রুগ্ণ স্বাস্থ্যে আশা

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৮:৪৫ এএম

বাংলাদেশ এখন ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় দেশের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা হয়েছে। দলীয়করণ, অসীম দুর্নীতি আর জবাবদিহিহীনতা দেশের প্রতিটি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এমনকি স্বাস্থ্য খাতের মতো সবচেয়ে জরুরি এবং স্পর্শকাতর খাতও কলুষিত হয়েছে। আমরা বছরের পর বছর দেখেছি, স্বাস্থ্য খাত একেবারে ভেঙে পড়েছিল। সাধারণ জনগণকে জিম্মি করে দলীয় রাজনীতির প্রভাবে চলত এই খাত আর এর একশ্রেণির মানুষ অসীম দুর্নীতিকেই প্রধান লক্ষ্য বানিয়েছিলেন। এর প্রধানতম ক্ষতির শিকার হতেন জনগণ। স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া জনগণের অধিকার হলেও কয়েকগুণ অর্থ প্রদান করেও সুষ্ঠু সেবা পেতেন না। গত মাসের ৫ তারিখে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার আগে তার সরকার দেশের যত ক্ষতি করেছে, সম্ভবত তার মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা খাত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। তবে অন্তর্বর্তী সরকার এই অবস্থার পরিবর্তন করতে চাইছে বলে প্রতীয়মান হয়। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কারে স্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ১২ সদস্যের একটি প্যানেল গঠন করেছে সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ গত মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিষয়ভিত্তিক প্রয়োজনীয় সংস্কার ও চিকিৎসাসেবার গুণগতমান উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামো শক্তিশালীকরণের জন্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করা হলো।

প্যানেলের সভাপতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এমএ ফয়েজ ও সদস্য সচিব জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ শাফি মজুমদার। এ ব্যাপারে প্যানেলের সদস্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান বলেন, এ ধরনের প্যানেল গঠন ভালো হয়েছে। দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সরকার বিশেষজ্ঞদের সঠিক পরামর্শ পাবে। স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার হবে। তিনি বলেন, প্যানেল গঠনের আগে তার মত নেওয়া হয়েছে এবং খুব শিগগির এই প্যানেল বৈঠকে বসবে। প্রজ্ঞাপনে প্যানেলের কার্যপরিধি উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হলো ১. বিষয়ভিত্তিক সংস্কারের জন্য নীতিনির্ধারণ, ২. সব স্তরে চিকিৎসা শিক্ষার বিশ্বমানের স্বীকৃতি এবং উচ্চশিক্ষাকে আধুনিকায়নের বিষয়ে পরামর্শ, ৩. নগর, গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার ও কার্যকর, ৪. স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামো শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে সব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জনবল ও যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় নীতিনির্ধারণী ও কাঠামোগত সংস্কার সম্পর্কিত পরামর্শ এবং প্রধান প্রধান চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেমন বিএমডিসি, বিএমআরসি, বিএনএমসিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের রেগুলেটরি কাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার ও শক্তিশালীকরণের বিষয়ে পরামর্শ।

চলতি সপ্তাহেও চিকিৎসা খাতে স্থবিরতা দেখা গেছে। জরুরি বিভাগে বিক্ষুব্ধ রোগীর স্বজনরা চাপাতি হাতে প্রবেশ করেছে। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে ডাক্তারদের মারধর করা হয়েছে। বাংলাদেশে ডাক্তার ও রোগীদের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। ডাক্তাররাও নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবিতে ধর্মঘট করেন। তবে এবার ডাক্তাররা নজিরবিহীনভাবে কমপ্লিট শাটডাউন করেন, যার আওতায় ছিল জরুরি বিভাগও। এই অবস্থা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ডাক্তারদের যেমন নিরাপত্তা প্রয়োজন, তেমনি তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনাও জরুরি। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র অথচ বিপুল জনঘনত্বের দেশে সরকারি ডাক্তারদের ওপর চাপ প্রবল সেই ব্যাপারটিও মাথায় রাখতে হবে। আবার আমরা দেখতে পাই, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডাক্তারদের তীব্র সংকট। যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা ও প্রণোদনা না থাকায় ডাক্তাররা সেসব এলাকায় যেতে চান না। ফলে দেশের বড় অংশের মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন, যদিও এই সেবা তাদের মৌলিক অধিকার। উল্টো পিঠে শহুরে অঞ্চলে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা অত্যধিক ব্যয়বহুল। এতটাই ব্যয়বহুল যে, অনেকে দেশে চিকিৎসার বদলে প্রতিবেশী ভারতে চিকিৎসা করাতে যায়, যার অন্যতম কারণ অর্থ সাশ্রয়। নতুন ১২ সদস্যের প্যানেল একটি আশার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। রুগ্্ণ স্বাস্থ্য খাতের পুনরুদ্ধার অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। এই খাতকে মেরামত করতে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সঠিক পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিতা। ব্যক্তির জন্য স্বাস্থ্যই যেমন সকল সুখের মূল, রাষ্ট্রের জন্যও তাই। বিপুল জনসংখ্যার এ দেশে স্বাস্থ্য খাত ঠিক করাই অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত