পশ্চিমে আবার মুসলমানবিদ্বেষ বাড়ছে!

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:১৭ এএম

লন্ডনে দাঙ্গার পর থেকে বাড়ছে মুসলিমবিদ্বেষ। যুক্তরাষ্ট্রেও একই পরিস্থিতি। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

চলতি মাসের শুরুতে একটি ভুয়া প্রোপাগান্ডাকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা হয় যুক্তরাজ্যে। সেখানে মুসলমানদের ওপর ঘৃণা ছড়ানো হয়। মসজিদসহ তাদের প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। আগুন দেওয়া হয় কোথাও কোথাও। পুলিশ কঠোর অবস্থান নেওয়ার কারণে দাঙ্গা ছড়াতে পারেনি। পাশাপাশি উদারপন্থিরাও রাস্তায় নেমে এলে দাঙ্গা স্তিমিত হয়। তবে এরপর থেকে পশ্চিমে মুসলমানদের ওপর বিদ্বেষ বেড়েছে। দ্য মিডল ইস্ট আই ডটকম-এ সংবদামাধ্যমটির এডিটর ইন চিফ ডেভিড হার্স্ট বলছেন, মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বাড়ছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জরিপ অনুসারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সব ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের নেতিবাচক ধারণা সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাজ্যের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৯২ শতাংশ মুসলমান বলেছেন, তারা সাম্প্রতিক দাঙ্গার পরে ব্রিটেনে কম নিরাপদ বোধ করেছেন এবং সাউথপোর্টে ছুরিকাঘাতের পরের সপ্তাহে প্রতি ছয়জনের একজন ব্যক্তিগতভাবে একটি ইসলামফোবিক বা বর্ণবাদী ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে যারা নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করে তাদের ভেতর মুসলমানদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের হ্রাস পাচ্ছে। ব্রুকিংস জরিপে দেখা গেছে, দুই বছর আগে মুসলমানদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ছিল ৭৮ শতাংশ, যা এখন ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ব্রুকিংস বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রজন্মগত পরিবর্তন, ইহুদি ধর্ম এবং ইসলামের মধ্যে জনপরিসরে প্রচলিত ভাবনা, বর্ণবাদ, কলেজ শিক্ষা। তবে সবচেয়ে প্রধান কারণ হলো রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতি যেখানে ইসলামের প্রতি নেতিবাচক মতামত থাকে।

রাজনৈতিক

প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাতটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মানুষকে লক্ষ্য করে যে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন, তা মুসলমানদের প্রতি সহমর্মিতা বাড়িয়েছিল। তবে গাজায় ইসরায়েলি হামলা সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের বিবৃতি বিপরীত প্রভাব তৈরি করেছে। ব্রুকিংসের সিনিয়র ফেলো শিবলি তেলহামি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিবৃতি এমন এক সময়ে এসেছে যখন ইসরায়েল এবং গাজা যুদ্ধের ওপর জাতীয় মনোযোগ ছিল সর্বোচ্চ। প্রেসিডেন্টের কথার সুরকে কেউ কেউ মুসলিম ও আরব নাগরিকদের হতাহতের প্রতি অসংবেদনশীল। তার অবস্থান আরব এবং মুসলমানদের অমানবিক হিসেবে হাজির করছে।

গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পরিচালিত দুটি জরিপে তেলহামি বলেছেন, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে মুসলমানদের প্রতি অনুকূল মতামত কমে গেছে। এই প্রবণতার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বাইডেনের অবস্থান ভূমিকা রেখেছে। ডেভিড হার্স্ট লিখেছেন, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া কী হয়েছে, যারা প্রগতিশীল মতামত উপস্থাপনের দাবি করে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটরা এবং ব্রিটেনের লেবার সরকার মুসলমানদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের এই ঢেউয়ের প্রতি কেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে? এ মাসের শুরুতে ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটি তাদের সম্মেলনের মূল মঞ্চে একজন ফিলিস্তিনি বক্তব্য রাখার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ডেমোক্র্যাটরা তাদের সম্মেলনে একটি জিম্মি থেকে মুক্ত হওয়া ইসরায়েলি পরিবারকে মঞ্চে জায়গা দিতে দ্বিধা করেনি। দলটি কেন এমন করল? ওয়াশিংটন পোস্ট প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ডেমোক্র্যাট নেতারা উদ্বিগ্ন যে, গাজা যুদ্ধ নিয়ে বক্তৃতা দিলে ‘ঐক্য হুমকির মুখে পড়বে’। তারা একটি সম্মিলন চেয়েছেন, তাই তারা গাজাকে উদযাপন থেকে দূরে রেখেছে। লায়লা এলাবেদ বলেন, আমাকে শুধু বলা হয়েছিল যে, এখানে এই সম্মেলনে আমার কথা বলার কিছু নেই।

