সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ। এর আগে তিনি সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান পদেও দায়িত্ব পালন করেছেন। মাত্র এক মাস আগে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের দুঃশাসনের অবসান হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছাত্র আন্দোলনসহ নানা বিষয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেন এই শিক্ষাবিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : আপনার সময় আপনি ছাত্র আন্দোলন দেখেছেন, অভ্যুত্থানও দেখেছেন। ২০২৪ এর ছাত্র-জনতার এই অভ্যুত্থানটা কীভাবে দেখছেন?
ড. এস এম এ ফায়েজ : প্রথমদিকে তো আমরা খুবই অবাক হচ্ছিলাম। এই ইয়াং জেনারেশনের ডিটারমিনেশন দেখে খুবই অবাক লাগছিল। এটা কোনোদিন আমি দেখিনি, এই ধরনের ছাত্রছাত্রী আমি আগে দেখিনি। এই জিনিস আগে তেমন দেখা যায়নি। আগের ছেলেমেয়েরা তো তাদের মতো করেছে। কিন্তু এভাবে জীবন বাজি রেখে করে যাব এমন ছিল না। দে আর ইউনাইটেড লাইক রক। এই বাচ্চা ছেলেগুলো কীভাবে যে এটা করল! আমরা যখন নিরাশ হয়ে পড়ছিলাম, তখনই তারা চলে এলো। এতটা নিরাশ হওয়ার জায়গাও আমি আগে কখনো দেখিনি আর তারা তখনই চলে এলো এবং আস্থার জায়গাটা সত্যিকারভাবে ফিরিয়ে দিল। তারা ম্যাজিকের মতো সবাইকে আন্দোলনে নিয়ে এলো। রোকেয়া হলের মেয়েরা রাত ১২টার দিকে গেট ভেঙে বেরিয়ে এলো। তাদের যে মুভ আমরা দেখলাম, মনে হলো যে ওরাই লিডারশিপটা নিয়ে নিল। তারপর সব ছেলেরা চলে এলো। টিভিতে যখন দেখছিলাম, মেয়েরা গেট ভেঙে বেরিয়ে আসছে, ছেলেরা আসছে আমি চিন্তা করছিলাম যে এরা কারা! পরে বুঝলাম যে এরা বোধহয় ওই গ্রুপ যারা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ছিল, যারা স্লোগান দিয়েছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ এরাই বোধহয় বড় হয়ে আরও পরিপক্ব হয়ে মাঠে নেমেছে। সড়ক আন্দোলনের সেই সময় তারা যেভাবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করেছিল, এবারও আমরা তাদের ভেতর সেই ডেডিকেশন দেখলাম। যখন নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হলো আমরা সবাই কত ডিসিপ্লিনড হয়ে চলছিলাম। পরে তো সেটা থেমে গেল কোনো কারণে। বুঝতে পারলাম এরাই এখন বড় হয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।
দেশ রূপান্তর : ঢাবির শিক্ষার্থীরা কোণঠাসা হয়ে গেলে প্রাইভেটের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনটা টেনে নিয়ে গিয়েছে, এটা খেয়াল করেছেন? তারা তো বিসিএস বা সরকারি চাকরিতে আসে না, কিন্তু তারাও এগিয়ে এলো...
ড. এস এম এ ফায়েজ: হ্যাঁ। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিও ঝাঁপিয়ে পড়ল। এটা কমপ্লিটলি নিউ ডাইমেনশন হুইচ ওয়ার এভার সিন। তারা দেশের স্বার্থে একটা ডিটারমিনেশন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা তো বিসিএস পরীক্ষা দেবে না, কিন্তু তারাও আন্দোলনে যোগ হয়ে মুভমেন্ট করল। এরা সত্য-মিথ্যার লড়াইয়ের মতো করে সঠিক দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তারা অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মারা যেতে দেখেছে। তারা ভেবেছে আমাদের ভাইকে মেরেছে ‘উই বিলং সেইম আইডেন্টিটি’ ফলে প্রাইভেট-পাবলিক না, এখানে সবাই একসঙ্গে শিক্ষার্থী পরিচয়ে মিশে গিয়েছে।
দেশ রূপান্তর : মোটা দাগে যদি মূল্যায়ন করতে বলি...
