আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরে বরিশালে বাসস্ট্যান্ড, মাছঘাট ও খেয়াঘাট দখলে নিয়েছে বিএনপিপন্থীরা। দখল হওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এতদিন আওয়ামীপন্থীরা নিয়ন্ত্রণ করেছে। গত ৫ আগস্টের পর বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) বিলকিস আক্তার জাহান শিরিনের বিরুদ্ধেও সরকারি পুকুর ভরাট করে দখলে নেওয়া অভিযোগ উঠেছিল। পরে গত ১১ আগস্ট দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স¦াক্ষরিত নোটিসে তার পদ স্থগিত করা হয়।
অনেকে বলছেন, দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগের দখলদারিত্ব উচ্ছেদ করে এখন প্রকাশ্যে বা গোপনে বিএনপিপন্থীরা দখল করছে। এজন্য বিভিন্ন স্থানে অস্থিরতা, আধিপত্য বিস্তারের কোন্দল বেড়েই চলছে।
অভিযোগ উঠেছে, বরিশালের রুপাতলী ও নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল দখলে নিয়েছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে রুপাতলী বাস টার্মিনালের তিন বছরমেয়াদি কমিটি বাদ দিয়ে নিজেই কমিটি গঠন করেছেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার। এরপর থেকে মালিক সমিতির ১০১টি বাস থেকে দিনে ২০-২২ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে বলে শ্রমিকদের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালেও মালিক গ্রুপের কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। সভাপতি যুবলীগ নেতা ওয়াসীম দেওয়ান এবং কিশোর কুমারকে সরিয়ে নতুন দুই বিএনপিকর্মীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, আবুল কালাম ওরফে নাতি কালাম বাস টার্মিনালের ‘শ্রমিক ইউনিয়ন’ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়া উদ্দিন সিকদারের নামে দখলে নিয়েছেন।
রুপাতলী বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ২৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সুলতান মাহমুদ বলেন, আমাদের কমিটির বয়স হয়েছে মাত্র ছয় মাস। কমিটির মেয়াদ তিন বছর হলেও বিএনপির সদস্য সচিব জিয়া নতুন একটি কমিটি করেছেন। ৫ আগস্ট থেকে তারা দখলে নিয়েছে।
জিয়া উদ্দিন সিকদার বলেন, বাস মালিক সমিতি হচ্ছে একটি ব্যবসায়িক সমিতি। ব্যবসা পরিচালনার জন্য কাঠামোগত প্রক্রিয়া সবসময়ে সচল রাখতে হয়। কিন্তু আগের কমিটির লোকজন আসতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন। তাই মালিকরা সাধারণ সভা করে আমাকে কনভেনর করেছেন।
অন্যদিকে আওয়ামীপন্থীদের দখলে থাকা বিভিন্ন বাজার ও মাছঘাট দখলে নিয়েছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটেছে হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায়।
গত ৬ আগস্ট সকালে হিজলার ধুলখোলা ইউনিয়নে বাবুল মাতুব্বরের খামারে হামলা চালিয়ে ৫০০ মণ সয়াবিন, ৭০টি মহিষ, ৪০টি গরু, ১০টি ছাগল লুট করে নেয় দুর্বৃত্তরা। মেঘনা নদীর তীরবর্তী ৫০টিরও বেশি মৎস্য অবতরণ ঘাট দখল করা হয়। এর পাশাপাশি উপজেলার কৃষি খামার দখল ও চাঁদা নির্ধারিত করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গাফফার তালুকদারের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে জানতে গফফার তালুকদারের মোবাইল ফোনে কল দিলে বন্ধ পাওয়া যায়। তবে গফফার তালুকদারের পক্ষের দাবি, তার (গফফার তালুকদার) বিরুদ্ধে যে সব দখলের অভিযোগ উঠেছে সেগুলো তারই ছিল। কিন্তু এগুলো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দখল করেছিলেন। এখন আওয়ামী লীগ পালিয়ে যাওয়ায় তার দখল তিনি বুঝে নিয়েছেন।
মেহেন্দীগঞ্জের পাতারহাট লঞ্চঘাট ও খেয়াঘাট দখলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের বিরুদ্ধে। এই ঘাটের ইজারা পেয়েছিলেন পৌরসভার কাউন্সিলর মনির জমাদ্দার। স্থানীয়দের ভাষ্য, মেহেন্দীগঞ্জের উলানিয়া লঞ্চঘাটের দখল নিয়েছেন গোবিন্দপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মিজান মাঝি। একইভাবে ভাসান চর লঞ্চঘাটও দখলে নিয়েছেন বিএনপিকর্মীরা।
মনির জমাদ্দার অভিযোগ করেন, ‘সরকার পতনের পর আমার দুটি ঘাটই বিএনপির লোকরা দখলে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগে আমার কোনো পদবি নেই। এরপরও আমার বৈধ ঘাট দখল হয়ে গেছে।’
অভিযোগের বিষয়ে মিজান মাঝি বলেন, ‘লঞ্চঘাট দখলের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আওয়ামী লীগের যেসব লোক এতদিন ঘাট দখল করেছিলেন, তারা সেগুলো ফেলে রেখে আত্মগোপনে গেছেন। এটি তো আর দখল না।’
মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গিয়াস উদ্দীন দীপেন জমাদ্দার বলেন, ‘মেহেন্দিগঞ্জে মাছঘাট একটিও দখল হয়নি। তবে প্রথম দিকে কয়েকটি ভাঙচুর করেছে বিক্ষুব্ধরা। সরকার পতনের পর পাতারহাট লঞ্চঘাট ও খেয়াঘাটের ইজারাদার পালিয়েছেন। পরে খেয়া পারাপার আর লঞ্চঘাটের শৃঙ্খলা ব্যাহত হচ্ছিল। হয়তো বিএনপির লোকজন সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘাট পরিচালনা করছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশালের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, একপক্ষ চলে গেছে আরেক পক্ষ এসে সবকিছু দখল করছে। সরকার আইনের প্রয়োগ সঠিকভাবে করতে না পারায় বিভিন্ন স্থানে দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি চলছেই।
