ক্রিকেটার খালেদ মাহমুদ সুজন ছিলেন ‘ফাইটার’। খেলোয়াড়ি জীবনের শেষ দিকে, যখন ব্যাটে রান নেই আর গতি আরও কমে বোলিংটাও হয়েছে গড়পড়তা, তখনো আশা ছাড়েননি এই অলরাউন্ডার। অনেকেই তাকে অবসর নিতে বললেও খেলা চালিয়ে গেছেন। তবে খেলা ছাড়ার পর সেই লড়াকু মানসিকতাটা আর ধরে রাখতে পারেননি, নাজমুল হাসান পাপনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অভ্যন্তরীণ অনেক প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকান্ডে। তাই এই অধ্যায়ের সমাপ্তিটা বীরের মতো নয় হলো কাপুরুষের মতোই।
ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক হয়েও বেক্সিমকোর বিপিএল দলের কোচ, আবাহনীর কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন। সবচেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান হয়েও তার রাজশাহীতে একটি ক্রিকেট অ্যাকাডেমির প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করে যাওয়াটা। এর বাইরে টিম ডিরেক্টর হিসেবেও তাকে দেখা যেত জাতীয় দলের সঙ্গে, যেখানে প্রশাসনিক ভূমিকার বাইরে গিয়ে প্রায়শই কোচের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করতেন সুজন। সবকিছুর পেছনে প্রশ্রয় ছিল সাবেক বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের। সরাসরি আওয়ামী লিগের রাজনীতি বা বেক্সিমকো গ্রুপের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও এই চক্রের সুবিধাভোগীদের একজন সুজন। পরিবর্তিত বাস্তবতায় সরে যাওয়াটাই হয়ে উঠেছিল তার নিয়তি। বুধবার পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে বিসিবির পরিচালক পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন সুজন। সরকার পরিবর্তনের পর পাপন, জালাল ইউনুস, আহমেদ সাজ্জাদুল আলম, শফিউল আলম চৌধুরি নাদেল, নাঈমুর রহমানের পর বিসিবি থেকে সরে দাঁড়ালেন আরও একজন। সোমবার দুপুরে বিসিবি কার্যালয়ে আসতে দেখা গিয়েছিল সুজনকে। এরপর বুধবার তার পদত্যাগপত্র প্রাপ্তির কথা নিশ্চিত করেছেন বিসিবির প্রধান নির্বাহী।
২০১৩ সালে বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে মুখোমুখি হয়েছিলেন গাজী আশরাফ হোসেন লিপু এবং খালেদ মাহমুদ সুজন। জাতীয় দলের দুই সাবেক অধিনায়ক ব্যালট যুদ্ধে মুখোমুখি হয়েছিলেন ক্যাটাগরি ‘থ্রি’তে, যেখানে ভোটাররা হচ্ছেন সাবেক ক্রিকেটার ও বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও ক্রিকেটারদের সংস্থার প্রতিনিধিরা। ৭ ভোটে লিপুকে হারিয়ে প্রথমবার পরিচালক হয়েছিলেন সুজন, সবশেষ নির্বাচনেও নাজমুল আবেদীন ফাহিমকে ৩৭-৩ ভোটে হারিয়ে বিসিবি পরিচালক হয়েছিলেন তিনি। লিপু এবং ফাহিম দুজনেই বর্তমানে বিসিবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। লিপু প্রধান নির্বাচক হলেও তিনি পরিচালক মর্যাদায় এই দায়িত্বে এসেছেন, আর ফাহিমকে মনোনয়ন দিয়ে পরিচালক বানিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। ফারুক আহমেদ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই পরিস্থিতিতে বিসিবিতে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছিলেন সুজন।
ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের সবশেষ মৌসুমে আবাহনীকে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন করার পেছনে কোচ হিসেবে কৃতিত্ব দাবি করতেই পারেন সুজন। তবে একই সঙ্গে বিদেশি খেলোয়াড় আনার নিয়মটা বন্ধ করা, জাতীয় দলের প্রায় সব ক্রিকেটারকে আবাহনীতে সই করানোর মাধ্যমে লিগের দলগুলোর মধ্যে শক্তির ভারসাম্যহীনতার ব্যাপারটাও আমলে নিতে হবে। বিসিবি পরিচালক থাকা অবস্থাতেই সুজন বেক্সিমকোর মালিকানাধীন বিপিএল দল ঢাকা ডায়নামাইটসের কোচ হিসেবে কাজ করেছেন, সবশেষ বিপিএলে ছিলেন দুর্দান্ত ঢাকা দলের কোচ। এছাড়াও রাজশাহীতে বাংলা ট্র্যাক ক্রিকেট অ্যাকাডেমির প্রধান কোচ সুজন। ২০২৩ বিশ্বকাপে ছিলেন বাংলাদেশ দলের টিম ডিরেক্টর। এই পদে বিশ্বকাপের আগেও একাধিক সিরিজে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন, অংশ নিতেন টিম মিটিংগুলোতে এবং দল নির্বাচনেও। চন্ডিকা হাথুরুসিংহে দলে সুজনের উপস্থিতি খুব ভালোভাবে নেননি, যেটা স্পষ্ট হয় সে সময়ে সুজনের কথায়। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে বলে দেওয়া হয়েছে আমি কতটুকু পারব, কতটুকু পারব না। এখন ক্রিকেটিং রুল আমার না। আমি তো এভাবে থাকতেই চাই না। যেহেতু আমার রক্তেই ক্রিকেট। কোচিং করি, এটা আমার পেশা। টেকনিক্যাল মানুষ হিসেবে গত ট্যুরগুলোতে যে ভূমিকা ছিল, এসব থেকে আমি দূরেই আছি। আমি উপভোগ করছি কিনা না, অবশ্যই না। একটা ট্যুরে আমি অভিভাবক হিসেবে থাকব, নিয়মশৃঙ্খলা বা অন্য বিষয় দেখব, সেটা তো আমার কাজ না। সেটাও আমি দেখতাম, তবে আমি ক্রিকেট দেখতাম’।
দলের ভেতর এই দ্বৈতশাসন কোনো উপকার বয়ে আনেনি, বরং সুজনের উপস্থিতির পরও চন্ডিকা হাথুরুসিংহের সঙ্গে নাসুম আহমেদের একটা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল ড্রেসিং রুমে, যার উল্লেখ আছে বিশ্বকাপের পর বিসিবির গঠন করা পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনেও। ফারুক আহমেদ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই বলেছিলেন, স্বার্থের সংঘাতের বিষয়ে তার অনড় অবস্থানের কথা, ‘আমি বোর্ডের সভাপতি হয়ে ব্যবসা করলে বড় ধরনের স্বার্থের সংঘাত। এ রকম কোনো কাজ হবে না। যারা বোর্ডে আছে, তারা ওই ধরনের কাজ না করলে ভালো।’ এই সবকিছুই ছিল সুজনের উদ্দেশে বার্তা, যেটা বুঝতে পেরে সাবেক এই অধিনায়ক সসম্মানে পদত্যাগ করাটাই শ্রেয়তর মনে করেছেন।
