গাজীপুরের কালিয়াকৈর স্কলারস স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মো. নিশাত (১৪); গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার খবরে চাচার সঙ্গে বিজয় মিছিলে অংশ নেয়। কিন্তু সেই বিজয় উল্লাস নিমিষেই বিষাদে রূপ নেয়। ছাত্র-জনতার বিজয় মিছিলটি গাজীপুরের সফিপুর এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ আনসার ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে হঠাৎ গুলি শুরু করে। পুলিশের অতর্কিত গুলিতে মানুষ চারদিকে ছুটতে থাকে। অন্যদের মতো নিশাতও দৌড়াতে থাকে। তার সামনেই পুলিশের গুলিতে একজন মাটিতে পড়ে যায়।
এই দৃশ্য দেখার পর নিশাত একটি পাবলিক টয়লেটে আশ্রয় নেয়। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন সেখানে জীবন বাঁচাতে দৌড়ে যায়। দূর থেকে পুলিশ সদস্যরা তাদের দেখতে পেয়ে টয়লেটের দিকে এগিয়ে আসতে থাকেন। পুলিশ সদস্যরা কাছাকাছি এলে ভয়ে কয়েকজন টয়লেট থেকে বেরিয়ে দৌড় দেন। তাদের অনুসরণ করে নিশাতও দৌড় শুরু করলে পুলিশ পেছন থেকে গুলি করে। গুলি নিশাতের ডান হাতের কনুইয়ের নিচে লাগে। গুলিবিদ্ধ নিশাত গত ৬ আগস্ট থেকে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) মডেল বি-ওয়াডের্র ১৫ নম্বর বেডে ভর্তি আছে। সেখানে তার সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের।
নিশাত দেশ রূপান্তরকে বলে, ‘টিভিতে শেখ হাসিনার পালানোর খবর শুনে চাচার সঙ্গে আমি মিছিলে যাই। সবাই বিজয় উল্লাস করে দৌড়াতে থাকে। আমরাও অন্যদের মতো দৌড়াতে থাকি। মিছিলটি যখন গাজীপুরের সফিপুর এলাকায় পৌঁছায়, তখন হঠাৎ গুলির শব্দ কানে আসে। আমরা আতশবাজির শব্দ ভেবে সামনে এগোতে থাকি। আনসার ক্যাম্প থেকে একটু দূরে থাকতেই দেখি পুলিশ ও আনসার এলোপাতাড়ি গুলি করছে। সবাই যে যার মতো পালানোর চেষ্টা করছে। আমার চোখের সামনেই কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে যান। এটা দেখার পরই আমি রাস্তার পাশে থাকা একটি পাবলিক টয়লেটে লুকাই। আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন সেখানে আশ্রয় নেন। বিষয়টি দেখার পর পুলিশ গুলি করতে করতে টয়লেটের দিকে আসতে থাকে। আতঙ্কিত হয়ে আমার সঙ্গে থাকা সবাই টয়লেট থেকে বের হয়ে দৌড় শুরু করেন। তাদের দেখে আমিও দৌড় শুরু করলে গুলি আমার ডান হাতে লাগে। আমার হাত সঙ্গে সঙ্গেই ঝুলে যায়। আমি কিছুদূর যাওয়ার পর পড়ে যাই। পরে স্থানীয়রা আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।’
নিশাত বলে, ‘টয়লেটে লুকিয়েও পুলিশের গুলি থেকে রেহাই মেলেনি। টয়লেটে থাকলে হয়তো আমাকে মেরেই ফেলত। আমার হাতে ইতিমধ্যে পাঁচটি অপারেশন হয়েছে। হাত পুরোপুরি ভালো হবে কি না নিশ্চয়তা নেই। যারা আমার হাতের এ অবস্থা করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। এর বেশি কিছু চাই না।’
নিশাতের পাশে বসে তার নানি মনোয়ারা বেগম (৪০) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার নাতির পাশাপাশি ছেলেও ওইদিন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তারা দুজন এখন পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি। এক মাস পার হলেও তারা সুস্থ হয়নি। পুরোপুরি সুস্থ হতে অনেক দিন লাগবে বলে জানিয়েছেন ডাক্তার। যারা আমার সন্তান ও নাতির ওপর গুলি করেছে, তাদের বিচার চাই আমি। আল্লাহ আমার নাতি ও ছেলেটাকে ভালো করে দিক। এর বেশি আমি কিছু চাই না। তাদের অসহ্য যন্ত্রণা আর মানতে পারছি না।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহতদের তদারকি করছেন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। পঙ্গু হাসপাতালের প্রবেশপথেই তাদের একটি ডেস্ক আছে। সেখানে মো. আসিফ নামের এক স্বেচ্ছাসেবক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত ৯৪ জন এখন হাসপাতালে ভর্তি আছেন। চিকিৎসা শেষে প্রতিদিন কয়েকজন হাসপাতাল ছাড়ছেন। আর যারা এখনো ভর্তি আছেন, তাদের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সমাজসেবা থেকে ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। তার বাইরে কিছু লাগলে আমরা সাপোর্ট দিচ্ছি।’
