে আমরা দিকনির্দেশনা পেতে পারি।’
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর ও সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) উপদেষ্টা ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘সংবিধান এমনভাবে পরিবর্তিত করা হয়েছে যে, তাতে ব্যক্তিস্বার্থ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ব্যক্তির হাতে, প্রধানমন্ত্রীর হাতে অবাধ ক্ষমতা থাকায় দলীয়, রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংবিধান পুনর্লিখন ছাড়া এ ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। সাংবিধানিক পদগুলোতে কেন, কীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তা আমাদের অজানা নয়। এমনকি রাষ্ট্রপতি নিয়োগের সিদ্ধান্ত একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর ছিল, ক্ষমতার অপব্যবহারের এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে!’
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চেয়ারম্যান জেড আই খান পান্না বলেন, ‘বর্তমান সংবিধান ১৯৭১-এর পরিপ্রেক্ষিতে লেখা হয়েছিল। গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য সংস্কার প্রয়োজন।’
ইংরেজি দৈনিক নিউ এজের সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, ‘সংবিধানের সংশোধনের নামে দলীয়করণ করেছে প্রতিটি সরকার। সব ক্ষমতা একজনের হাতে থাকলে স্বৈরাচার তৈরি হবেই। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা সসীম, জনগণের ক্ষমতা অসীম।’
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘বৈষম্য এখনো চলমান। সংবিধান সম্পূর্ণরূপে বাদ দিয়ে নতুন করে লেখা বেশ কঠিন। সংবিধান সংশোধনের জন্য ভিন্ন মত, ধর্মের সবার অংশগ্রহণের প্রয়োজন।’
অন্যদের মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন, ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) সভাপতি মুনিরা খান, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, চাকমা সার্কেলের প্রধান ও আইনজীবী রাজা দেবাশীষ রায়, সাবেক বিচারক ইকতেদার আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের নির্বাহী পরিচালক মনজুর হাসান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দিলরুবা শরমিন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক ছাত্র হাবিবুর রহমান আলোচনায় অংশ নেন।
