বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সম্পর্ক একটি সন্ধিক্ষণে এসে পড়েছে। যেখানে আওয়ামী শাসনের সময়কার ‘দুদেশের মধ্যে মধুর সম্পর্ক’-এর বুলি আর কার্যকর নয়। ওই সময় আমরা জোর গলায় তিস্তার পানি চাইতে পারিনি। ভারত বাংলাদেশের বন্দর ও করিডর ব্যবহার করে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোতে পণ্যসামগ্রী পরিবহন করলেও বাংলাদেশকে নেপাল ও ভুটানে যাওয়ার ট্রানজিট দেওয়া হয়নি। করিডর পাওয়া তো বাংলাদেশের জন্য এক দুঃস্বপ্ন। নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার চরম বাণিজ্য ঘাটতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
যেকোনো দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে অন্তত দুটি সংস্করণ বিবেচনা করতে হয় একটি সরকারি এবং অপরটি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু মুশকিলের হচ্ছে, সরকারি সিদ্ধান্তের ২০ শতাংশেরও কম গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় (মার্কিন গবেষণা)। সংশ্লিষ্ট দুটি দেশ কোনো একটি বিষয়ে একান্ত বৈঠকে চরম ‘ঝগড়া’ করে বাইরে এসে বলবে, ‘আমাদের আলোচনা অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। অত্যন্ত গঠনমূলক এই আলোচনায় দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায়।’
কিন্তু কূটনীতি নিয়ে চরম সন্দেহের অবকাশের কথা ২,৩০০ বছরেরও বেশি আগে পন্ডিত ও মৌর্য বংশের প্রধানমন্ত্রী চাণক্য আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আকাশের অতি উঁচুতেও পাখির উড্ডয়ন দেখা সম্ভব, কিন্তু রাজ কর্মচারীর (পড়ুন দুই দেশের প্রধানগণের) গোপন কার্যকলাপ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সমভাবে অসম্ভব।
বাংলাদেশের বিদেশনীতি ‘কারও সঙ্গে বৈরিতা নয় সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ মানতে গিয়ে বাংলাদেশের পালিয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী দুই নৌকায় পা দিয়ে শেষে পানিতেই পড়ে গেলেন! একটি নৌকা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ভারত আর অপরটি হচ্ছে চীন-রাশিয়ার অ্যালায়েন্স। একবার তিস্তা ব্যারাজ ভারতের কাছে উন্নয়নের জন্য ন্যস্ত করার কথা শোনা যায় পরে দেখা যায়, এই কাজটি করতে প্রচন্ড আগ্রহ দেখাচ্ছে চীন। কিন্তু পরিশেষে ভারতকে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প উন্নয়নের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিশ্রুতি দেয়। সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন নিয়েও চৈনিকদের বঞ্চনা কম নেই। কিন্তু শেখ হাসিনার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যে কখনই ভালো ছিল না তা টলটলে পানির মতো পরিষ্কার ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মোড়লিপনায় নানা আন্তর্জাতিক প্যাক্টে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে টালবাহানায় উভয় পক্ষই বেশ বিরক্ত হয়েছিল। আমাদের এই পরিপ্রেক্ষিত মাথায় রেখেই বাংলাদেশ-ভারত ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে হবে। মনে রাখা দরকার, আধিপত্যবাদী ও শক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার বৈরিতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কৌশল খাটিয়ে, ভারতকে সঙ্গে নিয়ে ওই দুদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রচনা করতে চেয়েছিল। একইভাবে ভারতও এখন দুই নৌকায় (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন-রাশিয়ার অক্ষ) পা দিয়েছে। হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের বৈদেশিক নীতি এ সময়ে যে সুস্থির নেই তা অনুমান করা যায়।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে মতপার্থক্য দূর করার উপায় নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। ভারতের উদ্দেশে বাংলাদেশের বার্তা খুব পরিষ্কার বাংলাদেশ তিস্তাসহ দুদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে টালবাহানা আর শুনতে চায় না।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রভাব বাড়াতে চায় ওয়াশিংটন
চীনের আর্থ-সামাজিক ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীন বিশ্ব জুড়ে অনেক রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পর এশিয়ায় তার মনোযোগ বাড়িয়েছে। ইতিমধ্যে চীনের বাস্তবায়নাধীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), ইউরেশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং আফ্রিকা জুড়ে সংযোগ, বাণিজ্য এবং যোগাযোগের উন্নতির লক্ষ্যে বিশাল অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পটি পশ্চিমাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন-ভিত্তিক এক-মেরুর বিশ্বে নতুন আরেক মাতবরের উপস্থিতি তাদের কারুরই ঠিক পছন্দ নয়। এদিকে ভারতের সঙ্গে রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক উন্নতির বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাঞ্ছিত নয়। এমন প্রেক্ষাপটে ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ভারতকেও উৎকণ্ঠায় ফেলবে তাতে আর সন্দেহ কী?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে এশিয়ায় তার প্রভাব বাড়াতে চায়। বাংলাদেশের কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ঢাকাকে খুব দরকার ছিল ওয়াশিংটনের। মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভারত। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যখনই বাংলাদেশের সুশাসন ও নির্বাচন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র কথা তুলেছে- প্রতিবারই ভারত হাসিনা সরকারকে আগলে রেখেছে। এখন মনে হচ্ছে, ওয়াশিংটন এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করতে উদ্যত হয়েছে। অন্যভাবে বলা যায়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অদূরভবিষ্যতের সম্পর্ক নির্ভর করছে ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সম্পর্কের গতিশীলতার ওপর। বিষয়টি একটু খোলাসা করা দরকার।
ইন্দো-প্যাসিফিক ও যুক্তরাষ্ট্র-চীন বিষয়ক গবেষক ডেরেক গ্রসম্যান (Derek Grossman) এপ্রিল মাসে ভারতকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘মার্কিন-ভারত অংশীদারত্বের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ব্যাপক আশাবাদ থাকা সত্ত্বেও এটি প্রতীয়মান হয় যে, যতটা দেখা যায় তার চেয়ে এই সম্পর্ক অনেক বেশি ভঙ্গুর।
প্রকৃতপক্ষে, দুটি দেশ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে বৈরিতা (Friction) অব্যাহত রেখেছে, যা কিনা সমাধান না করলে যুক্তরাষ্ট্র ও নয়াদিল্লির ভবিষ্যৎ সহযোগিতা দুর্বল, এমনকি লাইনচ্যুত হতে পারে।’
কী কী বৈরিতা রয়েছে ভারত ও মার্কিনিদের মধ্যে?
উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেছেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গভীর উদ্বেগ রয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ভারতকে সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের প্রতি কম সহনশীল করে তুলছে।
এদিকে ২০১৯ সালে মোদি সরকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীরের ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে প্রদত্ত বিশেষ আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা প্রত্যাহার করে নেয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, তারপর থেকে, কাশ্মীরিরা দমনমূলক আচরণের শিকার হচ্ছে। তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকার খর্বিত হচ্ছে।
একই বছরের শেষের দিকে ভারতীয় সংসদ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস করে, যা আফগানিস্তান, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের অমুসলিমদের ভারতীয় নাগরিক হওয়ার জন্য একটি দ্রুত পদ্ধতি বা ট্র্যাক প্রদান করতে ইচ্ছুক। এটিকে আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক মার্কিন কমিশন ‘ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতায় একটি উল্লেখযোগ্য নিম্নগামী মোড়’ হিসেবে নিন্দা করেছিল। শেষে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে রামমন্দিরের উদ্বোধনের বিষয়টি পশ্চিমা দেশগুলো ভালোভাবে নেয়নি।
আবার অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতাও ভালোভাবে দেখছে না মার্কিন কর্তৃপক্ষ। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, বিশেষ করে অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ কখনো কখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে Conflic of Interest তৈরি করে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য ভারত দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজারে পরিণত হয়েছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের প্রেক্ষাপটে মস্কোর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা না মেনে সেখান থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করাকে ভালোভাবে নেয়নি ওয়াশিংটন। ভারত কর্তৃক রাশিয়ান এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র চাইলে Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act-এর আওতায় ভারতের ওপর নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। তারই কিছু আলামত এখন প্রতিফলিত হচ্ছে বলে মনে হয়। ভুটানের ডোকলামে চৈনিক সেনা অনুপ্রবেশ নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছিল মার্কিনিদের হস্তক্ষেপে তা সামাল দেওয়া হয়েছিল। এখন অরুণাচলে ও লাদাখ অঞ্চলে যে সংকট মাঝে মাঝেই তৈরি হচ্ছে তাতে আর মার্কিনিদের সাড়া সেভাবে মিলছে না। এসবের মধ্যে ইসরায়েলের চিরশত্রু ইরান থেকে ভারতের তেল ক্রয়ের বিষয়টি ওয়াশিংটনকে অনেক রুষ্ট করেছে। যখন ভারতের মতো একটি দেশ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করে, তখন এটি ইরানকে কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন প্রচেষ্টাকে জটিল করে দেয়। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের আন্দোলন ভারতকে চিন্তিত করেছে
এমন একটি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উত্তাল আন্দোলন এবং দেশ থেকে শেখ হাসিনার পলায়ন ভারতকে ভাবিত করেছে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। নয়াদিল্লি নিশ্চিতভাবে হিসাব কষছে, বাংলাদেশে বিএনপি ও জামায়াত জোটের সরকার অতীতে ভারতের যথেষ্ট চিন্তার কারণ হয়েছিল। এদিকে পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে নানাবিধ পদক্ষেপ নিচ্ছে। তারা ভিসা ছাড়াই বাংলাদেশিদের জন্য পাকিস্তান ভ্রমণ উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নবায়ন ভারত মোটেও স্বস্তিদায়ক মনে করবে না। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ভারতের নানা অংশে, পাকিস্তানে এবং অন্যান্য গণতন্ত্রকামী দেশকে উজ্জীবিত করেছে। ফলে এই আন্দোলনের সুফল সহজেই ভারত বাংলাদেশকে পেতে দেবে না, সেই অভিযোগ বিভিন্ন মহল থেকে আসছে।
প্রাচীন পন্ডিত, অর্থনীতিবিদ ও কূটনীতিক চাণক্যের কথা দিয়েই আলোচনাটি শেষ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, অতি পরিচয়ে দোষ আর ঢাকা থাকে না। আর, ‘উৎসবে, বিপদে, দুর্ভিক্ষে, শত্রুর সঙ্গে সংগ্রামকালে, রাজদ্বারে এবং শ্মশানে যে সঙ্গে থাকে, সে-ই প্রকৃত বন্ধু।’ এখন ভেবে দেখুন ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটি কি সে রকম?
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
