মীমাংসার বৈঠক থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘাত

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৫:২৬ এএম

বরিশাল নগরীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয়ে বিরোধপূর্ণ একটি বাড়ি দখলের চেষ্টার অভিযোগ, সেই ঘটনা কেন্দ্র করে দুপক্ষের হাতাহাতি ও থানায় সাধারণ ডায়েরি ঘটনা শেষ পর্যন্ত গড়িয়েছে বড় সংঘাতে। ওই ঘটনা কেন্দ্র করে গত মঙ্গলবার রাতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) ও সরকারি ব্রজমোহন কলেজের (বিএম) শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তিন থেকে চার ঘণ্টা ধরে চলা ওই সংঘর্ষে এতে উভয়পক্ষের শতাধিক আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৮২ জন বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে ভর্তি।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, নগরীর ব্যাপ্টিস্ট মিশন রোডের বাসিন্দা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী তাসনুভা চৌধুরী জোয়ার পরিবারের সঙ্গে জমি নিয়ে প্রতিবেশী মোহাইন আদনানের পরিবারের সঙ্গে তাদের জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ চলছিল। ওই বিরোধ মেটাতে মোহাইন আদনানের স্ত্রী হালিমা পারভীন বিএম কলেজের কয়েকজন ছাত্রকে সমঝোতার জন্য অনুরোধ করেন। সোমবার রাতে বিএম কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী সমন্বয়ক পরিচয়ে সেই বিরোধ নিরসনে জোয়ার বাসায় গেলে তাদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। সে সময় জোয়া সাহায্য চেয়ে ফেসবুকে লাইভ করেন। খবর পেয়ে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরা এসে বিএম কলেজের সেই শিক্ষার্থীদের মারধর করেন। এ ঘটনায় জোয়া বরিশাল কোতোয়ালি থানায় অমি, মোস্তাফিজুর রহমানসহ চার যুবকের নামে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুপক্ষ মঙ্গলবার বিকেলে মানববন্ধন করেন।

এর মধ্যে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মোস্তাফিজুরের ওপর হামলার অভিযোগ এনে ববির দুই শিক্ষার্থীকে জিম্মি করেন বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা। পরে বরিশাল নগরীর বটতলা এলাকায় ববির ‘আগুন মুখা’ নামে একটি বাসে ভাঙচুর চালান বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় বাসে মধ্যে থাকা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকে আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, এ হামলা ও ববির আহত শিক্ষার্থীদের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রাতে বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ট্রাকভর্তি পাথর, ইট এবং বাসবোঝাই করে বিএম কলেজের দিকে অগ্রসর হন। একপর্যায়ে বিএম কলেজ এলাকায় এ দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ-ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে। এ সময় ববির একটি বাসে ভাঙচুর চালান বিএম কলেজ শিক্ষার্থীরা। এরপর ববি শিক্ষার্থীরা বিএম কলেজ এলাকায় এসে কলেজের তিনটি বাস ভাঙচুরসহ বিএম কলেজ ক্যাম্পাসে ভাঙচুর করেন। এতে অন্তত দুপক্ষের শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। যাদের শেবাচিমে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজিদ বলেন, আমাদের বাসে বিএম কলেজের কিছু উচ্ছৃঙ্খল শিক্ষার্থী ভাঙচুর চালায়। এসব বিষয়ে কথা বলতে কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়েছিলাম। তারা আমাদের দেখেই হামলা চালায়। আমাদের অনেকে আহত হয়েছেন।

বিএম কলেজ শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, তাদের সমন্বয়ককে মারধর করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের ওপর হামলা চালিয়ে অসংখ্য বিএম কলেজ শিক্ষার্থীদের আহত করা হয়েছে। লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালিয়ে তিনটি বাস ভাঙচুর করা হয়েছে। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

বিএম কলেজ শিক্ষার্থী আমান জানান, মধ্যরাতে বরিশাল বিশ^বিদ্যালয়ের চারটি বাস, একটি ছোট ট্রাকভর্তি শিক্ষার্থীরা এসে আমাদের ক্যাম্পাসে হামলা চালায়। যাকে যেখানে যেভাবে পেয়েছে পিটিয়ে আহত করেছে। অনেকের মাথা ফেটেছে, অনেকে মারাত্মক জখম হয়েছেন। এ ছাড়া বাসসহ ক্যাম্পাসে ভাঙচুর করেছে। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

পুরো ঘটনার বিষয়ে তাসনুভা চৌধুরী জোয়া বলেন, আমাদের জমিজমা নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে মামলা চলমান আছে। এর সমাধান আদালত করবে। কিন্তু তারা আমাদের বাড়ি দখলের জন্য আর মামলা প্রত্যাহার করার জন্য রাতের আঁধারে একদল সন্ত্রাসী ভাড়া করে আনছিল। তাই আমি নিরাপত্তার জন্য আমার সহপাঠীদের সাহায্য চেয়েছিলাম।

এ বিষয়ে প্রতিপক্ষ আদনানের স্ত্রী হালিমা পারভীন বলেন, ‘নিজের জমিতে আমরা ভবন করতে পারছি না। তাসনুভার পরিবার আমাদের মামলা দিয়ে ভবনের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। তাই সমাধানের জন্য বিএম কলেজ ছাত্রদের সহায়তা চেয়েছিলাম।

তবে বরিশাল জজ কোর্টের আইনজীবী সালমা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জমিজমাসংক্রান্ত মামলা চলাকালে আলোচনায় বসার জন্য অথবা আলোচনার জন্য প্রস্তাব রাখা যেতেই পারে। সেটি অন্যায় না। তাবে কেউ যদি আলোচনায় বসতে রাজি না হয়। সে ক্ষেত্রে তাকে চাপ প্রয়োগ করা যাবে না, হুমকি-ধমকি দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ হুমকি আর আলোচনা এক কথা না। মামলার বাদীকে প্রেশার ক্রিয়েট করা যাবে না; তাহলে এটি অন্যায় হবে।’

কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সোমবার রাতে বিএম কলেজ সমন্বয়ক মোস্তাফিজুর রহমান রাফিকে মারধর করেন ববি শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনার পর মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে বটতলা এলাকায় অবস্থানকালে দুজন ববি শিক্ষার্থীকে মারধর করেন বিএম কলেজ শিক্ষার্থীরা। দুই ববি শিক্ষার্থীদের মারধরের খবর ছড়িয়ে পড়লে দুই গ্রুপের মধ্যে হামলা ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে দুপক্ষের শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে। তবুও এর স্থায়ী সমাধান করার জন্য সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন একসঙ্গে কাজ করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত