চেবল, অলিগার্ক ও উন্নয়ন

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০১:৩৪ এএম

পত্রিকায় দেখলাম কোরিয়ার খাদ্য ও পল্লী বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরিচালক সাং মুন বাইয়ান বলেছেন যে, কৃষি খাতে যন্ত্রের ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোরিয়ার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। আসলে শুধু কৃষি খাত নয়, কোরিয়া থেকে শিল্পায়নসহ আরও অনেক সেক্টরে এ দেশের অনেক কিছুই শেখার আছে। চেবলদের ((chaebol) কাহিনি দিয়ে সেটা শুরু করা যায়। সে জন্য একটু ঐতিহাসিক পটভূমি জানা দরকার। ১৯১০ সালে কোরিয়া জাপানি সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়। এ সময় কোরিয়ায় জাপানি বিনিয়োগে শিল্পায়ন শুরু হলেও সাম্রাজ্যবাদী শোষণব্যবস্থা অব্যাহত থাকে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোরিয়া যখন প্রথম স্বাধীনতা লাভ করে তখন কোরিয়া ছিল একটি অতি দরিদ্র দেশ। এরপর ঠাণ্ডা যুদ্ধের টানাপড়েনে ১৯৪৮ সালে কোরিয়া ভাগ হয়; জন্ম হয় দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়া নামের দুটি দেশ। উত্তর কোরিয়া চলে যায় সমাজতান্ত্রিক ব্লকে। আর দক্ষিণ কোরিয়া হয়ে পড়ে ধনতান্ত্রিক বিশ্বের মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রে। এই সময় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে আবির্ভূত হন সিংম্যান রি। আঙ্কেল শ্যামের প্রিয়পাত্র এই রি ১৯৬০ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়া শাসন করেন। তার শাসনামলে মার্কিন মুল্লুক থেকে যেমন ব্যাপক সাহায্য-সহযোগিতা এসেছে, তেমনি দেশে চলেছে অবাধ লুটপাট ও দুর্নীতি। চরম জন-অসন্তোষ সত্ত্বেও নানা কারসাজি, নিপীড়ন ও জেল-জুলুমের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকেন।

১৯৬০ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা ব্যাপক কারচুপির আশ্রয় নেন। এতে ছাত্র- জনতা ক্ষোভে রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভ দমনে পুলিশের গুলিতে মারা যায় শতাধিক মানুষ। ছাত্র-জনতা পরিচালিত এই এপ্রিল বিপ্লবে রি পদত্যাগ করে অস্ট্রেলিয়ায় পলায়ন করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জুলাই নির্বাচনে আগের বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি ক্ষমতায় আসে। সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতির শাসনের পরিবর্তে সংসদীয়ব্যবস্থা চালু করা হয়। এ সময় স্বাধীনতা পেয়ে বামপন্থি রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, সংবাদপত্র ইউনিয়ন, ট্রেড ইউনিয়ন, শিক্ষক সংগঠন প্রভৃতি প্রশাসন পরিশুদ্ধকরণসহ নিজেদের নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন শুরু করে দেয়; ৮ মাসে প্রায় ২,০০০টা বিক্ষোভ মিছিল ও সভা হয়; এ সময় প্রায় ২,০০০ বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের চাপে সরকার দুর্নীতি ও গণতন্ত্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে ৪০ হাজার মানুষের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে, যার ফলে ২,২০০ জন সরকারি কর্মকর্তা এবং ৪,০০০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সরকার প্রচণ্ড চাপের মধ্যে পড়ে যায়; পটপরিবর্তনের পর সৃষ্ট উচ্চ জনপ্রত্যাশা পূরণে নতুন সরকার ব্যর্থ হয়। তার ওপর নিজেদের মধ্যে কলহ, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বিভাজনে দেশে এক ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।  

দেশের এই পটভূমিতে সেনাবাহিনী মেজর জেনারেল পার্ক চুং হি-এর নেতৃত্বে ১৯৬১ সালের মে মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এ সময় কোরিয়ার মাথাপিছু জিডিপি ছিল মাত্র ৭২ মার্কিন ডলার। তার ক্ষমতা গ্রহণের লক্ষ্য ছিল দুটি; দুর্নীতি নির্মূল এবং  দারিদ্র্যমুক্তি। পরিশুদ্ধ করার অংশ হিসেব তিনি প্রথমেই রি প্রশাসনের দুর্নীতি, স্বজন-তোষণ নীতি ও অপকর্মের সঙ্গে জড়িত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অপসারণ করেন। আর ‘অবৈধ মুনাফাখোর’ চেবলদের মধ্য থেকে বড় বড় ৫১ জনকে আটক করেন এবং তাদের সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করেন। আর দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা রচনা করেন।

জাপানি ঔপনিবেশিক শাসন ও স্বাধীনতা-উত্তর সিংম্যান রি-এর স্বজন-তোষণ শাসনামলে কোরিয়ায় চেবলগুলোর অভূতপূর্ব উত্থান ঘটে। এই চেবলগুলো আসলে জাপানি যাইবাতসুর কোরীয় সংস্করণ। জাপানে যাইবাতসু নামে পরিবারভিত্তিক পরিচালিত এসব বড় বড় ব্যবসায়ী ‘কংগ্লোমারেট’ নিজেদের স্বার্থে সরকারি নীতি প্রভাবিত করত; আর কোরিয়ায় চেবলগুলো সরকারি নীতি তো প্রভাবিত করতই, সেই সঙ্গে যুক্ত থাকত সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগকৃত অর্থ লুটপাটে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটায়। ফলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাধারণ মানুষের অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি না হলেও এই চেবলগুলোর ভুঁইফোড় উত্থান ঘটে। এই চেবলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম হলো হুন্দাই, এলজি, স্যামসাং প্রভৃতি ‘কংগ্লোমারেট’। দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের অর্ধেকেরও বেশি তারা নিয়ন্ত্রণ করত।

চেবল নেতাদের মাস দুয়েক বন্দি রাখার পর পার্কের ধারণা জন্মে যে, পরিকল্পনার উচ্চাকাক্সক্ষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য তাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। জেনারেল পার্ক শুরুতে জাপানি সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছিলেন। ফলে জাপানের উন্নতিতে সেখানকার যাইবাতসুগুলোর ভূমিকা তিনি কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। দুর্নীতির অভিযোগ সত্ত্বেও সে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সুমিতমো, মিতসুই, মিতসুবিশি, ইয়াসুদা প্রভৃতি যাইবাতসুদের ভূমিকার গুরুত্ব তিনি অনুধাবন করেছিলেন। তার এই বোধোদয় থেকেই বিরুদ্ধ জনমত ও কনিষ্ঠ সহকর্মীদের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি আটক চেবল নেতাদের একটা অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর নিয়ে কারামুক্ত করে দেন। অঙ্গীকারনামাটা ছিল এমন ‘I shall donate all my property when the government requires it for the nation construction. তাদের প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয় সত্য; কিন্তু বাস্তবে তখন তাদের স্বাধীনতা নির্ভর করছিল কেবলমাত্র সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা ও উচ্চমূল্য কার্যসম্পাদনের ওপর। 

এর পর থেকে দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বোর্ড (EPB) দেশের শিল্পায়নে পরিকল্পনা প্রণয়ন করত, আর এই চেবলগুলো সেটা বাস্তবায়ন করত। তখন প্রেসিডেন্ট পার্ক কঠোরভাবে অনুসরণ করতেন ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন’ নীতি। দক্ষিণ কোরিয়া তখন দরিদ্র দেশ হলেও এই চেবলগুলো ছিল দুর্নীতি ও নানা কারসাজির মাধ্যমে অর্জিত সীমাহীন অর্থবিত্তের আধার। সামস্যাং-এর মালিক লি বাইং চুল ছিলেন তখন সর্বাপেক্ষা ধনাঢ্য ব্যক্তি, যার নিয়ন্ত্রণে ছিল দেশের মোট সম্পদের ১৯ শতাংশ (page 9/40, The Miracle with a Dark Side)। তিনি তার এই বিশাল সম্পত্তি দেশের জন্য উৎসর্গ করার অঙ্গীকার করেন। অন্য সব চেবলও তাকে অনুসরণ করে। ফলে প্রথম পর্যায়ে সঞ্চয়ের অভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য অর্থায়নের যে সমস্যা ছিল, তা কেটে যায়; ৫৫.৬ শতাংশ অর্থায়ন সম্ভব হয় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে, মাত্র ৪৪.৪ শতাংশ অর্থায়ন হয় বিদেশি ঋণ ও অনুদানে। সরকারও সফল উদ্যোক্তাদের ভর্তুকি, প্রণোদনা, ব্যাংকঋণ, বৈদেশিক মুদ্রা, ট্রেড ইউনিয়ন ও ধর্মঘট নিষিদ্ধকরণ, সংরক্ষণ সুবিধাসহ নানা ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে সহায়তা করতে থাকে। আর ব্যর্থদের ত্বরিত গতিতে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করে অপব্যয় হ্রাসের পদক্ষেপ নেয়। এক্ষেত্রে সরকারের নীতি ছিল ‘Never fail to reward a merit, or let a fault go unpunished.’ এ সব বিনিয়োগবান্ধব ও অপচয়-নিরোধক ব্যবস্থার ফলে ১৯৬০ সালের শূন্য সঞ্চয় অবস্থা থেকে ১৯৭০ সালে তার ভাগ দাঁড়ায় জিডিপির ২০ শতাংশ। আর রপ্তানি ১৯৫০ সালে জিডিপির ৫ শতাংশ থেকে ১৯৮০ সালে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়।

অবশ্য এই উন্নতির পেছনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে পার্ক-সৃষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বোর্ড। তিনি এই বোর্ডের মানোন্নয়ন ঘটান এর প্রধানকে উপ প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে, তারপর সেখানে পদায়ন করেন পেশাদার বেসামরিক বিশেষজ্ঞদের। পার্ক নিজে সামরিক কর্মকর্তা হলেও এই বোর্ডে তাদের কারও স্থান হয়নি। পার্কের স্বপ্ন ছিল দেশকে দ্রুত ভারী ও রসায়ন শিল্পে সমৃদ্ধ করা। কিন্তু তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বোর্ড অর্থনৈতিক বিবেচনায় প্রথমে হালকা প্রকৌশল ও মাঝারি শিল্প বিকাশের উদ্যোগ নেয়। প্রথম ও দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর অর্থায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৭০ সালে গৃহীত তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পার্কের স্বপ্নের ভারী ও রসায়ন শিল্প অগ্রাধিকার লাভ করে। এভাবেই কোরিয়ার হান নদীর পাড়ে বিস্ময়ের অভ্যুদয় ঘটে। তবে এই প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের অধিকার হরণ এবং ধনী-দরিদ্রের মধ্যে সৃষ্ট বৈষম্য নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক সমালোচনা হয়।   

আগে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে উল্লেখযোগ্য কোনো স্থানীয় পুঁজি ছিল না; স্বাধীনতার প্রাক্কালে পাকিস্তানের ২২ পরিবারের মাত্র দুটা ছিল এখানে। তবে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে উন্নতি যা হয়েছে, তার চেয়ে শতগুণ বেশি বেড়েছে বৈষম্য এবং অতি দ্রুতগতিতে সৃষ্টি হয়েছে অলিগার্ক। স্বৈরাচারী শাসকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এদের অনেকেই দেশে ও বিদেশে রাজসিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে যে, তাদের এসব সম্পদের একটা বড় অংশ অর্জিত হয়েছে স্বৈরাচারের প্রত্যক্ষ ও প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় ভূমিদস্যুতা, রাজস্ব ফাঁকি, বাজার কারসাজি, পুঁজি বাজার লুণ্ঠন, ব্যাংক লুটপাট, পুঁজি পাচার, দুর্নীতি ও সরকারের স্বজন-তোষণ নীতির কল্যাণে। বিনিময়ে একপেশে জাতীয় নির্বাচনগুলোয় এ সব অলিগার্ক-প্রভাবিত ব্যবসায়ীদের অরাজনৈতিক শীর্ষ সংগঠন নির্লজ্জভাবে স্বৈরাচারের পক্ষাবলম্বন করেছে; সর্বশেষ সভায় এদের দলদাস-তুল্য বচন ও ভাঁড়-সদৃশ অঙ্গচালন ছিল সেই কৃতজ্ঞতারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। এজন্য এ সব বিবেকবর্জিত লুটেরাদের এখন বিচারের আওতায় আনা দরকার। তবে সেটা করতে গিয়ে সম্পদের অপচয় ও মানুষকে বেকার করার কোনো পদক্ষেপ নেওয়া ঠিক হবে না।

এটা ঠিক যে, বৃহৎ পুঁজি ও সম্পদ সৃজন কখনো নৈতিকতা ও বৈধতার ধার ধারে না। এজন্য অনেক মনীষী পুঞ্জীভূত সম্পদকে চৌর্যবৃত্তির ফসল বলে মনে করেন। যেমন নৈরাজ্যবাদের জনক ফরাসি দার্শনিক Pierre Joseph Proudhon বলেছেন যে, ‘Property is theft.’ তবে পুঁজির ধর্ম হলো বিনিয়োগের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন। কার্ল মার্ক্স যেমন বলেছেন, ‘Capital has two forms, money and means of production, but capital itself is in the process of self-expansion or valorization.’ অর্থাৎ পুঁজি নিজেই নিজের সম্প্রসারণ ঘটায়। আর এ প্রক্রিয়ায় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান হয়; আয় সংস্থান ও বণ্টনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। 

সমাজ ও অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব দুটোই মারাত্মক সমস্যা; সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ। দেশে এই দুই সমস্যা এখন তীব্র। সম্প্রতি যে গণ-অভ্যুত্থান ঘটে গেল, তার পেছনেও এ দুটি উৎপাদকের বিশেষ ভূমিকা ছিল। এজন্য দরকার টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ সৃজন, আগ্রহী অভিজ্ঞ ও নতুন উদ্যোক্তাদের লালন, প্রকল্পের সময় ও খরচ বাড়িয়ে অর্থ লোপাট কৌশলের মূলোৎপাটন, অর্থনৈতিকভাবে অনুপযুক্ত ও উদ্দেশ্যমূলক প্রকল্পের দ্রুত অবসায়ন, ব্যর্থ ও মতলববাজ কুশীলবদের দ্রুত শাস্তি বিধান।

প্রায় ৬০-৬৫ বছর আগের ঘটনা হলেও তৎকালীন দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এখনকার বাংলাদেশের অনেক ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত মিল লক্ষ করা যায়। ওই দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, অর্থনৈতিক সংকট, ভোট কারচুপি, দুর্নীতি, লুটপাট ও স্বজন-তোষণ নীতি, চেবলদের উত্থান, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শাসকের পতন ও দেশত্যাগ, অর্থনৈতিক উন্নয়নে পেশাদার বিশেষজ্ঞদের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠান প্রভৃতির চিত্র দেখে মনে হয় এই মুহূর্তের বাংলাদেশ যেন সে সময়ের দক্ষিণ কোরিয়ার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বাকি আছে শুধু লুটপাটের অভিযোগে চেবলদের মতো এখানকার অলিগার্কদের অন্তরীণকরণ, অবৈধভাবে অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ, দেশ গড়ার কাজে তাদের সম্পত্তি ও  উদ্যমী সেবার সদ্ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনয়ন। দক্ষিণ কোরিয়ায় এ কাজটি করতে সেনাবাহিনী এককভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। আর এখন এদেশে সে কাজ করার জন্য যে সরকার ক্ষমতায়, তার পেছনে রয়েছে উজ্জীবিত ছাত্রসমাজ, জনতা ও সেনাবাহিনী অর্থাৎ পুরো সমাজ। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এদেশেও অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে অর্থায়নের সমস্যা যেমন কেটে যাবে, তেমনি কর্মসূচি বাস্তবায়নও সহজ হবে; আর বৈষম্যমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের দ্বার হবে উন্মোচিত; পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদীর পাড়ে গড়ে উঠবে বিস্ময়। শুধু সুষম বণ্টনব্যবস্থা ও শ্রমের মান সমুন্নত রাখতে স্থানীয় প্রেক্ষাপট ও অঙ্গীকার বিবেচনায় নিতে হবে। দেশের সামনে সদ্য হাজির হওয়া এই অপূর্ব সুযোগের সদ্ব্যবহারে বোধ করি সব পক্ষেরই সমর্থন থাকবে।

লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, খাদ্য অধিদপ্তর ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত