মেলে না ভিসা-পাসপোর্ট বিপাকে গমনেচ্ছুরা

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৭:০৫ এএম

সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরের সাইদুল ইসলাম (৩৫) চার বছর মালয়েশিয়ায় কাজ করার পর ছুটিতে দেশে ফেরেন। তিনি এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ইতালির একটি কোম্পানিতে কৃষিকাজের জন্য আবেদন করেন। ইতালির ওই কোম্পানি তাকে কাজের অনুমোদন দেওয়ার পর গত বছর ২৭ আগস্ট বাংলাদেশের ইতালি দূতাবাসে ভিসার আবেদন করেন। এখনো তিনি ভিসা পাননি।

সাইদুল আটকে থাকা ভিসা-পাসপোর্ট ফিরে পেতে গতকাল সোমবার রাজধানীর গুলশানে ইতালির দূতাবাসের সামনে গণঅবস্থানে অংশ নেন। সে সময় তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ভিসা-পাসপোর্ট দূতাবাসে আটকে আছে। কিছুদিন পরপর এসবের খোঁজ নিতে ঢাকায় আসতে হয় এবং হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে দাবি, তিনি যেন আমাদের এ সমস্যার দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেন।’

তার মতো কয়েক হাজার ইতালি গমনেচ্ছুর একই অবস্থা। অনেকের এক বছর থেকে দেড় বছর ধরে ইতালি দূতাবাসে ভিসা ও পাসপোর্ট আটকে আছে। বিপাকে পড়েছেন তারা। অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।

ভিসা পেতে অনেক সময় লাগায় ইতালির শ্রমবাজারে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।

কর্মী সংকট কাটাতে দুই বছর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলো থেকে প্রায় ছয় লাখ কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দেয় ইতালি। পর্যায়ক্রমে কর্মী নিতে আবেদন করেন ওই দেশটির বিভিন্ন খাতের মালিকরা। স্থানীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে বিদেশি কর্মীর জন্য ‘নুল্লা ওস্তা’ (ওয়ার্ক পারমিট) ইস্যু করা হলেও দীর্ঘ সময় ধরে কর্মীদের পাসপোর্ট আটকে রাখছে বাংলাদেশে ইতালির দূতাবাস। ফলে হতাশায় ভুগছে ইতালিয়ান মালিক ও বাংলাদেশি কর্মী উভয়ই।

গত বছর ৩০ অক্টোবর কৃষি ভিসার আবেদন করেছিলেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের সুলতান আহমেদ। তাকে ৯০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছিল। প্রায় এক বছর হতে চলল, এখনো তাকে আপডেট জানানো হয়নি।

ভিসা ও পাসপোর্ট দূতাবাসে আটকে থাকার প্রতিবাদে গতকাল রাজধানীর গুলশানে গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে হাজারো ভুক্তভোগী। তারা দূতাবাসের সামনে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে। আবেদনকারীদের অভিযোগ, ভিসা আবেদনের জন্য ৯০ দিন সময় দিয়েছিল দূতাবাস। কিন্তু দুই থেকে আড়াই বছর পরও পাসপোর্ট ফেরত দেয়নি। পাসপোর্ট হাতে না থাকায় বিকল্প দেশেও তারা যেতে পারছে না। তারা ‘ভিসাসহ পাসপোর্ট ফেরত চাই’, ‘অপেক্ষার আর সময় নাই’ বলে স্লোগানও দেয়। পরে ঘটনাস্থলে সেনাসদস্যরা গিয়ে তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন।

পরে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে। আলোচনা শেষে ইতালি গমনেচ্ছুদের সমন্বয়ক নুসরাত জাহান বলেন, ‘জানুয়ারির মধ্যে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে দূতাবাস। দূতাবাসের ওয়েবসাইটে দ্রুত এ বিষয়ে জানানো হবে। তবে এক সপ্তাহের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আমরা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।’

ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো গত ৯ জুন গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘পাঁচ কারণে ভিসা দিতে দেরি হচ্ছে। এসবের মধ্যে রয়েছে জমা দেওয়া পাঁচটি নুল ওস্তার একটি সঠিক নয়। এসবের যাচাই-বাছাইয়ে সময় লাগছে। গত বছর জুলাইয়ের পর আবেদনের সংখ্যা এতটাই বাড়ে যে, আমাদের লোকবল এটি সামাল দিতে পারছে না।’

দূতাবাস জানায়, ভিসা ইস্যু করা রাষ্ট্রের একচেটিয়া ক্ষমতার আওতায় পড়ে। অতএব বাংলাদেশি নাগরিকদের ইতালীয় কাজের ভিসা দেওয়া না দেওয়া সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত, সেই সঙ্গে তাদের সময়, পদ্ধতি, নিয়ন্ত্রণ ও সময়সীমা ইতালীয় আইন দ্বারা একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। দূতাবাসের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও আপিল ইতালির আইন ও প্রবিধান অনুসারে ইতালিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা যেতে পারে বলে জানায় দূতাবাস।

এ বিষয়ে ইতালির নাপোলিবাসী মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ইমাম হোসাইন রতন বলেন, ‘ইতালির ইমিগ্রেশন আইন অনুসারে দীর্ঘ সময় পাসপোর্ট আটকে রাখার নিয়ম নেই। ভিসা পেতে ইচ্ছুকদের পাসপোর্ট আটকে রেখে দূতাবাস তার নিজ দেশের নিয়ম অমান্য করছে। এর বিরুদ্ধে অবশ্যই বাংলাদেশ সরকারের জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

তিনি বলেন, ‘ওয়ার্ক ভিসার আবেদনকারীদের পাসপোর্ট জমা নেওয়ার পর ডকুমেন্টস ঠিক থাকলে তিন মাসের মধ্যে ভিসা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। ব্যবসায়ীদের ১২০ দিন ও পারিবারিক ভিসা ৩০ দিনের মধ্যে দিতে হয়। এভাবে পাসপোর্ট আটকে রাখলে ইতালির মালিকরা বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। ইতালির শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও আছে।’

বাংলাদেশ প্রবাসী উন্নয়ন সমিতি এক বিবৃতিতে বলেছে, ইতালি যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের এ বিষয়টির সমাধানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের উদ্যোগী হওয়া উচিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত