পুরনো কার্টন ছিঁড়ে মাটিতে বিছানো। তার ওপর চার হাত-পা চারদিকে ছড়ানো ও অচেতন বিবস্ত্র দেহ, এলোমেলো চুল। শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গ থেকে রক্ত ঝরে ভিজে গেছে বিছিয়ে রাখা কার্টনের বিভিন্ন অংশ। গতকাল রবিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদের মূল ফটকের বিপরীত পাশে ছবির হাট গেটের ভেতর থেকে ষাটোর্ধ্ব বয়সী এক নারীকে এমন অবস্থায় উদ্ধার করেন ওই এলাকার ফুটপাতের ভাসমান কয়েকজন ব্যবসায়ী। এরও দীর্ঘ সময় পর দুপুর নাগাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মীদের সহযোগিতায় ওই নারীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করে শাহবাগ থানা পুলিশ। কয়েকজন মধ্যবয়সী ব্যক্তি তাকে দল বেঁধে শনিবার রাতভর ধর্ষণ করেছে বলে চেতনা ফেরার পর অভিযোগ করেছেন ওই নারী।
ওই নারীকে বিবস্ত্র অবস্থায় অচেতন পড়ে থাকতে দেখে প্রথমে উদ্ধারের উদ্যোগ নেন ঢাবি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকার চা বিক্রেতা সোলাইমান মিয়া। তিনি বলেন, ‘বিবস্ত্র আর অজ্ঞান অবস্থায় তারে আমি দেহি প্রথমে। দেইহাই বোঝা গেছে তার লগে কী হইছে। আমি দিশা না পাইয়া আমার বউরে (স্ত্রী) ডাইকা নিয়া আইছি। তারপর আমার বউ আর একজন মহিলা দোকানদার মিলা তার দুই পায়ে লাইগা থাকা রক্তসহ আর যা কিছু আছে হেইগুলা পরিষ্কার কইরা দেয়। আমার বউ একটা শাড়ি আইনা তার শরীরে জড়ায়া দেয়। বুঝতাছিলাম না কী করমু, না করমু।’
একপর্যায়ে চেতনা ফেরে ভুক্তভোগী ওই নারীর। তার সঙ্গে কথা বলেন প্রাথমিক শুশ্রুষা করা সেই চা বিক্রেতার স্ত্রী। ভুক্তভোগী নারীর বরাত দিয়ে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারে চাইর থাইকা পাঁচজন মানুষ সারা রাইত ধর্ষণ করছে। হের কথা হুইনা মনে হইছে, দোয়েল চত্বর, স্বাধীনতা টাওয়ার আর ছবির হাটে তারে নিয়া ঘুইরা ঘুইরা ধর্ষণ করছে অমানুষগুলা। যারা ধর্ষণ করছে সবাই মাঝবয়সী। সামনে আনলে প্রত্যেকজনরে হেই চিনবো, এইডা কইছে।’
ভুক্তভোগী ওই নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তার বাড়ি ফতুল্লায়। পরিচিত এক নারীর সঙ্গে গত শুক্রবার তিনি ঢাকায় আসেন। সেই নারী তাকে রেখে কোথাও চলে যায়। এমন পরিস্থিতিতে অচেনা এলাকায় দিশেহারা হয়ে পড়েন ভুক্তভোগী ওই নারী। শনিবার সন্ধ্যার পর মধ্যবয়সী কয়েকজন লোকের খপ্পরে পড়েন তিনি। তারপর কয়েকটি জায়গায় নিয়ে কয়েক দফা তাকে ধর্ষণ করে ওই ব্যক্তিরা।
ওই নারীকে হাসপাতালে ভর্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢামেক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক। তিনি বলেন, ‘ধর্ষণের শিকার এক বৃদ্ধা নারীকে আজ (গতকাল) দুপুরের একটু আগে শাহবাগ থানার পুলিশ নিয়ে এসে ভর্তি করিয়েছে। এর বেশি কিছু জানি না।’
বিরুদ্ধ পরিস্থিতি, আড়ষ্ট মানুষ : চা বিক্রেতা সোলাইমান মিয়া ওই নারীকে প্রথমে উদ্ধারের পর তাকে হাসপাতালে ভর্তির জন্য সাহায্য করার মতো তেমন কেউ এগিয়ে আসছিলেন না। তাই উপায় না পেয়ে সোলাইমান দ্বারস্থ হন বাঁধন নামে একজন সমাজকর্মীর কাছে। তিনিও ঘটনার আকস্মিকতায় ঘাবড়ে যান, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। একটি কাগজে লেখেন, ‘ওনাকে সাহায্য করুন।’ তার নিচে ভুক্তভোগীর নাম ও বয়স দেওয়া। এর নিচে আবার লেখেন, ‘দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার, গতরাতে সাহায্য করুন।’ পড়ে থাকা ওই নারীর কাছে একটি স্ট্যান্ডে কাগজটি সাঁটিয়ে দেনে বাঁধন। তিনি বলেন, ‘এটি দেখে অনেকে এগিয়ে আসেন। তাকে টাকা দেন। আসলে তার তো টাকার দরকার ছিল না। তার দরকার ছিল সঠিক চিকিৎসার। সেটার জন্য কোনো মানুষ পাওয়া যাচ্ছিল না!’
ভুক্তভোগী ওই নারীকে হাসপাতালে নিয়ে যান শাহবাগ থানার এসআই জাহাঙ্গীর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ডাক্তারি রিপোর্ট ছাড়া এটিকে তো ধর্ষণ বলতে পারি না। এখন তিনি গাইনি বিভাগে চিকিৎসাধীন আছেন। আগামীকাল (আজ) তার শারীরিক পরীক্ষা করানো হবে। রিপোর্ট হাতে পেলে আর ভুক্তভোগী একটু সুস্থ হলে তার বয়ানেই আমরা অভিযোগ নেব। সেই অনুযায়ী আমরা মামলা করব। তার কোনো আত্মীয়স্বজনের খোঁজ পাওয়া যায়নি।’