ড. এস এম এ ফায়েজ : এরা তো শুধু বাংলাদেশকে কাঁপায়নি, পুরো বিশ্বকে তারা দেখিয়ে দিল যে ইয়াং জেনারেশন ক্যান ডু। এইটা একটা মারাত্মক ডাইমেনশন। এবং সংগ্রামে কারও মারা যাওয়াটাকে তারা মনে করেছে জীবনের চেয়ে বেশি যার সম্মানের। দেশের স্বার্থ, দায়িত্ববোধ এসব তাদের কাছে জীবনের চেয়ে মূল্যবান। এই স্পিরিটটাই হারিয়ে গিয়েছিল, সেটা তাদের কাছ থেকে ফিরে এলো। এটা গড গিফটেড। ওদের অবদান অভাবনীয়। আমি আগে থেকেই বলতাম যে, শিক্ষককে তার পেশার বাইরে থেকেও শিক্ষার্থীকে সম্মান করতে হবে। তাদের চিন্তাভাবনাকে রেস্পেক্ট করতে শেখা টিচিংয়ের বিরাট একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক। এখন আমি দেখলাম সত্যিই তো তাই। উই নিড টু রেস্পেক্ট দেম। চিন্তা করেন, তারা বাবা-মায়ের কাছে লিখে দিয়ে যাচ্ছে যে ‘আমি ফিরতে নাও পারি’। ওহ মাই গড! কী ডেডিকেশন!
দেশ রূপান্তর : আন্দোলন চলাকালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছাড়া আমাদের অন্যান্য পাবলিক ইউনিভার্সিটির ভিসির ভূমিকা সমালোচনায় আসছে। শিক্ষকদেরও বৃহৎ অংশ শিক্ষার্থীদের পাশে সেভাবে দাঁড়াননি, অন্যদিকে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির টিচাররা দাঁড়িয়েছেন। বিষয়গুলো কীভাবে দেখছেন?
ড. এস এম এ ফায়েজ : আসলে বিশ্ববিদ্যালয় আছে বলেই তো আমরা; ছাত্ররা আছে বলেই বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্ররা আছে বলেই যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রদের কাছ থেকে দূরে থাকার কোনো উপায় নেই। আন্দোলন চলাকালে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভিসি ৫ তারিখের আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কী করা উচিত, তা নিয়ে আলাপ করতে এসেছিলেন, আমি নামটা বলছি না। আমি বলেছি ‘যখন ৫/৬ জন সমন্বয়ককে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো আপনি কেন গেলেন না ডিবি অফিসে? কোন রাইটে আপনার ছাত্রদের তারা আটকে রাখবে, জানতে চাইলেন না কেন? আমি যখন ভিসি ছিলাম তখন আর্মির সঙ্গে গন্ডগোল হলো, শিক্ষকদের অ্যারেস্ট করল। আমি তখন জেলখানায় বারবার ছুটে যেতাম। ছাত্রদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। অথচ এই মুহূর্তে তাদের আটকে রাখা হয়েছে অন্যায় ভাবে। আপনি যদি যেতেন মনে হতো আপনি আপনার দায়িত্বটা পালন করছেন। এই বার্তাটা মিডিয়ায় আসত।’ উনি ওনার দায়িত্ব অন্যভাবে পালন করেছেন, তাকে দোষও দিতে চাই না সে ব্যাপারে।
দেশ রূপান্তর : তারা যে ছাত্রদের প্রতি দায়িত্ব পালন না করে, অন্যভাবে দায়িত্ব পালন করছেন এটা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ড. এস এম এ ফায়েজ : আমার এক্সপেরিয়েন্স যেটা বলে কোনো সরকারই বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে যারা অ্যাডমিনিস্ট্রেশন লেভেলে আছেন যেমন ভিসি, প্রোভিসি লেভেলের তাদের বলে না যে, ডু অর ডোন্ট ডু দিস। তারা আসলে নিজের বিবেক দিয়েই পরিচালিত হন এটা আমার ধারণা। কিন্তু সামহাউ একটা সিচুয়েশন ডেভেলপ করল যে তারা মনে করছেন, আমি যদি এভাবে বিহ্যাভ করি তাহলে সরকারকে পারপাস সার্ভ করা হবে। এটা যদি মাথায় না রেখে আমার বিবেক কী বলছে সেটা দিয়ে যদি আমি পরিচালিত হই তাহলে কিন্তু এটা সহজ হয়ে যায়, অনেক সহজ হয়ে যায়। চেয়ারটা কিন্তু সম্মানের জায়গায়, সেটার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, মান রাখতে হবে, মোহ থাকলে চলবে না। মোহ যখনই রাখবেন আপনি ফেইলর হবেন। এ জন্য আমি বলি যে, যারা লবি করেন কোনো পদের জন্য তখন তার ভিশন এরিয়াতে কমিটমেন্ট থাকে না। এ জন্য তাদের বাদ দেওয়া উচিত। মোহ থাকবে না, সম্মানবোধ থাকতে হবে; একটা বিবেচনা বোধ থাকতে হবে এবং যেকোনো সময় পদটা ছেড়ে দিতে পারতে হবে। এখানে দলীয় পরিচয়ও মুখ্য নয়। এ কে আজাদ চৌধুরী আমার খুবই ক্লোজ। তিনি তো আন্দোলন চলাকালে একটা পত্রিকায় স্ট্রেইট বলেছিলেন, স্টুডেন্টদের সমস্ত দাবি মেনে নিয়ে এখনই সলভ করে দেন। আমিও বলেছিলাম যে, ‘এখনই আলোচনা করেন প্লিজ এবং ছাত্রদের সম্মানের চোখে দেখার চেষ্টা করেন। আর দেরি করা কোনোমতে সমীচীন হবে না।’ কিন্তু কথাগুলো যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রোভিসি এবং শিক্ষক অ্যাসোসিয়েশন, সমিতি যদি স্পষ্ট বলত যে, আমাদের বাচ্চাগুলো মারা যাচ্ছে, হোয়াট ইজ দিস? তাহলে প্রাণহানি কমত, সমাধানও অন্যভাবে হতে পারত।
দেশ রূপান্তর : শিক্ষক রাজনীতিকে একরকম দায়ী করা হচ্ছে। আপনি কী মনে করেন?
ড. এস এম এ ফায়েজ : আমিও তো শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলাম। এখন শিক্ষকরা ভোট দিয়ে নির্বাচন করছেন সভাপতি বা অন্যান্য পদে। তারা টিচারের চেয়ে ভোটার হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন বেশি। রিক্রুটমেন্টও সেভাবে হচ্ছে। এই জিনিসটা এখন ব্যাকফায়ার করল। প্রশ্ন হচ্ছে যে আইনের মধ্য দিয়ে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে সেই আইনটা কি আমাদের মেনে নিতেই হবে? এই আইনের পরিবর্তনের দরকার নেই? এই আইনের মধ্য দিয়েই তো দেখলাম কী হলো। আমি বলব না যে চেঞ্জ করতে হবে কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। ছাত্রদের সঙ্গে, অভিভাবকদের সঙ্গে, জ্ঞানীগুণীদের সঙ্গে আলাপ করেন।
দেশ রূপান্তর : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীরা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলছেন। ছাত্ররাজনীতিরও গুণগত পরিবর্তনের কথা আসছে। ছাত্ররাজনীতির বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ড. এস এম এ ফায়েজ : এই আন্দোলন থেকে আমি একটা শিক্ষালাভ করেছি। শিক্ষাটা হচ্ছে, এই ছাত্রগুলো আমার চেয়েও বেশি বিচার-বিবেচনা নিয়ে কথা বলেছে, বলছে। তারা আমার চেয়ে বেশি গভীরে যাচ্ছে, তারা অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে কথা বলছে এবং কোনো স্বার্থ নেই তাদের। তাদের চিন্তাভাবনাকে রেস্পেক্ট দিতে চাই। আমাদের তো লার্নিং প্রসেসের কোনো শেষ নেই। আমার মনে হয়, উই নিড টু লার্ন ফর্ম দেম। এটা তাদের দেশ, আমাদের তো বয়স হয়েছে। তাদের দেশ, তাদের ভবিষ্যৎ এবং তারা জানে তাদের ভবিষ্যৎ অংশীদারদের জন্য কী দেশ রেখে যেতে হবে। সুতরাং তারা সাজেশন রাখুক। সেখানে যদি তারা আমাদের থেকে ইনপুট চায় আমরা অবশ্যই তাদের হাতে হাত রেখে সেটা দেব। নেতৃত্ব তাদের দিতে হবে।
দেশ রূপান্তর : সরকার পতনের পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসিদের গণপদত্যাগ দেখলাম, কিছু কিছু স্কুল-কলেজে শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করানোর খবরও প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে, মাসাধিককাল রাজপথে সংগ্রাম এবং তারপর নানা কারণে শিক্ষার্থীরা এখনো শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারেনি। বিষয়গুলো নিশ্চয়ই আপনার নজরে পড়েছে।
ড. এস এম এ ফায়েজ : ঢাকা ইউনিভার্সিটির কথাই বলি। যিনি উপাচার্য হয়ে এলেন তিনি অত্যন্ত দক্ষ, উপযুক্ত একজন লোক, হাইলি মেরিটোরিয়াস। উনি ২০০৬ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন শিক্ষক হিসেবে তখন আমি ভাইস চ্যান্সেলর। আমি কমিটিতে ছিলাম, আমি জানি হাউ ব্রিলিয়ান্ট হি ইজ। তিনি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনেও অনেক ভালো করবেন। উনি বলেছিলেন সপ্তাহের মধ্যে উনি ঠিক করবেন। আজ পেপারে দেখলাম যে সিন্ডিকেট যেহেতু বন্ধ করছেন, সিন্ডিকেট দিয়েই আবার চালু করতে হবে। কিন্তু এখন তো সিন্ডিকেট মেম্বাররা আসছেন না। আমি রিকোয়েস্ট করব, আপনি এটাকে খুলে দেন, খুলে দিয়ে বলেন যে এটা পরবর্তী সিন্ডিকেট যখন বসবে তখন রিপোর্ট করা হবে। বন্ধ রেখে কী হবে খোলা বিশ্ববিদ্যালয় হলো বিশ্ববিদ্যালয়। কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব প্যাটার্নে পরিচালিত হয়, ঢাকা ইউনিভার্সিটিও একটা। ইউজিসি কিন্তু এটা বন্ধ করতে পারে না।
দেশ রূপান্তর : হ্যাঁ আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ইউজিসি পাবলিক ইউনিভার্সিটি বন্ধের একটা ঘোষণা দিল। আপনি তো ইউজিসির চেয়ারম্যান, ঢাবির ভিসিও ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের যে কথা আমরা শুনে থাকি, এটা তো তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আপনি ভালো বলতে পারবেন এ বিষয়ে...
ড. এস এম এ ফায়েজ : এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত। ইউজিসি ইচ্ছে করলে যেটা পারে যে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে বসে একটা মত দিতে পারে। সে বলতে পারে যে, আপনারা বসে সিদ্ধান্ত নেন, আমাদের যদি প্রয়োজন মনে করেন আমরা কন্ট্রিবিউট করব, কিন্তু সম্পূর্ণই আপনাদের ডিসিশন। যে কারণে ইউজিসির অর্ডারে কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়নি; বন্ধ করতে হয়েছে ঢাকা ইউনিভার্সিটির সিন্ডিকেট অর্ডার দিয়ে। আবার খুলতে গেলে যে আবার সিন্ডিকেটকে বসতে হবে সেটা তেমন নয়; কেননা উনিই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান, পরে সেটা সিন্ডিকেট ডেকে সময়-সুযোগ মতো রিপোর্ট করা যাবে। এখন খুলে দেওয়াটা বোধহয় গুরুত্বপূর্ণ।
দেশ রূপান্তর : চারটা ইউনিভার্সিটি ছাড়া বাকিগুলো আপনাদের অধীনে, এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটা আসে...
ড. এস এম এ ফায়েজ : না, সবগুলো ইউনিভার্সিটিই। কিন্তু চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা যে বললেন, তাদের নিজস্ব আইডেন্টিটি, সেটা অন্যদের নেই। কিন্তু ঢাকা ইউনিভার্সিটিরও ফান্ড ইউজিসি থেকে যায়, কানেকশনও রয়ে গেছে, বিলোংগিংনেস, ফ্যামিলি বন্ডনেসটা রয়ে গেছে। খবরদারি তো কোনো জায়গাতেই উচিত না। রেসপেক্টফুলি দেখতে হবে, সবাই সেইম আইডেন্টিটি বিলং করছে। যেখানে করাপশন থাকবে সেখানে একটা খবরদারি থাকতে পারে। কিন্তু সুন্দর করে কাজ করার ইচ্ছে যখন থাকে তখন সহযোগিতা লাগবে। এই সহযোগিতার জায়গাটাই সৃষ্টি করতে চাই। ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্টস কমিশন হচ্ছে সহযোগিতার জায়গা।
দেশ রূপান্তর : গত সরকার জেলায় জেলায় একটা ইউনিভার্সিটি করে দিয়েছে সেগুলো কী মানে ইউনিভার্সিটি হয়েছে সেটা নিয়ে বড় একটা প্রশ্ন। এই জায়গাটা কীভাবে দেখেন?
ড. এস এম এ ফায়েজ : আপনি টিচার নিয়োগ যদি ভালোভাবে করেন, উপযুক্ত লোককে উপযুক্ত পদে নিয়োগ দেন প্রশাসনিক ক্ষেত্রে, তাহলে তো সমস্যা হবে না। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেরিটকে প্রাধান্য দিয়ে নিয়োগ দিতে হবে, নাথিং বাট মেরিট। আবার শিক্ষার্থীরা যখন কম্পিটিশনের মধ্য দিয়ে ভর্তি হবে, সুষ্ঠু ব্যবস্থা থাকবে যাতে সিটগুলো মেরিটের মধ্য দিয়ে বরাদ্দ হয়, পাশাপাশি যাদের থাকার ব্যবস্থা নেই তাদের ব্যাপারেও ব্যবস্থা নিতে হবে। গণরুমটা থাকবে না।
দেশ রূপান্তর : প্রায় প্রতিটি ইউনিভার্সিটিতেই দেখছি যে স্থানীয়দের সঙ্গে ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টদের সঙ্গে একটা বৈরী সম্পর্ক। এটা কি আপনি অ্যাড্রেস করছেন?
ড. এস এম এ ফায়েজ : এটি আগে সেই বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখতে হবে। যদি এমন হয় যে বিশ্ববিদ্যালয় হিমশিম খাচ্ছে, আমাদের সহযোগিতা দরকার, আমরা এগিয়ে যাব, বক্তব্য রাখব। দায়িত্বশীল জায়গা থেকে আমরা বক্তব্য রাখব। এখন যে ছাত্রদের দেখছি আমার মনে হয় এটা আর থাকবে না।
দেশ রূপান্তর : সিলেটের স্থানীয় লোকজন গিয়ে হলের স্টুডেন্টকে বের করে দিয়েছে রিসেন্টলি...
ড. এস এম এ ফায়েজ : এটা আসলে আমার মনে হয় তারা এগুলোর সুযোগ নিচ্ছে। আবার আগের ঘটনাগুলো যেমন রাবির ঘটনা কিংবা ঢাবিতেও কয়েকবার হয়েছে গাউছিয়া মার্কেট, নীলক্ষেতে। আসলে ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে ঘটে যায়। এই ছোটখাটো দিক থেকে বড় ঘটনা জন্ম নেয়। রিসেন্টলি একটা ঘটনা বরিশাল ইউনিভার্সিটির সঙ্গে বিএম কলজের ছাত্রদের হয়ে গেল। হুট করেই। এগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ঘটে আবার ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু খুব সিরিয়াস কিছু ইস্যুও আছে। আলোচনা করে দেখতে হবে। এই ছেলেগুলো হুট করে ইমোশনাল হয়ে যায় তো, যেমন দুই ভাইয়ের মধ্যে ঝামেলা হয়। তো এই জিনিসগুলো আলোচনার মধ্য দিয়ে ঠিক করতে হবে। এখানে যদি আমাদের ভূমিকার প্রয়োজন পড়ে অবশ্যই আমরা এগিয়ে যাব। এখানে সবাইকে এগুলোর জন্য কথা বলতে হবে। আমি বলি যে বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো রাখতে পারি, হলের সিট বণ্টন যেভাবে হয়, অর্থাৎ অ্যালটমেন্ট যদি সঠিকভাবে হয়, ফ্যাসিলিটিস যদি দিতে পারে তাহলে অনেক সমস্যাই মিটে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা ভর্তি হতে আসে তারা মেধাবীই বলা যায়। কিন্তু তারপরও গণরুমে থাকছে, সুস্থ অবস্থা পাচ্ছে না, জায়গা নেই, পরিবেশ নেই। লাইব্রেরিতে জায়গা নেই পড়াশোনা করবে, ডাইনিং হলে গিয়ে যে খাবার খায় সেটা মানসম্পন্ন না। আবার গণরুমে থাকতে গেলেও দেখা যায় কিছু একটায় পার্টিসিপেট করতে হবে, কোনো পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। এই অবস্থায় তার কাছে কিছু এক্সপেক্ট করা কঠিন। কিন্তু এগুলো যখন দিতে পারব তখন এদের কাছে আমাদের এক্সপেক্টেশন অনেক বেড়ে যাবে। তারাও পড়াশোনামুখী হয়ে যাবে।
দেশ রূপান্তর : ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের একটা ঘাটতি দীর্ঘদিন থেকেই তৈরি হয়েছে। এই জায়গাটাকে নিয়ে কী বলবেন?
ড. এস এম এ ফায়েজ : ডিপার্টমেন্টগুলোতে যদি যাই স্বাভাবিক অবস্থায় সেখানে একটা সুন্দর সম্পর্ক আছে বলে আমি মনে করি। কিন্তু এখন যেটা স্পেশাল ডাইমেনশন সেখানে সরকার একদিকে আর বাকি সবাই একদিকে, এমন একটা পর্যায়ের মুখোমুখি হলাম আমরা। যারা নিজেদের সরকারের দল হিসেবে দাবি করেছে, তারা সেভাবে নিয়োগ পেয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে দলমতের ঊর্ধ্বে যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এরা তখন একটা পক্ষ হয়েছে। তারা ছাত্রদের সঙ্গে যুক্ত না হয়ে তারা সরকারের দিকে বেশি ঝুঁকেছে, সেভাবে চিন্তাভাবনা করেছে। এই কারণেই সম্পর্কের গ্যাপটা আমাদের সামনে ধরা পড়েছে। আদার্স বিষয়গুলো আপনি ডিপার্টমেন্টের ভেতরে গেলে দেখবেন মোটাদাগে ঠিক আছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একসেপ্টেন্স আছে। ছাত্রদের রেসপেক্টফুলি দেখার চেষ্টা করা লাগবে। তাদের তো সম্মানের চোখে দেখতে হবে, স্বীকার করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়টা শুধু শিক্ষকরা ক্রিয়েট করবে না, ছাত্র-শিক্ষক মিলে ক্রিয়েট করতে হবে। সমাজের সবকিছু যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়, ছাত্র-শিক্ষকদের একসঙ্গে মুভ করতে হবে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য সুন্দর একটা কথা বললেন যে, আমরা আমাদের সোসাইটিতে যে সমস্যা দেখব সেটাকে আমি ক্লাসরুমে নিয়ে আসতে চাই। কথাটা আমার খুবই ভালো লেগেছে। দে থিংক অ্যাবাউট ইট, ইমপ্রুভ দ্যা সোসাইটি, ডু সামথিং গুড ফর দ্যা সোসাইটি। এটাই তো হওয়ার কথা।
দেশ রূপান্তর : যে শিক্ষক তার স্টুডেন্ট মার খাচ্ছে তখন তার পাশে সে দাঁড়াতে পারেননি তিনি কীভাবে এখন শ্রেণিকক্ষে ফিরবেন? স্টুডেন্টরা তার দিকে কীভাবে তাকাবে?
ড. এস এম এ ফায়েজ : আমি যদি তাদের প্রতি অনাস্থার জায়গায় থেকে কথা বলি, তাদের ইনসাল্টিং টোনে কথা বলি, তাদের আরও দূরে সরিয়ে দেওয়া হবে। লেট আস নট কনডেম দেম, বাট লেট আস ট্রাই টু সে সামথিং অ্যান্ড ডু সামথিং, যে এখান থেকে তারা বেরিয়ে আসবে।
দেশ রূপান্তর : আপনি পিএসসিতে ছিলেন। একটা নিউজব্লাস্ট হয়েছিল যে ‘পিএসসির প্রশ্ন ফাঁস’। সব মিলিয়ে পিএসসিতে কোনো ধরনের সংস্কার আপনি আশা করেন?
ড. এস এম এ ফায়েজ : আমি পিএসসিতে ছিলাম। সেই ৯৩ থেকে ৯৮ সালের কথা। প্রশ্ন ফাঁস কেন হবে? প্রশ্ন ফাঁসের জায়গা যেন কোনোভাবে সৃষ্টি না হয় সেজন্য আমি প্রেসে গিয়েছি, দেখেছি সবকিছু, জেনেছি তারা কীভাবে কী করবে। আমি বলব যে, যদি একজন চেয়ারম্যান চান, কনসার্ন মেম্বাররা যদি চান যে প্রশ্ন ফাঁস হবে না তাহলে প্রশ্ন ফাঁস করা কিন্তু সম্ভব না। তো এটা ম্যাটার অফ ইন্টিগ্রিটি। আমি যে মেম্বারগুলো পেয়েছিলাম তারা অত্যন্ত সৎ। পিএসসির তেমন হতে হবে। লবি করলে হবে না, খুঁজে খুঁজে বেস্ট মানুষদের নিয়ে আসতে হবে।
দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
ড. এস এম এ ফায়েজ : আপনাকেও ধন্যবাদ।
অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়
