থিম্পুর চ্যাংলিমিথাং স্টেডিয়ামটি বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে বড় লজ্জার এক স্মৃতি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। ২০১৬ সালের ১০ অক্টোবর এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের প্লে-অফে ভুটানের কাছে এই মাঠে হেরে দীর্ঘ দেড় বছরের আন্তর্জাতিক নির্বাসনে চলে যেতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। ভুটানের বিপক্ষে বাংলাদেশের চার দশকের মুখোমুখি পরিসংখ্যানে ওই একটাই হার।
আজ সেই চ্যাংলিমিথাং স্টেডিয়ামেই আট বছর আগের দুঃস্মৃতি ভোলার সুযোগ বাংলাদেশের সামনে। পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা অপরূপ এই মাঠে আজ ও ৮ সেপ্টেম্বর দুদল দুটি ফিফা প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হবে। দুটি ম্যাচই শুরু হবে বাংলাদেশ সময় বিকেল ৬টায়।
সেই লজ্জার স্মৃতি বয়ে বেড়ানো অনেকেই আছেন বর্তমান জাতীয় দলে। আবার সেই ম্যাচে জোড়া গোল করা ভুটান তারকা চেনচো গেলথেসেন মুখিয়ে আছেন নিজ আঙিনায় আরেকবার বাংলাদেশকে হারের লজ্জা দিতে। বিরূপ পরিবেশে হাভিয়ের কাবরেরার দলের দুই ম্যাচ জিতে র্যাংকিং ও রেটিং পয়েন্টে উন্নতির লক্ষ্য পূরণ তাই সহজ নয় মোটেও।
এক সময় হেসে খেলে হারানো ভুটানের চেয়ে বেশ কবছর ধরেই বিশ্ব র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। আজ মাঠে নামার আগেও ১৮৪-তে থাকা ভুটানের চেয়ে দুধাপ পিছিয়ে তারা। প্রীতি সিরিজ হলেও এই দুটি ম্যাচের গুরুত্ব দুদলের জন্য অনেক।
আগামী বছর শুরুতে বাংলাদেশ এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের তৃতীয় পর্ব খেলবে। তার আগে রেটিং পয়েন্টে উন্নতি করতে জিততে হবে বাংলাদেশকে। জিতলে গ্রুপের ড্রয়ে অপেক্ষাকৃত সহজ প্রতিপক্ষ মিলবে। ভুটানের জন্যও এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের তৃতীয় পর্বের প্লে-অফের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ এই সিরিজ।
আট বছর আগে ঢাকায় এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের প্লে-অফে প্রথম লেগের ম্যাচ শেষ হয়েছিল গোলশূন্য ড্রয়ে। টম সেইন্টফিটের অধীনে এরপর থিম্পুতে গিয়ে বাংলাদেশকে মানতে হয় ৩-১ গোলে হারের লজ্জা। সেই হারে শেষ হয়ে যায় এশিয়ান কাপে বাছাইয়ের দ্বিতীয় পর্বে খেলার সুযোগ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে নামে বড় বিরতি। এর আগে পরে অবশ্য আর কখনো পা হড়কায়নি বাংলাদেশের।
১৯৮৪ সাল থেকে সর্বশেষ ২০২৩ সালের সাফ অবধি দুদল মুখোমুখি হয়েছে ১৪ ম্যাচে। যার ১১টিতে জয় বাংলাদেশের। ড্র দুটিতে। আর হার ওই একটাই। সর্বশেষ বেঙ্গালুরু সাফে ভুটানকে ৩-১ এ উড়িয়ে দেয় হাভিয়ের কাবরেরার ছোঁয়ায় ভিন্ন ব্র্যান্ডের ফুটবল খেলা বাংলাদেশ। যে ম্যাচে গোল পেয়েছিলেন আক্রমণভাগের দুই অস্ত্র শেখ মোরসালিন ও রাকিব হোসেন।
আজও গোলের মূল দায়িত্বটা থাকবে তাদের। অবশ্য তারা পাশে পেয়ে যাবেন চোট কাটিয়ে ফেরা ফয়সাল আহমেদ ফাহিমকে। আক্রমণত্রয়ী অনেকদিন পর একসঙ্গে মাঠে নামবেন। আর বদলি হিসেবে সাহস দিতে আছেন দেশকে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ শিরোপা জেতানো দুই তরুণ তুর্কি মিরাজুল ইসলাম ও রাব্বি হাসান রাহুল। তাতে চ্যাংলিমিথাংয়ের কৃত্রিম টার্ফে বাংলাদেশের গোলের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
তবে অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতা মাথায় নিয়ে কৌশল সাজাতে হচ্ছে স্প্যানিশ কোচ কাবরেরাকে। ঘরোয়া মৌসুমের বিরতি চলছে। খেলোয়াড়রা মাঠে নেই বেশ কিছুদিন। তাদের ফিটনেস নিয়ে সেভাবে কাজও করতে পারেননি এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উচ্চতায় এবং কৃত্রিম টার্ফে খেলার অনভ্যস্ততা।
এই সব চ্যালেঞ্জ পেছনে ফেলে কাবরেরার দৃষ্টি অবশ্য জোড়ায় জয়ে, ‘আমরা জানি, আমাদের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। ভুটানের খেলোয়াড়দের মতো আমরা মৌসুমের মাঝামাঝি পর্যায়ে নেই, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতেও আমাদের সময় লেগেছে। তবে আগামী বছরের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে ফিফা উইন্ডোগুলো কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ। তাই এখানে আমরা এসেছি দুটো ম্যাচ জয়ের লক্ষ্যে। এখানে জয় পাওয়ার পাশাপাশি সামনের দুই মাসের উইন্ডোগুলোও আমাদের কাজে লাগাতে হবে।’
অধিনায়ক জামাল ভুঁইয়ার জন্য এটা অগ্নিপরীক্ষা। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এবার ঘরোয়া মৌসুমে কোনো দল পাননি জামাল। তাই নিজেকে প্রমাণের সুযোগ এই সিরিজ। নিজের কথা না ভেবে অবশ্য জামাল ভাবছেন প্রতিপক্ষ নিয়ে।
যে দলে চেনচো ছাড়াও আছেন বেশ কজন ভালোমানের ফুটবলার, ‘ভুটান কাউন্টার অ্যাটাকে বেশ ভালো। তাদের দলে চেনচো আছে, যাকে আটকানো কঠিন। সে বাংলাদেশেও খেলেছে। তবে তাদের দলে চেনচো ছাড়াও আরও কয়েকজন খেলোয়াড় আছে, যারা দারুণ। এই খেলোয়াড়দের দিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে। আমার ধারণা, দুটি ম্যাচই ভীষণ কঠিন হবে। কারণ আমরা তিন মাস কোনো ম্যাচ খেলিনি। আমরা ক্যাম্প করেছি, কিন্তু ভুটানের খেলোয়াড়রা খেলার মধ্যেই আছে।’
এদিকে ভুটান চাচ্ছে হোম ভেন্যুর সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশ হারিয়ে প্লে-অফের আগে আত্মবিশ্বাস কুড়িয়ে নিতে। ভুটানের জাপানি কোচ অতসুশি নাকামুরা শিষ্যদের একটা কথাই বলছেন, বাংলাদেশকে ভয় না পেয়ে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে এবং সেটা জয় করতে। আর অধিনায়ক নিমা ওয়াংদি চান ২০১৬ সালের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে, ‘পরের বছর আমাদের এএফসি এশিয়ান কাপের বাছাই রয়েছে। এই ধরনের প্রীতি ম্যাচ আমাদের দলকে উজ্জীবিত করবে। এটা আমাদের ঘরের মাঠ। আমাদের এই সুযোগটা নিতে হবে।’
৫ আগস্ট রাজনৈতিক পালাবদলের প্রভাবে আসছে ঘরোয়া মৌসুমের আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্লাবগুলো। তাতে কপাল পুড়েছে ফুটবলারদের। তারপরও ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ১৫ বছরের হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মধ্য দিয়ে জয় হয়েছে তারুণ্যের। সেই তারুণ্যকে পুঁজি করেই আট বছর আগের চ্যাংলিমিথাং দুঃস্মৃতি ভোলার সুযোগ বাংলাদেশের।
