ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণের অর্ধেকের বেশি এস আলম গ্রুপ নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ। তিনি বলেন, এসব ঋণ নেওয়া হয়েছে নামে বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে। এসব ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে যেসব সম্পদ জামানত হিসেবে রাখা হয়েছে, তার সবগুলোই অতিমূল্যায়িত। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে নতুন বোর্ডের সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।
২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের ছেলে আহসানুল আলম। ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। নতুন চেয়ারম্যানের দেওয়া হিসাব মতে, ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা একাই বের করে নিয়েছে এস আলম গ্রুপ।
গ্রুপটি তাদের সম্পদ অতিমূল্যায়ন করে এসব ঋণ নিয়েছে বলে জানান ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান। বর্তমানের এস আলম গ্রুপের সম্পদের পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। গ্রুপটির নেওয়া ঋণের বিপরীতে যেসব জামানত রাখা হয়েছিল, তা অপর্যাপ্ত। তাই জামানতের বাইরে থাকা তাদের সম্পদ চিহ্নিত করতে আইন মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, নতুন বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি ছিল। এখন এটা প্রতিদিনই কমে আসছে। আজ (বৃহস্পতিবার) তা দুই হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এ বছরের মধ্যে ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসবে বলে আশা করছি।
তিনি আরও বলেন, অনেক গ্রাহকের এতদিন টাকা তুলতে যে সমস্যা হয়েছে তা আজকের পর আর হবে না। কারণ গত এক সপ্তাহ যে পরিমাণ জমা হয়েছে তার চেয়ে বের হয়েছে কম। নিট ব্যালান্স থাকছে।
এস আলমকে সহযোগিতা করেছে ব্যাংকের এমন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেবেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিচের দিকের কর্মকর্তাদের এখনই সরাতে চাচ্ছি না। নিচের দিকে হিট করলে সব ভেঙে পড়বে। ওপরের কিছু কর্মকর্তাকে সরানো হয়েছে, হচ্ছে। আইন অনুযায়ী সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, অপরাধী কেউ ছাড় পাবে না। আবার ভুল প্রক্রিয়ায়ও কাউকে সরানো হবে না।
ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘হলমার্ক কেলেঙ্কারিরর পর সোনালী ব্যাংকের দায়িত্ব পেয়েছিলাম। হলমার্কের ঘটনা আলোচনায় আসার পরও সোনালী ব্যাংকে আমানত বেড়েছিল। ইসলামী ব্যাংকের সমস্যাটি অনেক বড়। এ জন্য আমরা দায়িত্ব নিয়েই পথনকশা প্রণয়ন করেছি। প্রতিদিন ব্যাংকে উপস্থিত থেকে তদারকির চেষ্টা করে যাচ্ছি। চলতি বছর পুরোটাই হবে গ্রাহকের আস্থা ফেরানোর বছর। সামনের বছরেও এ কাজ চলবে। ২০২৬-২৭ সাল হবে ঘুরে দাঁড়ানোর বছর। ২০২৮-৩০ সাল এগিয়ে যাওয়ার বছর।’
ইসলামী ব্যাংকের নতুন এই চেয়ারম্যান বলেন, ২০২২ সাল থেকে ব্যাংকে তারল্যসংকট শুরু হয়। এখন ব্যাংকের গ্রাহক, প্রবাসী আয় পাঠানো গ্রাহক, শেয়ারধারী ও বিদেশি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান কেউই ব্যাংকের ওপর আস্থা পাচ্ছেন না। এ জন্য ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ে তিনটি নিরীক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা ব্যাংকের ঋণ, বিনিয়োগ ও মানবসম্পদের ওপর নিরীক্ষা করবে। আগে ভালো নিরীক্ষা হয়নি, তাই আজ ব্যাংকের এই পরিণতি।
ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এস আলম গ্রুপের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে ব্যাংকের ৮২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। তবে ইসলামী ব্যাংকসহ এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ছয় ব্যাংকে তাদের শেয়ার হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ইসলামী ব্যাংককে ঘুরে দাঁড় করানোর জন্য একটি রোডম্যাপ করা হয়েছে। আমরা তিনটি পর্যায়ে এ রোডম্যাপ করেছি। প্রথমটি হলো নতুন বোর্ডের শুরু থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া। দ্বিতীয়ত হচ্ছে ২০২৫-২৬ সাল, যেটা হবে ঘুরে দাঁড়ানোর বছর আর শেষটা হলো ২০২৭ থেকে ২০২৯ সাল, এগিয়ে যাওয়ার বছর।
চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংক দখল করে। সেদিন ভোরে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) কয়েকজন কর্মকর্তা ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন এমডি আবদুল মান্নানকে তার বাসা থেকে তুলে নেন। একইভাবে নিজ বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানকে। সম্প্রতি বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে বর্ণনা করেছেন তৎকালীন এমডি আবদুল মান্নান।
