ইইই নামে মশাবাহিত বিরল এক রোগ ছড়িয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে। কেউ কেউ দায়ী করছেন বিল গেটসকে। আসলে কি তাই? লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
চলতি বছর আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ বিরল রোগ ইস্টার্ন ইকুইন এনসেফালোমাইলাইটিস (ইইই) সংক্রমিত এক ব্যক্তির সন্ধান পান। আনুষ্ঠানিকভাবে তারা এ রোগে প্রথম কোনো ঘটনার ঘোষণা দেন। আগস্টের শেষে প্রতিবেশী রাজ্য নিউ হ্যাম্পশায়ার এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রথম মৃত্যুর খবর দেয়। ইইই একটি নির্দিষ্ট ধরনের মশা দ্বারা সংক্রমিত রোগ। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও রোগপ্রতিরোধ কেন্দ্রের মতে ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগটি মারাত্মক রূপ নেয়। এ রোগ থেকে বেঁচে গেলেও জীবিতদের স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেয়। বর্তমানে এর কোনো ভ্যাকসিন বা ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি রাজ্য মশাবাহিত এ রোগের সংক্রমণ ঝুঁকি কমাতে, অস্থায়ী এবং স্থানীয় লকডাউনের পাশাপাশি মশার সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক ব্যবহারের ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারী যুক্তরাষ্ট্রে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ায় বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনকে দায়ী করছে। এ ফাউন্ডেশন জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশা নিয়ে কাজ করা অক্সিটেককে অর্থায়ন করছে। সাবেক টুইটার আর বর্তমান এক্স-এ এক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, বিল গেটস এবং তার মশার খামারে কী চলছে? মানুষের মধ্যে ইইই ভাইরাস সংক্রমিত হচ্ছে, বিশেষ করে নিউ ইংল্যান্ড এলাকায়! আমি বলতে চাচ্ছি যে, মেডালিন কলম্বিয়াতে বিল গেটসের একটি...মশার খামার আছে, তারা কি বের হয়ে আসছে? এ ছাড়া ফেসবুকে কেউ লিখেছেন, ইইই মশা দ্বারা ছড়ায়। বিল গেটস জিএমও (জেনেটিক্যালি মডিফায়েড) মশায় বিনিয়োগ করেছেন। আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হঠাৎ করে ইইই মহামারী দেখা দেওয়ার কারণ কী? তাই প্রশ্ন উঠেছে, এ রোগ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে কি বিলিয়নিয়ার বিল গেটসের কোনো সম্পর্ক আছে?
জিএমও মশা
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে এ বিষয়ে একটি ফ্যাক্ট চেক চালিয়েছে। তারা বলছে, মশা বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক পোকা একটি। যাদের মধ্যে নারী মশা মানুষকে কামড়ায় এবং এর মাধ্যমে ভাইরাস ও পরজীবীসহ বিভিন্ন প্যাথোজেন মানব শরীরে প্রেরণ করতে পারে। প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী সাত লাখেরও বেশি মানুষ মশাবাহিত রোগে মারা যায়। এ জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন অন্যদের মধ্যে অক্সিটেক কোম্পানিকে সহায়তা করছে, যা জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আসছে। ২০২০ সালে এ বায়োটেক কোম্পানি আনুষ্ঠানিকভাবে গবেষণাগারে প্রজনন করা মশা উন্মুক্ত এলাকায় ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি পায়। যদিও তাদের শুধু ফ্লোরিডায় সীমাবদ্ধ থাকতে বলা হয়েছিল। আর তাদের উদ্দেশ্য ছিল মশার সংখ্যা কমানো। জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটি আমেশ অ্যাডালজা বলেন, পুরুষ মশাকে জেনেটিক্যালি পরিবর্তন করা হয় যাতে তারা বন্ধ্যা হয়। এরপর কোনো নারী মশা যখন ওই পুরুষ মশার সঙ্গে সঙ্গম করবে, তখন তাদের মাধ্যমে মশার কোনো বংশবৃদ্ধি ঘটবে না। এভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মশার সংখ্যা হ্রাস পাবে। ব্রাজিলে এটি সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এ ধরনের গবেষণা অন্য জীব বা পোকার ওপর করা হয়েছে। যেমন কৃষিতে ক্ষতিকর পোকাকেও বন্ধ্যা করা হয়েছে।
পুরুষ মশা
গবেষকরা বলছেন, শুধু স্ত্রী মশা ইইই সংক্রমণ করে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান অক্সিটেক ডয়চে ভেলেকে বলেছে, ম্যাসাচুসেটসে কোনো জিনগতভাবে পরিবর্তিত মশা ছাড়া হয়নি। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ফ্লোরিডায় শেষ মশা ছাড়া হয়েছিল। যার অর্থ স্থান এবং সময় বিবেচনায় নিলে জিনগতভাবে পরিবর্তিত মশার ইইই প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। আবার যেহেতু গবেষণাগারে শুধু পুরুষ মশা নিয়ে কাজ হয়েছে এবং এরা কামড়ায় না, তাই গবেষণার মাধ্যমে ইইই সংক্রমণের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কানেকটিকাটের ভেক্টর বায়োলজি এবং জেনেটিক ডিজিজেস সেন্টারের বৈজ্ঞানিক পরিচালক ডা. ফিলিপ এম. আর্মস্ট্রং বলছেন, জিনগতভাবে পরিবর্তিত মশা ব্যবহারের অনেক আগেও ভাইরাসটির অস্তিত্ব ছিল। আমরা এটি সম্পর্কে ৯০ বছর ধরে জানি। তাই এটি একটি নতুন ভাইরাস নয়। যদিও এটি মশাবাহিত ভাইরাস। এটি আমাদের অঞ্চলে আগেও ছিল এবং মাঝে মাঝে যখন উপযুক্ত পরিবেশ পায় তখন পর্যায়ক্রমিকভাবে এর প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। তিনি বলেন, এ ভাইরাসবাহী মশা আর্দ্র, উষ্ণ গ্রীষ্ম পরিবেশে প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ পায়। বিশেষ করে যে মশাটি ট্রিপল-ই ভাইরাস বহন করে, সেটি আমাদের অঞ্চলের মিঠাপানির জলাভূমিতে বাস করে।
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব
বিল গেটসকে নিয়ে প্রায়ই বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা সন্দেহ করেন যে, ব্রাজিলে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব এবং ২০২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ম্যালেরিয়ার পেছনে জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত মশা দায়ী ছিল। কভিড-১৯ মহামারী চলাকালে মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনের সঙ্গে মাইক্রোচিপ বসানোর অভিযোগ আনা হয়েছিল। এ ছাড়া ভারতে এ গুজবও ছড়িয়ে পড়ে যে, বিল গেটস শিশুদের ওপর অবৈধভাবে পোলিও টিকা পরীক্ষার দায়ে বিচারের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
গেটস বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি। তার প্রাক্তন স্ত্রী মেলিন্ডা গেটসের সঙ্গে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ব্যক্তিগত ফাউন্ডেশন। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে, এটি টিকাদান কর্মসূচি এবং ভ্যাকসিন গবেষণাসহ স্বাস্থ্যসেবা খাতে হাজার হাজার প্রকল্প এবং বিশ্বব্যাপী কয়েক বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করেছে। গ্লোবাল হেলথ কেয়ারের ওপর গেটসের যে প্রভাব তা অনেকের সন্দেহ উদ্রেক করে। তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।
ইইই
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, ইকুইন এনকেফালাইটিস ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণ হারিয়েছেন ৪১ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি। এর পাশাপাশি একাধিক মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাই এ সংক্রমণ নিয়ে ভীষণ চিন্তিত চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। তারা এই সংক্রমণ ঠেকাতে উঠেপড়ে লেগেছেন। চিকিৎসকদের কথায়, ইইই অত্যন্ত বিরল ভাইরাস। ১৯৩৮ সালে ঘোড়ার শরীরে প্রথম এ ভাইরাসের খোঁজ মেলে। এরপর ধীরে ধীরে এর হদিস পাওয়া যায় মানুষের শরীরেও। আর এই ভাইরাস কিন্তু ভীষণ ভয়ংকর। এখনো পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০০-এর বেশি কিছু মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৬৪ জন। তাই চিকিৎসকরা এই ভাইরাস নিয়ে ভীষণ সতর্ক হতে বলছেন। ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়ার মতো এই রোগটিও মশার মাধ্যমে ছড়ায়। জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে এ ভাইরাস ছিল পাখির শরীরে। সেই পাখিকে কামড়ায় জিনাস কুলিসেটা নামক এক ধরনের মশা। তারপর সেই মশার শরীরে পৌঁছে যায় এ ভাইরাস। এবার এই সংক্রমিত মশা মানুষকে কামড়ালে তার শরীরে প্রবেশ করে এই ভাইরাস। তারপর তা মানব শরীরে ধীরে ধীরে বংশবিস্তার করে। দেহে ফুটে ওঠে একাধিক লক্ষণ। মশা কামড়ানোর মোটামুটি ৪ থেকে ১০ দিন পর শরীরে এ রোগের লক্ষণ ফুটে ওঠে। প্রাথমিকভাবে সাধারণ ভাইরাল ফিভারের মতো জ্বর, মাথাব্যথা, কাঁপুনি, পেশিতে ব্যথা এবং ক্লান্তির মতো লক্ষণ দেখা দেয়। পরিস্থিতি খারাপ দিকে মোড় নিলে ধীরে ধীরে বিভ্রান্তি, খিঁচুনির মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এর পাশাপাশি খাবার গিলতে এবং কথা বলতে সমস্যা হতে পারে। এমন অবস্থায় রোগীকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করানো প্রয়োজন। এ রোগের সেই অর্থে তেমন কোনো চিকিৎসা নেই। এমনকি নেই কোনো টিকা। এমন পরিস্থিতিতে রোগীর লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা চলে। অর্থাৎ জ্বর এলে জ্বরের ওষুধ, খিঁচুনি হলে তা কমানোর ওষুধ দেওয়া হয়। এর মাধ্যমেই বেশিরভাগ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে।
বিল গেটসের বিরুদ্ধে এর আগে ইবোলা সংক্রমণ ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। যদিও এর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ব্রাজিলে ইবোলার আক্রমণ ভয়াবহ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। বিল গেটসের ফাউন্ডেশন তার আগে ব্রাজিলে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশা উন্মুক্ত করে। তখন অনেকে এ অভিযোগ তোলেন যে, বিল গেটসের মশার সঙ্গে প্রকৃতিতে থাকা মশার মিলনের ফলে ইবোলা সংক্রামক মশা ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও এসব বিষয়ে বৈজ্ঞানিক কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তারপরও বিল গেটসের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস রয়ে গেছে। যার ধারাবাহিকতা দেখা যায়, কভিড-১৯ মহামারীর সময়। তখন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে টিকার মাধ্যমে শরীরে বিশেষ ধরনের চিপ প্রবেশ করানো হবে, যাতে টিকা নেওয়া ব্যক্তিকে নজরদারিতে রাখা যায়। তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যায়। তবে এ অভিযোগও ধোপে টেকেনি। কিন্তু অভিযোগটি অনেক জনপ্রিয়তা পায়। টিকা নিতে অনেকে অস্বীকার করেন। অবশ্য করোনা মহামারী চলার সময় জনসাধারণের ওপর রাষ্ট্রীয় বা করপোরেট সংস্থার খবরদারিও চোখে পড়েছিল তখন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ জরুরি। বিল গেটসের মশা ইইই সংক্রমণের জন্য দায়ী কি না তার তথ্য-প্রমাণের জন্য বৈজ্ঞানিক আরেকটি গবেষণা প্রয়োজন। যা হবে ব্যয়বহুল। এত ব্যয় বহন করা সম্ভব হবে না সবার জন্য। ফলে বিল গেটস অধরাই থেকে যাবেন। এসব বিবেচনায় প্রাথমিক কাজ হবে ইইই আক্রান্ত ব্যক্তিকে পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া। মশার প্রজনন কমানো এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিরাপদে ও আলাদা রাখা। তাকে কামড়ানোর মাধ্যমে মশা এ রোগ ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ছড়িয়ে দিতে পারে।
