ক্লাবে জুয়ার আসর বসাতেন সাবেক হুইপ সামশুল হক

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১১:৫৫ এএম

আলাদিনের চেরাগের মতো রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাওয়া সামশুল হক চৌধুরী ওরফে বিচ্ছুকে নিয়ে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে আলোচনা- সমালোচনার কমতি নেই । ক্রীড়াঙ্গনের ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনোসহ জুয়ার আসর বসাতেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান সম্পর্কে ক্যাসিনোর পক্ষ নিয়ে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে সংবাদকর্মীদের কাছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে সামশুল হক চৌধুরীর মন্তব্যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন সরকার ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সারাদেশে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল তার বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থসহ বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব প্রায় সময় টেলিভিশন টক শো’তে সামশুল হক চৌধুরী বিচ্ছুকে নিয়ে বিষোদগার করেছেন। 

২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পুলিশ পরিদর্শক মাহমুদ সাইফুল আমিনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক পোস্টের বক্তব্যেও হুইপের আয়ের একাংশের একটা চিত্র পাওয়া যায়। ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানের সময় এই পুলিশ কর্মকর্তা ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন সামশুল হক চৌধুরী প্রতিদিন চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাব থেকে পাঁচ লাখ টাকা এবং বছরে মাঠ ভাড়া দিয়ে কোটি টাকা অবৈধ আয় করেন। জুয়ার আসর থেকে পাঁচ বছরে তার আয়ের পরিমাণ ১৮০ কোটি টাকা।

পটিয়া উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য ও উপজেলা যুবলীগের সাবেক যুগ্ন আহবায়ক ডি এম জমির উদ্দিন জানান, সামশুল হক চৌধুরী বিচ্ছু চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের কাছে ক্যাসিনোর পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে বলেছিলেন- 'চট্টগ্রামে শতদল, ফ্রেন্ডস, আবাহনী, মোহামেডান, মুক্তিযোদ্ধাসহ ১২টি ক্লাব আছে। ক্লাবগুলো প্রিমিয়ার লীগে খেলে। ওদের তো ধ্বংস করা যাবে না। ওদের খেলাধুলা বন্ধ করা যাবে না। প্রশাসন কি খেলোয়াড়দের পাঁচ টাকা বেতন দেয়? ওরা কিভাবে খেলে, টাকা কোন জায়গা থেকে আসে, সরকার কি ওদের টাকা দেয়? দেয় না। এই ক্লাবগুলো তো পরিচালনা করতে হবে।’

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও পটিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন জানান, ’আওয়ামী লীগ সরকারের ভাবমূর্তি নষ্টকারীদের মধ্যে সামশুল হক চৌধুরী অন্যতম। সেসময় তার মত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করলে আজকে আওয়ামী লীগের এ অবস্থা হত না। তার মত রাজনীতির আদর্শ বিচ্যুত অনুপ্রবেশকারীদের কারণে দলের আজ করুণ অবস্থা। তার নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের দাবি উঠেছে। আদর্শ বিচ্যুত অনুপ্রবেশকারীদের দল থেকে বাদ দেওয়ার সময় এসেছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম আবাহনী লিমিটেডের এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, ১৯৯৯-২০০০ সালে এক শিল্পপতির হাত ধরে চট্টগ্রাম আবাহনী লিমিটেডের মহাসচিব হন সামশুল হক চৌধুরী । চারদলীয় জোট সরকারের আমলে লন্ডনে ফুটবল দল নিয়ে যাওয়ার সময় তার বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগ ওঠে। ওই সময় সরকার ২২ জনের দল নেওয়ার অনুমতি দিলেও আরও ১৫ জন বেশি নিয়ে যান তিনি। এই অনিয়মের কারণে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন সামশুল। ২০০৭ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ লীগে অংশ গ্রহণের আগে ফিফার গাইডলাইন অনুযায়ী নগরীর জিইসি মোড়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, ওই অ্যাকাউন্টে তিনজনের নাম থাকলেও তৎকালীন সভাপতি দিদারুল আলমকে বাদ দিয়েই সামণ্ডলসহ দুজন টাকা উত্তোলন করেছেন। বিষয়টি জানার পর দিদারুল ওই ব্যাংকে অভিযোগ দিলে অ্যাকাউন্ট স্থগিত হয়।’ 

চট্টগ্রাম আবাহনী লিমিটেডের উদ্যোক্তা, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং নগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দিদারুল আলম চৌধুরী দিদার সে সময় গণমাধ্যম কর্মীদের বলেছিলেন, সামশুল হক চৌধুরী ক্লাবে জুয়ার আসর বসিয়ে ক্রীড়াঙ্গনকে ধ্বংস করেছেন। ক্রীড়াঙ্গন থেকে এধরনের দুর্নীতিবাজদের বিতাড়িত করা জরুরি।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান তখন বলেছিলেন, এ ধরনের হাইব্রিড নেতাদের সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মন্তব্যের কারণে আমরা হতবাক-বিব্রত। এসব নেতাদের চিহ্নিত করার সময় এসেছে। সংসদের হুইপ আমাদের দলীয় এমপির ক্লাবে জুয়ার পক্ষে অবস্থান নেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেছিলেন, 'উনি (সামশুল) একজন এমপি হয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত দুর্নীতি ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে তার এ রকম মন্তব্য করাটা কোনো অবস্থায় সমীচীন হয়নি। আমি মনে করি আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি নষ্টকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের এখনই সময়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত