হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মেয়াদপূর্তির পরও গ্রাহকরা তাদের দাবিকৃত টাকা পাচ্ছেন না। মেয়াদ শেষে দাবি নিষ্পত্তি না হওয়ায় ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত ১ বছরে ৬ হাজার ৮২০ জন গ্রাহক বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষে (আইডিআরএ) অভিযোগ করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩৭ হাজার গ্রাহক তাদের বীমার অর্থ ফেরত পাবেন কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ১০৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আইডিআরএর হিসাব অনুযায়ী হোমল্যান্ড লাইফের ১৯৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ব্যবসার পরিধি বাড়ানো, জমি কেনা, জমি কেনার কমিশন, জমিতে মাটি ভরাট, সার্ভিস সেন্টার চালু ও শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগের নামে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ অভিযোগের অনুসন্ধান করছে। দুদক ও হোমল্যান্ড থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, ক্ষমতা অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে হোমল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির চেয়ারম্যান ও কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জমি কেনা, মাটি ভরাট, সার্ভিস সেন্টার (এজেন্ট অফিস) চালু করা, পারিবারিক বীমা ও শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগসহ ১৩টি খাতে ব্যয়ের নামে ১০০ কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগ জমা পড়ে।
দুদক অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সংস্থাটির উপপরিচালক ইয়াসির আরাফাতকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে নথিপত্র চেয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়েছেন। চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট নথিপত্র দুদকে পাঠানো হয়।
অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক ইয়াসির আরাফাত এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বিষয়টি নিয়ে দুদক সচিব ও জনসংযোগ শাখার উপপরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটির ৪৪টি শাখা অফিস স্থাপনকালে প্রায় ৪০ লাখ টাকা করে অগ্রিম পাঠানো হয়েছে। প্রিমিয়াম কালেকশনের পর এসব টাকা ফেরত দেওয়ার কথা। এ ছাড়া অফিসের স্টাফ খরচ, ইউলিটি বিল বাবদ অনেক টাকা খরচ দেখানো হয়। সব মিলিয়ে ৪৪টি এজেন্ট অফিসের বিপরীতে ৬২ কোটি ক্ষতি দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে, এসব অফিসে কোনো ব্যবসা হয়নি। বাস্তবে এটি হয়েছে কি না, স্টাফ ও ইউলিটি খাতে ব্যয় হয়ে থাকলে তার ভাউচার থাকার কথা। এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আরও কিছু বেকর্ডপত্র চাওয়া হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অনুসন্ধানকাজ শেষপর্যায়ে রয়েছে।
দুদকের হাতে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, হোমল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সের ১০৪ কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য রয়েছে। ৪৪টি এজেন্ট সেন্টারের নামে খরচ দেখিয়ে ৬২ কোটি, টুকের বাজারে নামসর্বস্ব জমি কেনার নামে ১ কোটি ৫১ লাখ ৫০ হাজার, মাটি ভরাটের নামে ৩০ লাখ ৭০ হাজার ৪৬০, জল্লার পাড়ে জমি কেনার নামে ৪ কোটি ৮০ লাখ ও ২ কোটি ৭৫ লাখ, জমি কেনার কমিশন ১ কোটি ৪৫ লাখ, পল্লী পারিবারিক বীমার সারেন্ডার ভ্যালু আমলে না নিয়ে ৫০ লাখ ৯৮ হাজার, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের নামে ৫ কোটি ১১ লাখ, ব্যবসা বাড়ানোর নামে ৩০ লাখ ও অন্যান্যভাবে ৪ কোটি ৭৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সিলেটের জল্লার পাড়ে জমি কেনার নামে ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান কাজী এনাম উদ্দিন আহমেদের ছেলে আরাফাত কাজীকে দেওয়া হয়েছে। জল্লার পাড়ে ৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার জমি কেনা হয়েছে। এসব জমি কিনতে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা কমিশন খরচের কথা বলা হয়েছে।
জানা গেছে, জমি কেনা ও কমিশন দেওয়ার নথিপত্রসহ চেয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে হোমল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সেকে চিঠি দেয় দুদক। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগ-সংক্রান্ত নথিপত্র দুদকে পাঠানো হয়। নথিপত্র যাচাই শেষে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হোমল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে ২০২৩ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালক ও অন্যান্য পদে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের নাম, ঠিকানা ও অবস্থান জানাতে চিঠি দেওয়া হয়। এরপর হোমল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থেকে গত ২৮ এপ্রিল একটি চিঠি পাঠানো হয় দুদকে। কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে দাশ স্বাক্ষরিত চিঠিতে ৬০ জনের নাম, ঠিকানা ও অবস্থান উল্লেখ করা হয়। দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৯ জন মারা গেছেন। ১০ জন দেশের বাইরে আছেন। ৩ জনের ঠিকানা কোম্পানিতে নেই বলে জানানো হয়।
দুদক যাদের তলব করে তারা হলেন সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, সাবেক চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন, সাবেক পরিচালক নাফিসা সালমা (বিদেশ), সাবেক পরিচালক মো. মহিউদ্দিন (বিদেশ), পরিচালক আবদুর রব, আবদুর রাজ্জাক, কামাল মিয়া, জামাল মিয়া, আবদুল হাই, আবদুল আহাদ, সাবেক পরিচালক মফিজ উদ্দিন (বিদেশ), সাবেক পরিচালক মাজহারুল কাদের, কাউছার জামান, রিজিয়া সুলতানা, হোসনে আর গণি, পলিসি হোল্ডার পরিচালক আবু তাহের খান (বিদেশ), এ কে এম জাকির হোসেন (বিদেশ), দেলোয়ার হোসেন (বিদেশ), এনামুল হাসান (বিদেশ), মহিমা বেগম (বিদেশ), সামছুন নাহার (বিদেশ); বিকল্প পরিচালক আবুল ফয়েজ, এ এইচ এম মহসিন (বিদেশ); পরিচালক ফয়জুল হক, জুলহাস, সালেহ হোসেন, সাবেক চেয়ারম্যান কাজী এনাম উদ্দিনের ছেলে কাজী আরাফাত, পরিচালক আম্বিয়া খাতুন, শামীম আহমেদ, শেয়ারহোল্ডার মোসলেহ উদ্দিন ঢালী, সাবেক সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকির হোসেন, মোহাম্মদ আলী, সাবেক আইন কর্মকর্তা জহির উদ্দিন, অডিটর আমিনুল হক, সাবেক মহাব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম, সাবেক সহকারী মহাব্যবস্থাপক তওয়াবুর রহিম, সিইভিপি কাজী রেজাউল হক, সিইভিপি মো. আবদুল জলিল ও সিইভিপি নকুল চন্দ্র মজুমদার।
৪০ হাজার টাকা নেন পরিচালকরা : বীমা কোম্পানির পরিচালকদের বোর্ড সভায় উপস্থিত থাকার জন্য বোর্ড মিটিং ফি আট হাজার টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। ওই নির্দেশ অমান্য করে হোমল্যান্ড লাইফের পরিচালকরা প্রতিটি মিটিংয়ে ৪০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন। ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বোর্ড মিটিং ফি বাবদ ৩ কোটি ১০ লাখ টাকার বেশি নিয়েছেন তারা। তবে ২০২৩ থেকে ৮ হাজার টাকাই বোর্ড মিটিং ফি দেওয়া হচ্ছে।
অনিশ্চয়তায় ৩৭ হাজার গ্রাহকের বীমার টাকা : হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ৩৭ হাজারেরও বেশি গ্রাহক তাদের বীমার অর্থ ফেরত পাবেন কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। কারণ তাদের টাকার দাবির নিষ্পত্তি হয়নি।
বীমা প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২০২ কোটি টাকার তহবিল আছে। ১১২ কোটি ২৩ লাখ টাকা স্থাবর ও অস্থাবর খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ৮১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বিনিয়োগের পাশাপাশি কুমিল্লায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা খরচে অফিস স্পেস কেনা হয়েছে। আর সিলেটের জল্লার পাড় এলাকায় জমি কেনা হয়েছে।
