মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে হরিলুট!

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:১৪ এএম

দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম কক্সবাজারের মাতারবাড়ী ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে একের পর এক সামনে আসছে দুর্নীতির খবর। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কয়লা আমদানিতে তিন বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ছক কষেন প্রকল্পে জড়িত দুর্নীতিবাজ শীর্ষ কর্মকর্তারা। কিছুদিন আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘মাতারবাড়ীতে ১৭৭০ কোটি টাকার দুর্নীতি’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর কয়েক দিন পরই হয়েছে ১৫ কোটি টাকা তার পাচারের চেষ্টা। সর্বশেষ পালাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবুল কালাম আজাদ।

অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল করিম খানকে গত ২৯ আগস্ট একটি আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম মাতারবাড়ী প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল) কর্র্তৃপক্ষের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি উল্লেখ করে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, সিপিজিসিবিএল মাতারবাড়ী পাওয়ার প্ল্যান্টে ৩ বছরব্যাপী ৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন কয়লা সরবরাহের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে। এতে কয়লা আমদানি ও সরবরাহের অভিজ্ঞতা উল্লেখ থাকলেও কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে মেঘনা গ্রুপের ইউনিক সিমেন্ট কনসোর্টিয়ামকে বেআইনি সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া ১০ মাস ধরে দেরি করা হয়। জানা গেছে, পরপর চারবার সংশোধনীর মাধ্যমে ‘কয়লা আমদানি এবং সরবরাহের অভিজ্ঞতার’ শর্তটি পরিবর্তন/পরিবর্ধন করে কয়লার পরিবর্তে ‘লোহা, সার, কেমিক্যাল, সিমেন্ট, খাদ্যশস্য আমদানির অভিজ্ঞতাকে’ যোগ্যতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দরপত্রে অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে একটি আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়ামের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করে মেঘনা গ্রুপের ইউনিক সিমেন্ট। গতকাল এ রিট আবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয়েছে। পরবর্তী শুনানি হবে আগামীকাল মঙ্গলবার। এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষ এই শুনানিতে অংশ নেয়নি বলে সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রায় ১৫ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক তার পাচারকালে নৌবাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন সাতজন। গত শনিবার রাতভর অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। এর আগে সকালে অভিযানের খবর পেয়ে পালিয়ে যান বিদ্যুৎকেন্দ্রের এমডি আবুল কালাম আজাদসহ বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এরপর বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সময় গতকাল রবিবার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আবুল কালাম আজাদকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এ বিষয়ে মহেশখালী থানার ওসি সুকান্ত চক্রবর্তী বলেন, ‘মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে একটি প্রভাবশালী চক্র বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক তার পাচারের প্রস্তুতি নিয়েছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে মহেশখালীতে দায়িত্বরত নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সৈয়দ সাকিব আহমেদের নেতৃত্বে একটি টিম গত শনিবার বিকেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে অভিযান শুরু করে। বিকেল থেকে রাতভর অভিযান চালিয়ে নৌবাহিনীর সদস্যরা বিদ্যুৎকেন্দ্র সংলগ্ন বন্দরের ৪ নম্বর জেটিঘাট থেকে ১৫ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক তার জব্দ করে। এসব বৈদ্যুতিক তার একটি বার্জ জাহাজে করে চারটি কনটেইনার ভর্তি করে চট্টগ্রামে পাচার করা হচ্ছিল। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে নৌবাহিনী সাতজনকে আটক করে।’

পুলিশ জানায়, নৌবাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এসব বৈদ্যুতিক তার চট্টগ্রামের বেসরকারি কোম্পানি ইকবাল মেরিনে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। জিজ্ঞাসাবাদে তারা আরও জানিয়েছেন, এই তার পাচারে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ও এমডি আবুল কালাম আজাদ, প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম এবং প্রকল্পের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলফাজ হোসেনও জড়িত রয়েছেন।

এরই মধ্যে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা আমদানির দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত কয়লা থেকে উৎপাদিত ড্রাই অ্যাশ (পোড়ানো ছাই) বিক্রির দরপত্রেও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সিপিজিসিবিএলের বিরুদ্ধে। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, কয়লার ড্রাই অ্যাশ বিক্রিতে সর্বোচ্চ দরদাতাকে কাজ দেওয়ার কথা থাকলেও সর্বনিম্ন দরদাতাকে দরপত্র পাইয়ে দিতে কিছু অসাধু কর্মকর্তা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে একের পর এক দুর্নীতির খবর সামনে আসায় সিপিজিসিবিএল এমডি আবদুল কালাম আজাদ, নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) মোহাম্মদ শহিদ উল্লাহ, ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, নির্বাহী প্রকৌশলী (ডিজাইন) কামরুল ইসলাম, সহকারী নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলফাজ উদ্দিন ও ডিজিএম (ডেপুটেশন) মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি এবং অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত