এমন সোনার ছেলে আর কোথায় পাই

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৬:৪৮ এএম

‘আমার সব ছেলেমেয়ের মধ্যে রমজান ছিল সবচেয়ে দরদি। ও দেশের জন্য রক্ত দিয়েছে, শহীদ হয়েছে। এমন সোনার ছেলে আর কোথায় পাই?’ বলছিলেন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত রমজানের মা অজুফা বেগম। তিনি আরও বলেন, ‘আর কোনো মায়ের ছেলে যেন প্রাণ না হারায়, তারা যেন ঘরে ফেরে। তাদের জন্য দেশ হোক বাসযোগ্য।’

এসব কথা বলতে বলতে আহাজারি করছিলেন রমজানের মা অজুফা। তার আহাজারিতে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

ঢাকার সাভারের বাইপাইল এলাকায় গত ৫ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে বের হওয়া ছাত্র-জনতার মিছিলের সামনের সারিতে ছিলেন রমজান। পুলিশের গুলি রমজানের বুকের বাম পাশে বিদ্ধ হয়ে বের হয়ে যায় পিঠ ফুঁড়ে। রাজপথ ভেসে যায় রমজানের রক্তে। গুরুতর আহত রমজানকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর দুপুরেই মারা যান তিনি।

অজুফা বেগমের ছয় ছেলেমেয়ের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন রমজান আলী (৩০)। নাটোরের হাজীপাড়া গ্রামে কেটেছে তার শৈশব-কৈশোরের দুরন্ত দিনগুলো। বাবা-মায়ের অভাবের সংসার। নিজের চেষ্টায় কতুয়াবাড়ি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি আর কলম ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে রমজান চলে আসেন ঢাকায়। কাজ নেন একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। একই কর্মক্ষেত্রে কাজ করার সুবাদে সেখানেই প্রেম আর বিয়ে। ঘর আলো করে আসে সুকন্যা। আসে অভাবও। এরপর পাড়ি জমান সৌদি আরবে। কিন্তু বাবা-মা, ভাই-বোন আর স্ত্রী-কন্যার জন্য বেশি দিন থাকতে পারেননি। চলে আসেন দেশে। এবার বাড়িতে থেকে নতুন সংগ্রাম, কাজ শুরু করলেন রাজমিস্ত্রির।

কিছুদিন পর আবারও পেশা পরিবর্তন রমজান আলীর। ঢাকার বাইপাইলে এসে যোগ দেন মাছের আড়তে আর স্ত্রী একটা গার্মেন্টসে। দুজনার উপার্জনে মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার। মাঝেমাঝে নাড়ির টানে বাড়ি যান। সুযোগ পেলে মায়ের হাতে তুলে দেন কষ্টার্জিত টাকা। অন্য ভাই-বোনদের চেয়ে বাবা-মায়ের জন্য যেন একটু বেশি দরদ রমজানের। এই বয়সেও বাড়ি ফিরলে মা নিজ হাতে মুখে ভাত তুলে খাওয়াতেন।

অজুফা বেগম বলেন, ‘এই ঈদেও বাড়ি এলে আমি রমজানকে ভাত মাখিয়ে মুখে তুলে খাইয়েছি। ও ছিল আমার আদরের ধন।’

পোলট্রি খামারি রমজানের চাচাতো ভাই তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘রমজান আমার চেয়ে ১০ বছরের ছোট। সে ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। বাড়িতে এলে সব আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করত।’

কতুয়াবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘রমজান ছিল মেধাবী আর বিনয়ী। এমন ছাত্র খুব কম দেখা যায়। মহান আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন।’

শহীদ রমজানের বাবা নজরুল ইসলাম সন্তান হত্যার বিচার দাবি করে বলেন, ‘আমি সব হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই, সবার জীবন উৎসর্গের স্বীকৃতি চাই। জেলা প্রশাসক মো. মাছুদুর রহমান আমাদের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের সঙ্গে আমার মেয়ে ময়নাসহ দেখা করতে গেলে তিনি জানিয়েছেন, সব শহীদ পরিবারকে মাসিক ভাতা দেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত