ঘুষে চলে যায় বরাদ্দের অর্ধেক

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৬:১৭ এএম

দাকোপ উপজেলার কামারখোলা গ্রামের বাসিন্দা প্রদীপ কুমার ওরফে দয়াল। তিনি জানান, খুলনা জেলা পরিষদ থেকে ৫ লাখ টাকার পাঁচটি প্রকল্প নিতে ১ লাখ টাকা অগ্রিম ঘুষ দেন। দীর্ঘদিন ঘোরাঘুরির পর তাকে বরাদ্দ পাওয়ার চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু চিঠি ভুয়া হওয়ায় বরাদ্দের কোনো টাকাই পাননি। পরে অনেক দেনদরবার করে ১ লাখ টাকার মধ্যে ৫৬ হাজার টাকা ফেরত পেয়েছেন। বাকি রয়েছে ৪৪ হাজার টাকা। এ টাকা ফেরত পাচ্ছেন না তিনি।

শুধুই দয়ালের এ ঘটনাই নয়, ঘুষের বিনিময়ে প্রকল্প বিক্রি খুলনা জেলা পরিষদে নিত্য ঘটনা। সংস্থাটি রীতিমতো পরিণত হয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়ায়। বিশেষ করে সামাজিক প্রকল্পে বেশি হয় নয়ছয় ও লুটপাট। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ ঘটনা বেশি ঘটেছে। অন্যদিকে, জমি ইজারার নামে মার্কেট নির্মাণ ও বড় প্রকল্পে নয়ছয় করেও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানটির সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশিদ, সদস্য ও কর্মকর্তারা।

অনুসন্ধান ও জেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারী সূত্রে জানা গেছে, প্রতি অর্থবছরে সামাজিক প্রকল্পের আওতায় মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ, মন্দির-গির্জা, কবরস্থান-শ্মশান সংস্কার ও উন্নয়ন এবং গভীর নলকূপ স্থাপনে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে জেলা পরিষদ। পরিষদ চেয়ারম্যান, সদস্য ও কর্মকর্তা এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের সুপারিশে প্রকল্পের তালিকা চূড়ান্ত হয়। তবে মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী, সামাজিক প্রকল্পে ৪০ শতাংশ সিপিপিসি (কমিউনিটি পার্টিসিপেশন প্রজেক্ট কমিটি) ও ৬০ শতাংশ টেন্ডারের মাধ্যমে বাস্তবায়নের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বিগত কয়েক অর্থবছরে এ প্রতিষ্ঠানে ৯০ শতাংশ, কোনো ক্ষেত্রে শতভাগ টেন্ডার ছাড়াই সিপিপিসির মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে এসব প্রকল্প নিতে জেলা পরিষদকে দফায় দফায় ঘুষ দিতে হয় বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক টাকা। বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান পায় বাকি অর্ধেক অর্থ।

গোনালী দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের সভাপতি মতিউর রহমানসহ বরাদ্দ পাওয়া কয়েকটি মসজিদের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দেশ রূপান্তরকে জানান, জেলা পরিষদ থেকে তাদের প্রতিষ্ঠান ৭৫ হাজার, দেড় লাখ, ২ লাখ ও ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ পায়। কিন্তু প্রতি প্রকল্পের সবমিলিয়ে প্রায় অর্ধেক টাকা অগ্রিম ও কয়েক দফায় জেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রকৌশলীদের ঘুষ দিতে হয়। টেবিলে টেবিলে ঘুষ দিতে হয়। ফলে বাকি টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলা পরিষদের মালিকানাধীন খুলনা সদর ডাকবাংলোর জমি, ডুমুরিয়ার চুকনগর ডাকবাংলোর জমি, পাইকগাছার কপিলমুনির ডাকবাংলোর জমি, দাকোপের ডাকবাংলোর জমি ও রূপসায় ডাকবাংলোর জমি অন্তত ৩৫০ ব্যক্তিকে একসনা ইজারা দেওয়া হয়। ওইসব জমিতে মার্কেট নির্মাণ করে ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে।

তবে অভিযোগ আছে, ইজারা কাগজে-কলমে দেখানো হলেও এর শর্ত ভেঙে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয়। বিশেষ করে অস্থায়ী বা আধাপাকা দোকানঘর নির্মাণে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে। চুকনগরে ৫৬ শতক জমিতে ছাদযুক্ত স্থায়ী পাকা মার্কেট নির্মাণ করে ১১৩টি দোকানঘর করা হয়। গত ১৫ আগস্ট দোকানঘরগুলো অপসারণে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগে জেলা প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হয়। এ ছাড়া খুলনা সদর ডাকবাংলোর জমিসহ অন্য ডাকবাংলোর জমি গোপনে পছন্দের ব্যক্তিদের ইজারা দেওয়ার হয়। মার্কেটে অবস্থান অনুসারে তাদের কাছ থেকে দোকানঘর পিছু ৮ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাগিয়ে নেওয়া হয়। কোটি কোটি টাকা তুলে নেওয়া হলেও জেলা পরিষদকে দেওয়া হয়েছে যৎসামান্য জমি ইজারার মূল্য, আয়কর ও ভ্যাটের টাকা, যা নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অসন্তোষ রয়েছে।

চুকনগরের ব্যবসায়ী মাসুদ ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, ডাকবাংলোর জায়গায় তার চাচা শেখ কেরামত ও শেখ নুরুজ্জামানের নামে দুটি দোকারঘর ছিল। তাই নতুন মার্কেটে দোকানঘর পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার আছে। অথচ তারা দোকানঘরই পাননি। সংশ্লিষ্টরা দুটি ঘরের জন্য ৩০ লাখ টাকা চেয়েছেন। এত টাকা জোগাড় করতে না পারায় তারা দোকানঘর পাননি।

জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, ২০ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে রূপসা রেস্ট হাউজে এক হাজার আসনের অডিটরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হল নির্মাণ প্রকল্পে সর্বনিম্ন দরদাতা মাহাবুব ব্রাদার্স। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতা মেসার্স শহীদ ব্রাদার্স-স্মার্ট প্রপার্টিজ জেভি নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। অনৈতিক সুবিধায় এ প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ায় প্রকল্পে এখন করুণ দশা। দুই বছরের মেয়াদ বেড়ে হয়েছে সাড়ে পাঁচ বছর। কিন্তু সমাপ্ত হয়নি কাজ। ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৭৫ শতাংশ। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে নির্মাণকাজ। রোদ-বৃষ্টিতে পিলার, বিম ও ছাদে জমেছে ময়লার স্তর। মরিচা ধরেছে রডে।

অবশ্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ার হাফিজুর রহমান ও সিনিয়র সুপারভাইজার আবদুস সালাম বলেন, মাত্র ৬ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। জেলা পরিষদ বিল পরিশোধ করছে না। এ কারণেই কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। বিল না পেলে কাজ চালু করা সম্ভব নয়।

জেলা পরিষদ কর্মচারীরা জানান, নামমাত্র মূল্যে খেয়াঘাটগুলো পছন্দের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ইজারা দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয় বিপুল অর্থ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জেলা পরিষদের অর্থায়নে নিজস্ব অফিস ভবনে ও জেলা প্রশাসন অফিসের দোতলা ভবনে ৪৭ লাখ টাকা খরচ করে পৃথক ক্যাপসুল লিফট স্থাপন করা হয়, যা সঠিক প্রক্রিয়ায় হয়নি এবং অর্থেরও অপচয় হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, জেলা পরিষদের নির্বাচিত সাবেক চেয়ারম্যান ও সদস্য, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আওয়ামী লীগ সব মিলে একটি বড় চক্রের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। তারা জেলা পরিষদের সম্পদ, নিজস্ব ও সরকারি অর্থে নেওয়া প্রকল্প নিয়ে স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্য করে অবৈধ আয়ের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করে, যা চরম দুর্নীতি ও ফৌজদারি অপরাধ। প্রতিটি ঘটনা তদন্ত হওয়া দরকার। সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের শাস্তি দেওয়া দরকার।

তিনি বলেন, ডাকবাংলোগুলোর জায়গা ইজারার নামে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন পরিষদের কর্মকর্তারা ও একটি চক্র। সদস্যরাও জায়গা ইজারা পেয়েছেন। এটি কোনোভাইে আইনসিদ্ধ নয়। নদীর ঘাট ইজারায় অবৈধ লেনদেন হয়েছে। এখন সঠিক প্রক্রিয়ায় ইজারা দেওয়া দরকার। দোতলা লিফট বসিয়ে জনগণের অর্থের অপচয় করা হয়েছে। কারণ সেখানে লিফট নিষ্প্রয়োজন। এ ছাড়া লিফট স্থাপনে বাড়তি খরচ দেখিয়ে অর্থ তছরুপও করা হয়েছে।

জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশিদের ফোন বন্ধ থাকায় অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজা রশিদ বলেন, আগের সরকারের সময় রাজনৈতিক নেতারা, চেয়ারম্যান, সদস্যরা ছিলেন। ফলে অনেক কিছুই হয়েছে। নানা মাধ্যমে টাকা খরচ করে প্রকল্প নিতে হতো। বর্তমান বাস্তবতায় সেগুলো বন্ধ করা হয়েছে। বিভিন্ন ডাকবাংলোর জায়গা ও ঘাট ইজারা সম্পর্কে তিনি বলেন, এসব ইজারা দিয়ে টাকা নেওয়া হয়েছে। ফলে এখনো এ বিষয়ে কোনো সিন্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

লিফট সম্পর্কে এ কর্মকর্তা জানান, তিনি ওই সময় এ কর্মস্থলে ছিলেন না। এ নিয়ে কোনো ফাইলও পাননি। ফলে এ বিষয়ে অবহিত নন। এ ছাড়া বন্ধ প্রকল্প সচল করা হবে বলে জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত