রক্তচোষা মাথার পোকা

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০১:০৩ এএম

উকুন শুধু একটি পোকা নয়, সংস্কৃতিরও অংশ হয়ে পড়েছে। যেমন বাঙালি নারীর দল বেঁধে উকুন বাছা। রক্তচোষা এ প্রাণী কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীতে, লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

উইকিপিডিয়ার মতে, উকুন বা লিস তিন হাজারেরও বেশি প্রজাতির হয়ে থাকে। এরা পাখাহীন থির‌্যাপটেরা বর্গভুক্ত পোকা। এদের মধ্যে মাত্র তিনটি প্রজাতি মানুষের ক্ষতি করে। যারা প্রায় সব পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীর গায়ে পরজীবী হিসেবে বাস করে। তবে বাদুড়, তিমি, ডলফিন, এমন কয়েকটি প্রাণী উকুন আক্রান্ত হয় না। বেশিরভাগ উকুন আশ্রয়দাতার চামড়া এবং চামড়ার ওপরস্থ ময়লা খেয়ে থাকে। আবার কোনোটি রক্ত এবং গ্রন্থি নিঃসৃত তেল খেয়ে বাঁচে। সাধারণত স্তন্যপায়ীদের শরীরে এক থেকে তিন ধরনের উকুন থাকে আর পাখিদের গায়ে থাকে দুই থেকে ছয় ধরনের। মানুষের মাথায় এক ধরনের এবং শরীরের অন্য অংশে ভিন্ন ধরনের উকুন বাস করে। উকুনকে আশ্রয়দাতার শরীর থেকে সরিয়ে নিলে সাধারণত সে আর বেশি সময় বাঁচে না। উইকিপিডিয়া থেকে আরও জানা যাচ্ছে, সাধারণত তিন থেকে দশ বছর বয়সী শিশু ও তাদের পরিবারে উকুন বেশি দেখা যায়। পুরুষের চেয়ে নারী বেশি উকুনে আক্রান্ত হন। আফ্রিকান বংশোদ্ভূতদের মাথায় খুব কম উকুন থাকে; কারণ তাদের চুল বেশি ঘন। মাথার উকুন সরাসরি স্পর্শের মাধ্যমে একজনের মাথা থেকে আরেকজনের মাথায় ছড়িয়ে পড়ে। উকুনের ডিমকে নিট বলা হয়, যা থেকে একটি নিম্ফ বা বাচ্চা জন্ম নেয়, পরে সেটা পূর্ণবয়স্ক উকুনে পরিণত হয়। উকুন প্রতি রাতে এক বা একাধিকবার খাদ্য গ্রহণ করে। সুচের মতো মুখ উপাঙ্গ ব্যবহার করে তারা মানুষের মাথার চামড়া ছিদ্র করে রক্ত খেয়ে থাকে। সে সময় তাদের লালা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, এতে চুলকানি সৃষ্টি হয়।

উদ্ভব ও বিকাশ

বিজ্ঞানীরা জেনেটিক গঠনের ওপর ভিত্তি করে মানুষের মাথায় বসবাসকারী উকুনকে শ্রেণিভুক্ত করেন। তারা একে বলেছেন, ক্লেড। মানুষের উকুন এ, বি, সি, ডি, এবং এফ-এর ক্লেডের বিভিন্ন ভৌগোলিক বণ্টন এবং জেনেটিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গবেষণা অনুসারে ক্লেড বি মাথার উকুন উত্তর আমেরিকায় উদ্ভূত হতে পারে, তবে অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বহুদূরে স্থানান্তরিত হয়েছে। উকুন প্রজাতি ইতিহাসের কোনো এক সময়ে গরিলা এবং শিম্পাঞ্জির মতো অন্যান্য প্রাইমেটকে ধারণ করে বেঁচে থাকত। প্রায় ১৩ মিলিয়ন বছর আগে নির্দিষ্ট প্রজাতি শুধু মানুষের ওপর নির্ভর করার জন্য বিবর্তিত হতে শুরু করে। ৪২ থেকে ৭২ হাজার বছর আগে মানুষের শরীরের উকুন মাথা এবং অন্যত্র এ দুই উপপ্রজাতিতে বিভক্ত হয়। বলা হচ্ছে, আধুনিক মানুষ যখন প্রায় ১৭ লাখ বছর আগে পোশাক পরা শুরু করে, তখন উকুন দুটি ভাগে বিভক্ত হয়। একটি আশ্রয় নেয় মাথায় এবং অন্যটি শরীরের অন্য জায়গায়। তবে এ দুই উপপ্রজাতি অর্থাৎ মাথা এবং শরীরের উকুন একে অন্য থেকে স্বাধীন। তাদের মধ্যে মিশ্রণ ঘটবে না বা এ দুই উপপ্রজাতির সংমিশ্রণে কোনো বংশবৃদ্ধি ঘটবে না। মাথার উকুন সম্পূর্ণ পরজীবী পোকা, যা একচেটিয়াভাবে মাথায় বসবাস করে এবং বেঁচে থাকার জন্য মাথার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে। তাদের প্রধান খাদ্য আমাদের রক্ত এবং ডিম পাড়া ও বংশ বৃদ্ধির জন্য মাথার ত্বকে জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করে। হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথের জনস্বাস্থ্য কীটবিজ্ঞানী রিচার্ড পোলাক বলেন, উকুন লাফ দিতে অক্ষম এবং উড়তে বা ডানা মেলতে পারে না। তারা সরাসরি এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আর তারা খুব ধীরে এই স্থানান্তর ঘটায় এবং খুব সীমিত আকারে। আবার এটি মাটি বা বায়ুর সাহায্যেও এক ব্যক্তি থেকে আকে ব্যক্তিতে বাহিত হতে পারে যদি সরাসরি মানব শরীরের সংস্পর্শ পায়।

গবেষক রিড বলছেন, হেয়ার ব্রাশ, টুপি, হেলমেট ও হেডফোন উকুন স্থানান্তরিত হতে পারে। তবে এটি তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব কিন্তু বাস্তবে বিরল। গবেষণায় দেখা গেছে, উকুন চিরুনির মতো নির্জীব বস্তুর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে এর সম্ভাবনা কম। যদি একটি হেয়ার ব্রাশ একজন ব্যবহার করার অল্প সময়ে আরেকজন তা দিয়ে চুল আঁচড়ায়, তাহলেও উকুন খুব কমই স্থানান্তরিত হয়। সিনেমা থিয়েটারের আসন, কার্পেট ও স্কুল ডেস্কের মতো আসবাবের ক্ষেত্রেও উকুনের বিস্তার কমই ঘটে। ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন বিছানা, খাট, চুলের ব্রাশ ও উকুনের সংস্পর্শে আসা পোশাক ধুলে ফেলতে পরামর্শ দিচ্ছে।

উকুন তাড়াতে পৃথিবীর অনেক সংস্কৃতিতে চিরুনি তৈরি করেছে। কাঠ, হাড় এবং হাতির দাঁতের চিরুনি বিশ্বের অনেক প্রাচীন স্থানে পাওয়া গেছে। কিন্তু উত্তর চিলিতে সাম্প্রতিক গবেষণা পর্যন্ত আমেরিকাতে এই ধরনের সরঞ্জামগুলোর জন্য শক্ত প্রমাণের অভাব ছিল। চিরুনি জটিল চুলের স্টাইল করতেও ব্যবহার হয়েছিল। এ ছাড়া প্রচুর সংখ্যক নারীর কবরে চিরুনি পাওয়া গেছে।

অদমনীয়

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ডটকমে উকুন সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গত সপ্তাহে। সেখানে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে তিলের বীজের আকারের এ রক্ত চোষা পোকা ৩ থেকে ১১ বছর বয়সের ৬ থেকে ১২ মিলিয়ন আমেরিকান শিশুকে আক্রান্ত করছে। উকুনের উপদ্রবে অস্বস্তি, চুলকানি ও সংক্রমণ চরম আকার ধারণ করতে পারে, যা ক্রমে নানা মানসিক অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতারও জন্ম দিতে পারে। তারপরও মানুষ মাথার উকুন নির্মূল করতে পারেনি। জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা থেকে শুরু করে জীববিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞরা উকুন নিয়ে অনেক ধরনের গবেষণা করেছেন। তারা বলছেন, এ প্রাণীকে নির্মূল করা অসম্ভব। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে ওই প্রতিবেদনটি লিখেছেন সাংবাদিক লিয়া ওরথিংটন। তার মতে, মানবজীবনের শুরু থেকেই উকুন আছে। আমাদের প্রাচীনতম পরিচিত পরজীবীগুলোর মধ্যে উকুন একটি, যা সহস্র বছর ধরে মানুষের সঙ্গে আছে। এমনকি তাদের আচরণও মিলে যায় মানুষের সঙ্গে। ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী প্রভোস্ট এবং স্তন্যপায়ী প্রাণী ও তাদের পরজীবীদের জেনেটিক্স বিশেষজ্ঞ ডেভিড রিড বলেছেন, উকুন লাখ লাখ বছর ধরে মানুষের সঙ্গে একই যাত্রায় রয়েছে। তিনি বলেছেন, তাদের আকৃতি মানুষের চুলের ব্যাসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, তাই তারা স্ট্র্যান্ডগুলো ধরতে এবং আরোহণের জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত। তারা আমাদের সঙ্গেই আবদ্ধ এবং তারা এমনভাবে বিকশিত হচ্ছে, যা তাদের মানুষের ওপর আরও প্রভাব ফেলতে পারে।

শিশুরা আক্রান্ত বেশি

গবেষকরা বলছেন, এ পোকা স্কুলবয়সী শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কারণ তারা একে অন্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে যোগাযোগ ঘটায়। ক্যালিফোর্নিয়া জনস্বাস্থ্য বিভাগের মতে, মাথার উকুন স্বাস্থ্যের জন্য হুমকির না হলেও যন্ত্রণা দেয় বেশি। তারা বলছে, মাথার উকুন সংক্রমণ ঘটায় না। তবে অত্যধিক ঘামাচির কারণে যদি মাথার তালুতে ব্যাকটেরিয়া জন্মায়, তখন এ পোকার মাধ্যমে সে রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। মাথার বাইরে শরীরের উকুন সাধারণত জনাকীর্ণ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং পরিচ্ছন্ন পোশাকের মাধ্যমে বিস্তার ঘটায়। এরা কিছু জ্বরসহ ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের সাধারণ বাহক।

মাথার রক্তখেকো এ পোকা নিবারণের কিছু পদক্ষেপ নিতে গিয়েও থমকে থাকতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। তারা ভেবেছিল যে, শিশুর মাথায় এ পোকা আছে, তাকে সম্পূর্ণ উকুনমুক্ত না করা পর্যন্ত স্কুলে আসতে না দেওয়া। তবে এ পরামর্শের বিপদ হলো, একটি শিশুকে স্কুল থেকে বাদ দেওয়ার পর তার মানসিক, সামাজিক ও একাডেমিক সুস্থতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে এবং শিশুটি কলঙ্কিত বলে চিহ্নিত হতে পারে। পোলাক বলেন, উকুন দূর করার নিশ্চিত উপায় হলো মাথা ন্যাড়া করা। চুল ছাড়া মাথার তালু বা ত্বকে তারা থাকতে পারে, এমন সুযোগ নেই। পোলাক বলেন, অধিকাংশ মানুষের মাথায় হয়তো কখনো উকুন বাসা বাঁধবে না। তবে যারা দুর্ভাগা তাদের জন্যও রয়েছে প্রচুর কার্যকর চিকিৎসা। প্রথম ধাপ হলো নিশ্চিত করা যে, হামাগুড়ি দেওয়া উকুন মাথায় আছে কি না। যদি থাকে, পোলাক বলেছেন, কন্ডিশনার দিয়ে চুল ভিজিয়ে উকুন এবং তার ডিম অপসারণের জন্য একটি চিরুনি দিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মাথা আঁচড়ানো। এ পদ্ধতিতে প্রথম ধাপেই প্রচুর পরজীবী অপসারণ হবে বলে মনে করেন। তবে তিনি কয়েক দিন পর পর মাথায় চিরুনি বুলানোর পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, দুই সপ্তাহ ধরে যদি না দেখেন, তাহলে নিশ্চিত হবেন যে, তারা চলে গেছে। যাদের চুল সহজে আঁচড়ানো যায় না তারা চিকিৎসক অনুমোদিত শ্যাম্পু ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়া উকুন নিবারক কীটনাশক মাথার ত্বকে সাময়িকভাবে দেওয়া হয়, যা সব ধরনের উকুনকে মেরে ফেলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদিও মেয়োনিজ এবং ভ্যাসলিন কিছু উকুনকে মেরে ফেলতে পারে, তবে তারা অনুমোদিত ওষুধের মতো প্রায় কার্যকর বা দীর্ঘস্থায়ী নয়। কেরোসিন বা পেট্রোল উকুন মারলেও তা দুর্যোগ ডেকে আনতে পারে চুলের। ভালো খবর হলো, অবিরামভাবে উকুন মাথায় উপদ্রব ঘটায় না।

উকুন নিয়ে ছড়া লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। তিনি লিখেছেন, ‘স্বপ্ন দেখেছেন রাত্রে হবুচন্দ্র ভূপ,/অর্থ তার ভাবি ভাবি গবুচন্দ্র চুপ।/শিয়রে বসিয়ে যেন তিনটে বাঁদরে/উকুন বাছিতেছিল পরম আদরে।/একটু নড়িতে গেলে গালে মারে চড়,...।’ যা থেকে বোঝা যায়, উকুন মানুষের সংস্কৃতিরও অংশ হয়ে আছে। বিশেষ বাংলার নারীরা দুপুরের বিশ্রামে গল্প করতে করতে একে অন্যের উকুন বেছে দিতেন; যা একটি ঐতিহ্য হয়ে আছে। এ ধরনের দৃশ্যের ছবিও আঁকা হয়েছে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত