রাষ্ট্র গভীর সংকটের মধ্যে আছে বলে মন্তব্য করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। এ ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনমুখী না হয়ে যদি ক্ষমতামুখী হচ্ছে বলে মনে করেন, তখন প্রয়োজন হলে ছাত্র-নাগরিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। গতকাল বুধবার বান্দরবানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
এদিকে নাটোরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া সমাবেশের মঞ্চও ভাঙচুর করা হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৯টি প্রতিনিধিদল গোটা দেশের জেলা ও বিভাগগুলো সফর করছে। সমন্বয়করা জানান, গণঅভ্যুত্থানে দেশের প্রতিটি স্তরের মানুষ সব জায়গা থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করেছে। গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার দাবি ও প্রত্যাশার কারণে এ সফর। স্বৈরাচার পতনের পর যে নতুন বাংলাদেশ, সেই নতুন বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা ও দাবিগুলো কী, সেগুলোর ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশের কার্যক্রম পরিচালনা করাই এই সফরের উদ্দেশ্য।
বান্দরবানের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘গত ১৬ বছরে ১১ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। যতদিন না পর্যন্ত আমরা দুর্নীতি বন্ধ করতে পারছি, ততদিন পর্যন্ত আমাদের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। যেখানে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ঘুষ বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, ঠিক সেখানেই ছাত্র নাগরিক থেকে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখতে হবে।’
শেখ হাসিনা সরকারের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং সেবাদান প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এখন মানুষের আস্থা নেই। মানুষের বিচারব্যবস্থা, সংসদের ওপর কোনো আস্থা নেই। যতদিন না পর্যন্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের আস্থায় আসছে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজ শেষ হবে না।’
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘২০২৪ সালে খুনি, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে যখন নামাতে চাই, তখনও আমরা দেখেছি সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার ছাত্র-নাগরিক এই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ছাত্র-নাগরিক গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছে। যখনই ভাঙনের প্রশ্ন এসেছে, টেনে নামানোর প্রশ্ন এসেছে, যখনই পতনের প্রশ্ন এসেছে, তখনই সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এক হয়ে গিয়েছে। যখন গঠনের প্রশ্ন এসেছে, তখনই আমাদের মধ্যে বিভাজন দেখা দিয়েছে। আমাদের আন্দোলন এখনই শেষ হয়নি। রাষ্ট্র পূর্ণাঙ্গভাবে পুনর্গঠন না হওয়া পর্যন্ত আমরা একটি সংগ্রামের মধ্যে রয়েছি। যতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্র পূর্ণাঙ্গভাবে গঠন হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের এ সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনমুখী না হয়ে আবার ক্ষমতামুখী হচ্ছে, তখনই ছাত্র-নাগরিক প্রয়োজন হলে আমরা এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করব। আমাদের ছাত্র সমাজের পাওয়ার কিছুই নেই। আবু সাঈদ, মুগ্ধরা যখন রক্ত দিয়েছে, তখন তারা কিছু পাওয়ার জন্য রক্ত দেয়নি। তারা বাংলাদেশকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছে। স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ এবং সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের। ব্যক্তি স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আমাদের একসঙ্গে কাজ করে যেতে হবে। আমরা দেখেছি সমন্বয়ক পরিচয়ে, সহসমন্বয়ক পরিচয়ে ও ছাত্র-নাগরিক পরিচয়ে বিভিন্ন অফিসে গিয়ে হুমকি দেওয়া হয়। আমরা স্পষ্ট করতে চাই, ছাত্ররা সহযোগিতা করবে, ছাত্ররা ছাত্রলীগ কায়দায় হুমকি-ধমকি দেবে না।’
শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ সম্পর্কে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘বিভিন্ন ছোট ছোট গোষ্ঠী বিভিন্ন দাবিতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে বিভিন্নভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। ১৬ বছরের আঘাত, ক্ষত, ঘা এক মাসে কোনোভাবে পূর্ণাঙ্গভাবে পূরণ হওয়া সম্ভব না। আহতরা এখনো হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। শহীদের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। প্রতিদিনই শহীদের লিস্ট দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। একটি স্থিতিশীল সরকার যখন ১৬ বছর ছিল, তখন আপনারা দাবিদাওয়া নিয়ে তাদের কাছে যাননি।’
সরকারের স্থিতিশীলতা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একটি সরকার মাত্র গঠিত হয়েছে, স্থিতিশীল হয়নি। আপনারা যদি রাস্তায় নেমে আসেন, তাহলে ধরে নেব আপনারা সরকারকে অসহযোগিতা করার জন্য রাস্তায় নেমে আসছেন। যতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো স্থিতিশীল পর্যায়ে না আসে, ততদিন পর্যন্ত সবাইকে আহ্বান জানাব আপনারা রাস্তাঘাট দখল করে, প্রশাসন ঘেরাও করে আপনারা কোনো দাবি নিয়ে আসবেন না।’
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সম্পর্কে বলতে গিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যেতে চান। এ সংবাদ আমাদের আহত করে। যে কোয়ালিটির চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যেতে চান, সেই কোয়ালিটির চিকিৎসা সিঙ্গাপুরে না নিয়ে বাংলাদেশে নিশ্চিত করুন। আপনার সার্মথ্য আছে, আপনি সিঙ্গাপুরে যেতে পারেন, কিন্তু আমার জনগণের সেই আর্থিক ক্ষমতা নেই। যদি আপনি উপদেষ্টা হয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য যেতে চান, সেখান থেকে এসে নৈতিক কোনো অবস্থান আপনার নেই। সাধারণ ছাত্র-জনতা যে ধরনের সেবা নেবে, ঠিক একই ধরনের সেবা আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চট্টগ্রামের সমন্বয়ক তালাত মাহমুদ রাফি এই মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
নাটোরে হাতাহাতি, মঞ্চ ভাঙচুর : নাটোরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে। পরে এনএস কলেজ মাঠে ডাকা সমাবেশের মঞ্চও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। গতকাল দুপুরের দিকে এই ঘটনাগুলো ঘটে।
আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনিমা চৌধুরী অডিটরিয়ামে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের সঙ্গে ছাত্র আন্দোলনে নাটোরে নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর আলোচনা শুরু হয়। এ সময় বহিরাগত কিছু শিক্ষার্থী সেখানে ঢুকে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। এরপর সবাইকে চেয়ারে বসতে বলা হলে উল্টো আয়োজকদের সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে কথা বলে তারা। পরে সেখান থেকে বিতাড়িত করলে তারা এনএস কলেজ মাঠে ডাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমাবেশের মঞ্চ ভাঙচুর করে। পরে খবর পেয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ও সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় শিক্ষার্থীরা ছাত্র সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি ও অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ করেন।
পরে বিকেল ৪টার দিকে কেন্দ্রীয় সমন্বয়করা পৌঁছালে সেখানে সমাবেশ শুরু হয়। এ সময় কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মো. মাহিন সরকার, কুররাতুল আইন কানিজ, ইফতেখার আলম ও ফয়সাল আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
ফ্যাসিস্ট সব শক্তির কবর রচনার প্রত্যয় লালমনিরহাটে : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের একটি দল গতকাল লালমনিরহাট সফর করে। সফরের শুরুতে সকালে প্রতিনিধিদলটি গত ৫ আগস্ট ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের বারঘরিয়া গ্রামের মেরাজ হোসেনের কবর জিয়ারত করেন। পরে দুপুরে পুরাতন জেলা পরিষদ মিলনায়তনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে লালমনিরহাট জেলার হতাহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন কেন্দ্রীয় সমন্বয়করা। এ সময় তারা পরিবারগুলোর পাশে থাকার আশ্বাস দেন। এরপর একই স্থানে কেন্দ্রীয় সমন্বয়করা জেলার সব উপজেলার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। বিকেলে তারা কালেক্টরেট মাঠে আয়োজিত ছাত্র-জনতার মতবিনিময় সভায় যোগ দেন। সভায় কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক তারেকুল ইসলাম তারেক বলেন, ‘ছাত্র-জনতা যেভাবে একটি পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাজিত করেছিল, ঠিক শেখ হাসিনার পতন-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কার এবং ফ্যাসিবাদের বিলোপ ঘটানোর জন্য তারা ঐক্যবদ্ধ থাকবে। তারা ঐকবদ্ধ থেকে ফ্যাসিস্ট যত শক্তি আছে সব শক্তির কবর রচনা করবে।’
সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি।
