সরকার পতনের পর বেকায়দায় পড়েছেন উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। একের পর এক দুর্নীতি-অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসছে তাঁর বিরুদ্ধে। ভাতিজা-ভাগিনাসহ আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে ডিএনসিসিকে পরিবারিক একটি সিন্ডিকেটে পরিণত করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, ছোট-বড় সব খাত থেকে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ লুটপাট করতেন সাবেক এই নগরকর্তা। তাছাড়া ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন, নিয়োগ, বদলি ও ময়লা বাণিজ্যসহ ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছেন রাজধানীর সেবাদানকারী এ প্রতিষ্ঠানটিকে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বনানী কবরস্থানে আগমন উপলক্ষে প্যান্ডেল, গেট ও লাইটিং করে ডিএনসিসি। এ বাবদ খরচ দেখানো হয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা। একই বছর ৯ সেপ্টেম্বর শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষে একই স্থানে একই খাতে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়। ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবসেও প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সেখানে ১০ লাখ টাকা খরচ দেখায় ডিএনসিসি। তাছাড়া মেট্রোরেলের উদ্বোধন উপলক্ষে ৪১ লাখ টাকা খরচ করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে খরচ করা হয় ৪০ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর ডিএনসিসির উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিদেশিদের জানাতে একটি পাঁচ তারকা হোটেলে প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ করে সংস্থাটি। বার্ষিক বনভোজন ও করপোরেশন সভার জন্য ৬৫ লাখ টাকা খরচ করা হয়।
জানা গেছে, প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে রিকশাচালকদের ছাতা, পানির বোতল উপহার দেওয়া কিংবা ছিন্নমূল মানুষকে ইফতার করানো উল্লেখযোগ্য। গত রমজান মাসে গুলশান নগর ভবনের সামনে ছিন্নমূল মানুষদের ইফতার করানোর জন্য প্যান্ডেল তৈরি করে ডিএনসিসি। এই প্যান্ডেল তৈরিতে খরচ দেখানো হয়েছে ১ কোটি টাকার বেশি। ইফতারের খরচ দেখানো হয়েছে ৪৮ লাখ টাকা।
অভিযোগ রয়েছে সাবেক মেয়র আতিকের এসব দুর্নীতি-লুটপাটে সহযোগিতা না করলে বদলি করা দেওয়া হতো কর্মকর্তাদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিএনসিসির এমন কোনো খাত নেই যেখানে লুটপাট হয়নি। বস্তিবাসীর বরাদ্দ থেকে শুরু করে জনগণের করের টাকা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে খরচ করেছেন সাবেক মেয়র আতিকুল। তার কাছে সবাই জিম্মি থাকার কারণে কেউ কোনো কথা বলতে পারেননি। লুটপাটে সহযোগিতা না করলে বদলি ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
২০২১ সালের ২৩ অক্টোবর বেরাইদের একটি রিসোর্টে ডিএনসিসির উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন আতিকুল ইসলাম। ওই সভায় সব মিলিয়ে খরচ হয় ১০ লাখ টাকা। কিন্তু তৎকালীন মেয়রের এপিএস ফরিদ উদ্দিন, তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজাসহ মেয়রের সিন্ডিকেট ২৯ লাখ টাকার ভাউচার তৈরি করেন। অস্বাভাবিক এ ভাউচারে স্বাক্ষর করতে রাজি না হওয়ায় তৎকালীন জনসংযোগ কর্মকর্তা আবুল বাশার মো. তাজুল ইসলামকে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়। নানা চেষ্টা-তদবির করে তাজুল ইসলাম শিল্প মন্ত্রণালয়ে পোস্টিং নেন। কিন্তু ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য বাধ্য হয়ে ওই ভাউচারে স্বাক্ষর করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বক্তব্য নিতে আতিকুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিয়েও সংযোগ পাওয়া যায়নি। সদ্য সাবেক মেয়রের অনিয়ম-দুর্নীতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রশাসক মো. মাহমুদুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক অভিযোগ আসছে, এগুলো আমরা সংরক্ষণ করছি। এখনো কোনো কমিটি গঠন করিনি। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা যদি কোনো উদ্যোগ নেয় তবে আমরা তাদের সহযোগিতা করব।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। এখন আমাদের মূল লক্ষ্য সততার সঙ্গে নাগরিক সেবা দেওয়া।’