ব্রিটেনে

ডেভিড লিখেছেন, ব্রিটেনেও কি একই কথা সত্য? কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব এই গ্রীষ্মে কেঁপে উঠেছিল ব্রিটেনের এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ জাতিগত দাঙ্গার কারণে। একটি মিথ্যা গুজবের ওপর ভিত্তি করে এ দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে যে সাউথপোর্টে একটি নাচের ক্লাসে তিন তরুণীর হত্যাকারী ছিল মুসলিম। স্টারমার সোলিহুলের একটি মসজিদ পরিদর্শন করেন, যেখানে তাকে প্রতিবাদকারীরা অভ্যর্থনা জানায়। কিন্তু তিনি কোনো মুসলিম বা ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রকাশ্যে দেখা করেননি, এমনকি তার সরকারের কোনো সদস্যও সেটি করেননি। এমনকি দাঙ্গার সময় স্টারমার ব্রিটিশ মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বকারী বৃহত্তম সংস্থা মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেনের যোগাযোগও উপেক্ষা করেছিলেন। স্টারমার দাঙ্গার পর থেকে ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে ৮০টি মুসলিম সংগঠনের আহ্বান উপেক্ষা করেছেন। পররাষ্ট্র সচিব ডেভিড ল্যামি সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রধান ইহুদি প-িত এফ্রাইম মিরভিসের সঙ্গে দেখা করেছেন। তারা ব্রিটেনের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কথা বলেছেন। একজন ব্রিটিশ ইমাম যদি দেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনার জন্য পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে দেখা করার দাবি করেন, তাহলে কী হইচই হবে কল্পনা করতে পারেন? মিরভিস এরপর লিখেছেন, আমরা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইসরায়েলের ওপর আসন্ন বিশাল হুমকি নিয়ে উদ্বিগ্ন। ইসরায়েলে সংঘাত সম্পর্কে যুক্তরাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। যার মধ্যে ছিল জিম্মিদের মুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি অর্জন এবং যুক্তরাজ্যে যুদ্ধের গভীর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছি। এছাড়া অনলাইনে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার জন্য বিজ্ঞান সচিব পিটার কাইল সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ইহুদি গোষ্ঠীর সঙ্গে দেখা করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে কমিউনিটি সিকিউরিটি ট্রাস্ট, বোর্ড অব ডেপুটিজ অব ব্রিটিশ ইহুদি এবং হলকাস্ট এডুকেশনাল ট্রাস্ট। এমন সভা হওয়া ঠিক। কিন্তু পৃথিবীতে এটা কীভাবে সঠিক হতে পারে যে, কাইল সামাজিক মাধ্যমে ইসলামোফোবিয়া নিয়ে আলোচনা করার জন্য মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করলেন না? ব্রিটিশ মুসলমানদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী অপব্যবহার সারা দেশে একটি ব্যাপক এবং কুৎসিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দাঙ্গার পর ব্রিটেনের কোনো মুসলমান নিরাপদ বোধ করে না। যেকোনো ব্রিটিশ নাগরিকের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী অপব্যবহার সমানভাবে মোকাবিলা করা উচিত। তবে কেন ব্রিটিশ মুসলমানদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের চেয়ে ইহুদি নাগরিকদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদকে এ সরকার বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে? এই সরকারের মুসলিমবিদ্বেষী পক্ষপাত এতই গভীরে প্রোথিত যে, এটি রাজনীতিবিদদের সহজাত প্রবৃত্তিকে তুলে ধরে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজায় ফিলিস্তিনিদের জবাই করছে, তাদের স্বজনদের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকার যদি দেখা করে, তাহলে কি সেটা ইহুদিবিদ্বেষ হয়ে যায়? নাকি ইসরায়েলকে সমর্থন করার প্রয়োজন, এটি যে যুদ্ধাপরাধই করুক না কেন?

কারণ

আল জাজিরায় রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও লেখক শায়িস্তা আজিজ লিখেছিলেন, ২৫ বছর আগে নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে আল কায়েদার হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যসহ তার মিত্ররা একটি তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করে। ইরাক, আফগানিস্তানের মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর অকল্পনীয় সন্ত্রাস ও দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে রাজনীতি ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও মুসলমানদের দানব হিসেবে হাজির করা হয়। অমানবিককরণের এ প্রচারণা অনিবার্যভাবে যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা বিশ^ জুড়ে মুসলমানদের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। ৯/১১-এর পর ইউরোপে ইসলামোফোবিয়া রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়। রাজ্যগুলো নেকাব, হিজাব, মসজিদ নির্মাণ এবং নামাজের জন্য আজান নিষিদ্ধ শুরু করে। বিভিন্ন দেশে হালাল মাংস নিষিদ্ধের জন্য বেশ কয়েকটি প্রচেষ্টা হয়। বছরের পর বছর ধরে ইউরোপের বেশিরভাগ মূলধারার মিডিয়া গর্বিতভাবে ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়েছে। যুক্তরাজ্যে সংবাদমাধ্যম এবং রাজনীতিতে মুসলিমবিরোধী, অভিবাসনবিরোধী এবং শরণার্থীবিরোধী কণ্ঠস্বর উচ্চতর হয়েছে। তবে সবসময় বহুসংস্কৃতিবাদ এবং মুসলিমসহ সব সম্প্রদায়কে রক্ষার ব্যাপক চেষ্টা ব্রিটেনকে মহান করে তোলে।

তিনি বলেছেন, যতক্ষণ না এ দেশের নেতারা স্বীকার করবেন যে, মুসলিম, অভিবাসী এবং উদ্বাস্তুদের প্রতি ঘৃণার উৎস রয়েছে ঘরে ঘরে, এটি ব্রিটিশ সমাজের জন্যই হুমকিস্বরূপ। সরকারের সেসব ব্রিটিশ জনগণকে ধন্যবাদ জানানো দরকার, যারা অতি ডানপন্থিদের থামিয়ে দিয়েছে। স্টারমার এবং তার মন্ত্রিসভাকে অবশ্যই বহুসংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হবে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বহুজাতিক শ্রমজীবী শ্রেণিকে প্রভাবিত করে এমন অসমতা এবং অবিচারগুলো মোকাবিলা করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

উত্তরণ

ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আন্তর্জাতিক দিবসে একটি ভোটাভুটির মাধ্যমে ‘ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলার পদক্ষেপ’ শীর্ষক প্রস্তাবের পক্ষে ১১৫টি দেশ ভোট দিয়েছে। প্রস্তাবের সদস্য দেশগুলোকে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে বিশেষ করে ইসলামোফোবিয়াকে টার্গেট করে সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ প্রস্তাব মেনে চলা উচিত সদস্য দেশগুলোর। অন্যদের এর গুরুত্ব বুঝে কর্মতৎপর হওয়া জরুরি। ইসলামোফোবিয়া নিয়ে এক বিবৃতিতে জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস বলেন, বিভাজনমূলক বক্তব্য ও ভুল উপস্থাপনা সম্প্রদায়কে কলঙ্কিত করছে। অসহিষ্ণুতা, গৎ বাঁধা এবং পক্ষপাতের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করতে হবে। অনলাইন ঘৃণামূলক বক্তব্য বাস্তব জীবনের সহিংসতাকে বাড়িয়ে তুলছে। তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও অন্যান্য আরও কিছু বাধা মুসলিমদের মানবাধিকার ও মর্যাদা লঙ্ঘন করছে। আর এগুলোর বেশিরভাগই ধর্মীয় গোষ্ঠী ও ইহুদি জনগণ, সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়সহ অন্যান্য দুর্বল জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আক্রমণের বিস্তৃত কাঠামোর একটি অংশ। আমাদের অবশ্যই সব ধরনের ধর্মান্ধতা মোকাবিলা ও নির্মূল করতে হবে। নেতাদের অবশ্যই উসকানিমূলক বক্তব্যের নিন্দা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। একসঙ্গে চলুন আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার প্রচার করি, সামাজিক সংহতি গড়ে তুলতে এবং সবার জন্য শান্তিপূর্ণ, ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত