সময় সামনে এগোনোর 

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:৫৪ এএম

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তী সরকারের এক মাস পূর্ণ হয়েছে গতকাল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সময় যত গড়াচ্ছে হাসিনা সরকারের অনিয়ম, দুর্নীতি, দলীয়করণ ও অর্থ লোপাটের চিত্র ফুটে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে আর্থিক খাতসহ প্রত্যেকটি খাত সংস্কারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে অন্তর্র্বর্তী সরকার।

মাত্র এক মাসের মধ্যেই সংস্কারের উদ্যোগ হিসেবে বিগত সরকারের চুক্তিভিত্তিক সব সচিবকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। বেশিরভাগেই দায়িত্বে রয়েছেন নতুন মুখ। বিচার বিভাগে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়েছে। দেশের বেশিরভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও প্রক্টর দায়িত ছেড়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছেন শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও পাল্টেছে অবস্থান। এরই মধ্যে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের শুল্ক কমিয়েছে সরকার। সারা দেশে জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে বসানো হয়েছে নতুন প্রশাসক। ইতিমধ্যে বর্তমান সরকারকে বেশকিছু আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা আন্দোলন, এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল, রিকশাচালকদের আন্দোলন, ডাক্তারদের আন্দোলন এবং পোশাক শ্রমিক আন্দোলন। সরকারের সঙ্গে আলোচনায় সেগুলোর সুরাহাও হয়েছে। আনসার আন্দোলনেরও একটা সুরাহা হয়েছে। এই সবই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাফল্য যা গত এক মাসের মধ্যেই সমাধান করা হয়েছে। অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে সংস্কার ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র জানতে শ্বেতপত্র প্রণয়নে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে নেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পোশাক, ব্যাংক, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতসহ বেশকিছু খাতের বিদ্যমান সংকট মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশের বেপরোয়া গুলি তাদের ওপর জনঅসন্তোষ বাড়িয়েছিল। সরকার পতনের পর দেশের অনেক থানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পুড়িয়ে দেওয়া হয় থানা-পুলিশের কাজে ব্যবহৃত গাড়ি। রাজধানীসহ সারা দেশে পুলিশি ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ে। ফলে সবকিছু বন্ধ করে কর্মবিরতিতে যায় পুলিশ। এরই মধ্যে সরকারের নির্দেশ ও আলোচনার পর কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে পুলিশ কাজে ফিরেছে। তবু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনো পুলিশের তৎপরতা খুব একটা চোখে পড়ছে না। এরকম পরিস্থিতিতে জনসাধারণের ভেতর এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে। এ ব্যাপারে বর্তমান সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

দেড় দশক ধরে অধিকাংশই বিদেশি পরামর্শদাতাদের তৈরি মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত চলেছে। যেসব প্রকল্প পরিবেশগত বিপর্যয়, প্রকৃতির জন্য ধ্বংসাত্মক, আমদানিমুখী এবং বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত, সেগুলোর কী হবে তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল রেখে অর্থনীতিকে বেগবান করাই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। আশার কথা সরকারও সেই পথেই হাঁটছে। জানা গেছে, রাষ্ট্র সংস্কারের রোডম্যাপ দ্রুতই চূড়ান্ত করা হবে। এখন একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ শুরু হয়েছে। যে কারণে সাধারণ মানুষের এত দাবি। মানুষ তাদের বঞ্চনার কথা বলছেন। আশার কথা বলছেন। সরকার দক্ষতার সঙ্গে সেগুলোর সমাধান করারও চেষ্টা করছে। আরও সংস্কার দরকার আছে। তবে রাষ্ট্র সংস্কারের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহে যে ধরনের সংস্কার দরকার, তা স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া হলে আর কোনো বিতর্ক থাকবে না।

সবকিছু ছাপিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অল্প সময়ের মধ্যে যে বিশাল কর্মপরিধিতে নিজেকে জড়িয়েছে, তা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে এই সরকারকে নির্বিঘ্নে কাজ করতে দেওয়া দরকার। এই মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা সমীচীন হবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ এবং স্বাভাবিক পর্যায়ে রেখে, অর্থনীতিকে সচল করাই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কাজ। পরিস্থিতিই বলবে, কবে নাগাদ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রয়োজন। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এ বিষয়ে সবাই একমত হবেন। দল-মত নির্বিশেষে এখন সময় সামনে এগিয়ে যাওয়ার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত